Saturday, 14 October 2017

প্রশ্নোত্তর

খুব ইচ্ছে ছিল প্রশ্ন করার। সবারই থাকে — কেউ উত্তর পায়, কেউ পায় না। কখনও মনে হয়, সত্যজিৎ রায়কে জিজ্ঞাসা করতে পারতাম, আপনি আমাকে আঁকা শেখাবেন? আমার অনেক আক্ষেপের মধ্যে এটা একটা বড় আক্ষেপ আছে — আঁকতে না পারা। খুবই হাস্যকর হয়ত। ততোধিক হাস্যকর হত যদি সত্যজিৎবাবুর কাছে আঁকা শেখার একটা বিফল প্রচেষ্টা করতাম। উনি রেগে গিয়ে হয়ত তাড়িয়েই দিতেন! কথা হচ্ছে হঠাৎ সত্যজিৎ রায় কেন? বয়সটাই তো অমন ছিল তখন — ফেলুদা আর শঙ্কু-ময় জীবন। আর্টিস্ট তখন আমার কাছে মাত্র দু'জন — সত্যজিৎ আর আর্জে। দ্বিতীয়জনের সান্নিধ্য পাওয়া অসম্ভব কারণ তিনি আমার জন্মের বছর তিনেকের মধ্যেই প্রয়াত। রইলেন শুধু উনি। কিন্তু তাও প্রশ্নটা করা আর হল না!


যত বড় হয়েছি আমার প্রশ্নমালা বেড়েছে কিন্তু যাদের করব বলে ভেবেছিলাম তাদের সংখ্যা কমেছে কালের নিয়মে। অনেকের সামনা-সামনি হয়েও প্রশ্নগুলো করা হয়ে ওঠেনি। যেমন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। জানা হয়নি, উনি কি ট্রেকিং করতেন? না হলে, কাকাবাবু অত-শত জায়গাতে যেতেন কি করে? নিজে ভীমবেটকাতে না নামলে কি কাকাবাবু নামতে পারতেন? বেশ কয়েকবার ওঁর সঙ্গে দেখা হলেও জানা হয়নি এটা! পূর্ণেন্দু পত্রীর আঁকা যখন বুঝতে শিখলাম তখন উনি আর নেই; শুধু একবার কোনও এক কবিতা উৎসবে আমার খাতায় সই করে দিয়েছিলেন। ও-ভাবে "প" লেখার কত চেষ্টাই না করেছি তারপর! একবার সাহস করে বললে কি ক্যালিগ্রাফি শেখাতেন না?

ঋতুপর্ণ ঘোষের সঙ্গে দেখা হলেও ওঁর ছবিতে feminine sensibility নিয়ে কোনও প্রশ্ন করা হয়নি; আজ ভাবি একটু কথা বলে রাখলে ঋদ্ধ হতাম। নব্বইয়ের দশকে ওরকম বাংলা পরিচালক আর কে ছিলেন? 'তিতলি'র premier-এ প্রথম দেখা; শেষ দেখা টিভির পর্দায় — শায়িত, ভিড় জমে গেছে আনোয়ার শাহ রোডে।

অনেক মুখের ভিড়ে আমিও গেলাম মিশে বাংলা একাডেমি চত্বরে; শুয়ে আছেন তিনি। কেউ যেন এসে রেখে গেল পুষ্পস্তবক। লেখা, 'মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য্যের শ্রদ্ধার্ঘ্য'। আমি তখনও বোকার মত ভাবছি ওঁর মুখ থেকে যদি দেশভাগের সময়টা একটু জানা যেত কিন্তু অন্নদাশঙ্কর রায় তো চিরশয্যায়। কিছুই জানতে পারি না ভালো করে, শিখতে পারি না। ১৯৭৫-এর Emergency নিয়ে গবেষণামূলক পড়াশোনা করছি। ভাবলাম, সাংবাদিক বরুণ সেনগুপ্তের সঙ্গে একদিন দেখা করে শুনব কি করে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করেছিল ইন্দিরা গান্ধী সরকার। ফোন করলাম। অসুস্থ। নিকটাত্মীয় বললেন, ক'দিন পর ফোন করতে। দরকার হয়নি। বর্তমান হঠাৎ অতীত।

মৃত্যুর আকস্মিকতায় আমি বিস্মিত হইনা কিন্তু গুণীজনদের কাছে এসেও শেখা শেষ না হওয়া পীড়িত করে। শেখার শেষ নেই — এ যেমন সত্য তেমন আরও একটু আরও একটু করে অনেকটা শিখে নেওয়াও যেত। আমাদের নাটকের দলে আমি তখন আলোর দায়িত্বে। শিশির মঞ্চ
— কত ওয়াটের আলো নিচ্ছ তোমরা?
— এ তো জানি না! হিসেবে করতে হবে।
— সে কি! এসব তো মুখস্থ থাকা উচিত তোমার। শম্ভু মিত্র একবার রেগে স্টেজ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন কারণ ২৫,০০০ ওয়াট আলো ছিল না বলে! ভাবতে পারো?
এই কথোপকথন যাঁর সঙ্গে, তিনি প্রবাদপ্রতিম তাপস সেন। সময়-সুযোগ বেশি পাইনি ওঁর সঙ্গে কাজ করে আরও কিছু শেখার।

আলো হয়ে আসে অন্ধকার। শান্তিনিকেতনে আঁধার নেমেছে গরমের দুপুরেই। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রয়াত। আশ্রমকন্যা ফিরছেন শকটে, গভীর রাতে, কলকাতা থেকে। 'আনন্দধারা'য় ভুবন বইছে, বহমান মানুষ। শুধু গান গেয়েই কি স্পর্শ করা যায় সবার হৃদয়? গান তো একটা মাধ্যম মাত্র, বলতেন শ্যামলী খাস্তগীর, 'মানুষের কাছে আসতে গেলে তাদের মত ভাবতে হয়, আপন করে নিতে হয়।' যদুগোড়ার ইউরেনিয়াম খনির তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে সচেতনতা তৈরি করেছিলেন শ্যামলীদি দীর্ঘদিন ধরে, গ্রামবাসীদের কাছে তিনি ভগবান। ওঁর বাড়িতে এক দুপুরে হাতে করা নাড়ু খেতে খেতে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, এরকম সব বড় বড় কোম্পানির সঙ্গে সংঘাতে আপনার ভয় করে না? জানলার বাইরে তাকিয়ে শুধু স্মিত একটা হাসি। উত্তর নেই।

উত্তর দিয়েছিলেন মহাশ্বেতা দেবী। 'প্রতিবাদ যেন না থামে। না হলে পরের প্রজন্ম উত্তর চাইবে।' আমরা তখন একটা আদিবাসী গ্রামে আন্দোলন করছি তাকে প্রমোদনগরী বানানোর প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে। ভেবেছিলাম এক ফাঁকে জেনে নেব আমাদের বিশ্বভারতীর ইংরেজি বিভাগের পুরনো কথা বিভাগের প্রাক্তনী মহাশ্বেতাদির কাছে। কিন্ত হল না ঐ ইতিহাস জানা। এর কিছু আমাকে বলেছিলেন অবশ্য অমিতা সেন। আশ্রমের কথা, গুরুদেবের কথা, কষ্ট করে ছেলে অমর্ত্যকে বড় করার কথা... অনেক কথা একসাথে, যা ২০ মিনিটের মধ্যে সম্পাদনা করতে আকাশবাণীর ঠান্ডা ঘরেও ঘেমে গেছিলাম। অমিতাদির জীবনের শেষ সাক্ষাৎকার ছিল ঐটি। এত কিছুর মধ্যেও কোথায় লুকিয়েছিল আনন্দ তা আর খোলসা করলেন না। শুধু বললেন, আনন্দ সর্ব কাজে!

কাজটাই তো করতে চেয়েছিল বিক্রমদা। মধুরাতে একদিন খেলা থেমে যাওয়ার আগে রতনপল্লির আড্ডার মধ্যে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, গান গাওয়া-কবিতা লেখা-ছবি আঁকা, কোনটা বেশি টানে তোমাকে? বলেছিল, ভেবে বলবে। বলেনি আর। চুপচাপ চাঁদের আলোর দেশে চলে গেল হাসি তার আমাদের মাঝে রেখে গিয়ে। অনেকেরই মত। 

Thursday, 5 October 2017

বাংলা, না ইংরেজি?



আমার স্কুলের সহপাঠী মারুফের দুঃখের কারণ আছে। সে বাংলা ভাষার অন্যতম প্রকাশক। যে-বছর আমি ইংরেজি ভাষাশিক্ষান্তে ইংরেজি কাগজে শিক্ষানবিশ সম্পাদক হিসেবে চাকরি পাই, সেই বছর মারুফ উদ্যোগী হয়ে শুরু করে "অভিযান", যা আজ বাংলা প্রকাশনা জগতে আনন্দ-মিত্র ঘোষ-দেজ প্ৰভৃতির সমতুল্য। মারুফ মাঝে-মাঝেই বলে/লেখে প্রকাশক হিসেবে তার অভিজ্ঞতার কথা, যার মধ্যে প্রধান হল দুই ধরণের দৌর্বল্য — আর্থিক এবং সাহিত্যিক।

আনন্দবাজার গোষ্ঠীর মত আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা "আনন্দ" যে-ভাবে পেয়ে এসেছে, তা মারুফের মত শহরতলির মধ্যবিত্ত ঘর থেকে উঠে আসা প্রকাশকরা হয়ত কোনওদিন পাবে না। এহেন প্রকাশকদের একসঙ্গে অনেক কাজ করতে হয় — লেখা খোঁজা থেকে শুরু করে বই বিক্রি করা। এর প্রত্যেক ধাপে থাকে বাধা। সে-সব উপেক্ষা করে একটা ভাষাকে ভালোবেসে মানুষের কাছে বই পৌঁছে দেওয়ার আনন্দ-ই হয়ত মারুফের চালিকাশক্তি — বইপাড়ার অনেকের মতই।

এত কিছুর পরেও বাংলা বই না পড়লে প্রকাশকের দুঃখ তো হবেই। একজন দেখলাম মারুফের এই পোস্টের নিচে লিখেছেন, ইংরেজির মত বাংলাতে ভালো বই কোথায় এখন? বিশেষতঃ, থ্রিলার বা রোমহর্ষক গল্প যা কি না ট্রেন-প্লেনের যাত্রীদের প্রথম পছন্দ। আছে। নিশ্চয়ই লেখা হচ্ছে। কিন্তু আমরা পড়ছি কি? প্রকাশকের দায়িত্ব যদি বই প্রকাশনা করা, পাঠকেরও একটা দায়িত্ব থাকে: পড়া। শেষ কবে আপনি কাউকে বাংলা বই উপহার দিয়েছেন? বা, পেয়েছেন? ভাবুন।

আমরা আসলে অনেক বড় বড় কথা বলি কিন্তু তার সিকিভাগ-ও কি মেনে চলি? ইংরেজি তো শিখবেন ও শেখাবেন কিন্তু নিজের মাতৃভাষাটি ভুলে গেলে কি চলবে? বাংলা কি শুধুই সন্ধ্যেবেলাতে চ্যানেল-ভর্তি সিরিয়ালের মালা? বাংলা পড়েন ও পড়ান তো? নিজেকে প্রশ্ন করুন। আমার আপনার সন্তান phrasal verb-appropriate preposition এসবের পাশাপাশি সন্ধি-কারক-বিভক্তি-প্রত্যয়-সমাস-সমার্থক শব্দ-সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দ শিখছে তো? যদি উত্তর হয়, "হ্যাঁ", তবে চিন্তা নেই; উত্তর "না" হলে দোষ কিন্তু আপনার — কোনও সরকার, স্কুল, কলেজ, প্রকাশকের নয়।

আর বাংলা না শিখে ইংরেজি শিক্ষার মধ্যে আলাদা কোনও সাহেবিয়ানা আছে বলে আমার মনে হয় না। নিজের ভাষা বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন নিজেকেই; একদিন আমার আপনার বাড়ি থেকেই উঠে আসবে ভবিষ্যতের রবীন্দ্রনাথ-আশাপূর্ণা-সুনীল। অন্যকে (স্কুল, পড়ানোর মাধ্যম, কাজের সুযোগ ইত্যাদি ইত্যাদি) দোষারোপ না করে আসুন বাংলা শিখি, পড়ি, লিখি। এখন ইংরেজি তো আছেই সর্বত্র — মোবাইলের কীবোর্ড থেকে ইন্টারনেটে। প্রয়োজন বাংলাকে আয়ত্ত করা — শুনতে অবাস্তব লাগলেও এটাই সত্যি। ২০১৭-তে ইংরেজি ব্যবহার অনেক সোজা, বাংলা রপ্ত করা কঠিন।

Tuesday, 19 September 2017

ঘরে ফেরা

ঢালাই ঠিক কী বস্তু, সেটা বোঝার বয়স হয়নি তখনও। আমরা ওখানে ফুটবল-ক্রিকেট খেলি, ঘুড়ি ওড়াই, বড় ইটের গাঁথনিগুলোর পিছনে লুকোচুরি। লোকজন বলত, ওখানে নাকি প্লেন নামে। আমি কোনও দিন দেখিনি। বাবা বলেছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বানানো এই ঢালাই — রানওয়ে, যুদ্ধবিমান নামার। আমি যুদ্ধ বুঝি না — তখনও না, এখনও না — তায় আবার বিশ্বযুদ্ধ, এবং দ্বিতীয়।আমার বিশ্ব তখন ঢালাই-এ খেলতে যাওয়া। আমার সবচেয়ে পছন্দের খেলা মার্বেল, কালো মার্বেল। একটা ফায়ারিং রেঞ্জ ছিল ঢালাই-এর এক কোণে।সেখানে হয়তো সেনারা গুলি চালানোর মহড়া দিত কোনও এক সময়ে কিন্তু আমাদের গুলি হল মার্বেল ! সে দিয়ে মহড়া হয় না, যুদ্ধ হয় না — শুধু পাশের বাড়ির হ্যাপি-বুম্বার সঙ্গে ঝগড়া হয় খেলতে খেলতে।


সেদিন এরকম বাড়ি ফিরেছি। সন্ধ্যা নেমেছে চারপাশে। চোখে-মুখে সকালের রোদ মাখা আলো নিয়ে দিদি বলল, টিকিট হয়ে গিয়েছে।
— কিসের?
— তুই একটা হাবা।
— কেন?
— আবার কেন? ভুলে গিয়েছিস, আমরা পরশু বহরমপুর যাব?
— তাই?
— তুই সারাদিন খেলেই বেড়া। পরশু যে চতুর্থী। 





ডিএসটিসি-র বাস চলত দুর্গাপুর থেকে বহরমপুর। আমরা উঠতাম পানাগড়ের দার্জিলিং মোড় থেকে।পুজোর আগে ডিএসটিসি (দুর্গাপুর স্টেট ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশন, এখন অতীত) বাসের টিকিট পাওয়া ছিল দুঃসাধ্য।পানাগড়ের আমাদের পাড়ার একজন চাকরি করতেন ডিএসটিসি-তে। তিনি একদিন আগেই টিকিট দিয়ে যেতেন আমাদের। ‘ঘরে ফেরা’ সুষ্ঠু ও নিশ্চিত করতে এই ধরনের কত ‘আপনে’র সাহায্য আমরা বিভিন্ন সময় পেয়ে এসেছি; খুব আশ্চর্য ভাবে এঁরা কেউই আমাদের আপন সম্পর্কের ছিলেন না।এরকম ছিলেন কেষ্টদা। শিয়ালদহতে কারশেডের শান্টিং বিভাগে কাজ করতেন; আর আমরা যখন বারাসত থেকে বহরমপুর যেতাম, লালগোলা প্যাসেঞ্জারে জায়গা রেখে দিতেন! শুধু মা-এর বাপের বাড়ি যাত্রা সুগম করার জন্য ‘আপনার’ এই মানুষটির সে কী সদিচ্ছা। কোনও এক কুমোর শিল্পীর ঘর থেকে আমি-আপনি এরকমই আগ্রহে কতবার মা দূর্গা-কে এনেছি মণ্ডপে। সে কি কেবল পুজো করব বলে? না কি অভয়াশক্তি বলপ্রদায়িনী আমাদেরই মা।


— কিন্তু মা, এ তো চারিদিকে জল! আমাদের বাস যাবে কী করে?
— যাবে যাবে। এবার মা-এর নৌকোয় আগমন, তাই এমন অবস্থা।
— আমরা তো বাসে যাচ্ছি।
—  আমি মা দূর্গার কথা বলছি।
— ওঁর নৌকা কে চালায়? ড্রাইভার?
— মাঝি আছে দেবীর।
— কোথায়? আমরা দেখতে পাই না তো!
— পাবি। এবার কেউ না কেউ ঠিক করবেই দেখিস। মা আসছেন নৌকোয়।
—  অজানা বা অভ্যুদয়?
— করতে পারে। কিন্তু ওগুলো তো আমাদের বাড়ি থেকে অনেক দূর। বৃষ্টি কমলে দেখতে যাবো।
— রিকশা-তে?
— হ্যাঁ।
— কিন্তু স্বর্গধাম করে না কেন? বাড়ির কাছেই তো।
— ওরা মণ্ডপ নিয়ে বেশি ভাবে না। ওদের প্রতিমা-ই আসল। যামিনী পালের করা।
— যামিনী পাল কি আমাদের কেউ হয়? আমরাও তো পাল।
— না! আমাদের কেন হবে?
— যদি হত... 


অনেক কিছুই ভাবি যদি হত, কিন্তু হয় না। বাস চলে ধীরে, জল কেটে। সিউড়ি-তে যখন ১৫ মিনিটের জন্য দাঁড়িয়ে ছিল, তখনও বুঝতে পারিনি এত জল। সাঁইথিয়ার পরে ময়ূরাক্ষী পার হয়ে বুঝলাম এই ১৯৮৭-এর বন্যা কেন রেডিওতে খবরে সারাক্ষণ। পাট শুকোচ্ছে রাস্তার উপর, গরু নিয়ে উঁচু ডাঙায় ঘর বেঁধেছে মানুষ, ত্রিপলের ঘর। কান্দি, গোকর্ণ সব জলের তলায়। বৃষ্টি বন্ধ কিন্তু জল নামেনি তেমন। পরশু ষষ্ঠী... 


— মা, এরা কী করে পুজো করবে?
— খুব দুর্দশা। হয়তো হবে না এখানে এ-বছর।
— তাহলে দূর্গা ঠাকুর এ-বছর ঘরে ফিরবেন না?
— ফিরবেন। এখানে না।
— ওঁর কি অনেক ঘর? অনেক বাড়ি?
— অনেক। 


আমাদের বহরমপুরে একটাই বাড়ি — দিদার বাড়ি। সে বাড়িতে আমার অনেক আদর। সেখানে দিদা আমার জন্য মুড়কি করে রাখে, ছোটমণি বন্দুক আর ক্যাপ কিনে রাখে, অষ্টমীর সকালে অঞ্জলি দিতে যাওয়ার জামা কিনে দেয় ফুলমণি, রাঙামেসো পেতলের হাঁড়িতে নবমীর সকালে পোলাও করে খাওয়ায়, আর দশমীতে অঢেল ছানাবড়া। সেখানে কেউ তখন আর হয়তো বলে না, "যাও যাও গিরি আনিতে গৌরী, উমা নাকি বড় কেঁদেছে"। কিন্তু আগমনী সুর সেই বাড়িতে কখনও থামেওনি। দিদার সঙ্গে আচার্যপাড়া সার্বজনীনে খিচুড়ি ভোগ খাওয়া বা জগদম্বাতে সবুজ অসুর দেখতে যাওয়া বা সবাই মিলে ভাগীরথীতে বিসর্জনের সময় বাজি পোড়ানো হয় না এখন আর। হবেও না আমার; ১৯৯৮-এ কালীপুজোর ঠিক পরেই দিদা চলে গেল। অন্য বাড়ি। অন্য ফেরা। 


১৯৮৯। সেবার বহরমপুর গেলাম না আমরা। পানাগড় ছেড়ে আমরা তখন বারাসতে চলে এসেছি। আমাদের আদি বাড়ি। দূর্গার ঘরে ফেরার সময় হয়ে এল। শেঠপুকুর সার্বজনীনের বাঁশবাঁধা শেষ। দাদুর বাড়ির জানলা থেকে দেখা যেত শুধু কার্তিক ঠাকুর। বাইরে চাকরির সুবাদে বাবা বেশির ভাগ দূর্গাপুজোয় বাড়ি থেকে দূরে। সেবার বদলি হয়ে ঘরে, বাবার কাছে। শেঠপুকুর আর আমার স্কুলের মাঝে বিশাল জায়গা জুড়ে কাশফুল ফুটত। কাশের না কি বেশি কাছে যেতে নেই। রোঁয়া উড়ে মুখে যায় ঢুকে, দিদি বলত। আমি ভাবতাম, তাহলে অপু আর দূর্গা কী ভাবে কাশবনের মধ্যে দিয়ে ছুটছে? প্রশ্নের উত্তর যেখানে মেলে না, সেখানে একদিন হারিয়ে গেল দাদু। সেদিন ষষ্ঠী; ঢাকে পড়ল কাঠি; বোধন — দূর্গা আসছে ঘরে। সেদিন শ্রাদ্ধ, দাদুর। অন্য ঘরে ফেরা — হয়তো ঠাকুমার সঙ্গে দেখাও হবে।





হস্টেলে যারা থাকে, পুজোর সময় তাদের ঘরে ফেরা কেমন হয়? রামকৃষ্ণ মিশন নরেন্দ্রপুরে পড়তাম তখন। পুজোর ঠিক আগেই শেষ হত আমাদের ষান্মাসিক পরীক্ষা, আর মহালয়াতে "অয়ি গিরি নন্দিনী" বেঁধে দিত বাড়ি ফেরার সুর। এখনও ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয় সমবেত ১২০ জনের গাওয়া মহিষাসুরমর্দিনী স্তোত্র। ক্লাস সেভেন। তখনও কেবল রেডিওতেই শোনা যেত বীরেন্দ্রকৃষ্ণের "আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জীর..."উত্তম মহারাজের ঘরে ফিলিপস্-এর বড় রেডিও। সেদিন — বলা ভাল ভোররাতে — রেডিও বাইরে রাখা। সুপ্রীতি ঘোষের "...সে সুর শুনে, খুলে দিনু মন..." সেদিন আবার ভৌতবিজ্ঞান পরীক্ষা। কিন্তু মন ভেসে বেড়ায় সাদা মেঘের ভেলাতে। পরীক্ষা শেষ হলেই দুপুরের খাওয়া শেষে বাড়ি। মা আসবে নিতে। ২১৮ বাস। বারুইপুর থেকে নরেন্দ্রপুর হয়ে ধৰ্মতলা। যাওয়ার পথে কিছু ঠাকুর দেখে নেওয়া — বাসের জানালা থেকে। কোথাও প্রতিমা যাচ্ছে মণ্ডপে, কোথাও মণ্ডপ তখনও অর্ধসমাপ্ত। 


— দিদি জামা কিনে রেখেছে তোর জন্য।
— ক’টা?
— অনেক। বাবাও মানি অর্ডার করেছে। সেটাতে কাল কিনে দেব কিছু একটা।
— জিন্স কিনব।
— কী রঙের কিনবি?
— নীল। বাবা আসবে না পুজোতে?
— না। ছুটি পায়নি।
— বাবাদের অফিসে কেন ছুটি হয় না?
— আসবে হয়তো পুজোর পর।
— পুজোর পর কেউ ঘরে ফেরে?


সকালের বিশ্ব-ভারতীতে কী ভিড়! বসার জায়গা তো দূর অস্ত, দাঁড়ানোই যাচ্ছে না ভাল করে। ওদিক থেকে তমোঘ্ন জিজ্ঞেস করে, পেলে জায়গা? কেউ কি বর্ধমানে নামবে? আমি বলি, কেউনা। সবাই বলছে হাওড়া। মহালয়ার পরের সকাল। শান্তিনিকেতনে আমরা মহালয়াতে আনন্দ-বাজার করি। সে অন্য রকম মজা। সকাল থেকে দোকান বাঁধা, রান্নার বাজার করা, রান্নায় যাতে কারও অসুবিধা না হয় তা দেখা, বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ সেগুলো দোকানে এনে পসরা সাজিয়ে বসা, ক্যাশ সামলানো, তারপর রাত ন'টার সময় দোকান-পাট গুটিয়ে ঘরে ফেরা।নিজেদের দোকান, নিজেরাই ক্রেতা-বিক্রেতা, নিজেদের আনন্দ। এই আনন্দ-বাজারের লভ্যাংশ যায় বিশ্ব-ভারতীর সেবা বিভাগে; স্থানীয় গ্রামোন্নয়নে সাহায্য করে ওরা। পুজোর আনন্দ অনেকের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া। "আনন্দ সর্বকালে, দুঃখে বিপদ ভালে" — এ ভাবতে ভাবতে বোলপুর থেকে হাওড়া, সাড়ে তিন ঘণ্টার পথ চলে এলাম দাঁড়িয়ে। অন্যদের মতো আমি ট্যাক্সি বা বাস ধরতাম না সঙ্গে সঙ্গে। সাবওয়ে দিয়ে লঞ্চঘাট। ২ টাকার টিকিট। অনেক জায়গাতেই যাওয়া যায় সেই টিকিটে। আমি চড়ে পড়লুম বাগবাজারের লঞ্চে।  





হাঁটছি বাগবাজার ঘাটে নেমে। অলিগলি ঘুরে কুমোরটুলি। রং হচ্ছে। হালকা হলুদ। কেউ আবার শুকোচ্ছেন প্রতিমা, গ্যাস বার্নার দিয়ে। দূর্গা সপরিবারে তৈরি হচ্ছেন বাপের বাড়ি যাবেনবলে। সপরিবার কথাটা ঠিক না; শিব তো কৈলাসে! কুমোরটুলি পার্কের মণ্ডপকে ডাইনে রেখে হেঁটে চলেছি শোভাবাজারের দিকে। উঁকি মেরে রাজবাড়ির একচালা ঠাকুরের চালাটাই দেখা গেল। হাতিবাগান শুধু দেখলাম অপরিবর্তিত — সেই ভিড়, সেই ফুটপাথ-জোড়া দোকানের সারি, সেই মিত্রা-মিনার-দর্পনাতে ম্যাটিনি শো-এর লাইন, সেই সেন মহাশয়! পুজোর মুখে কলকাতা আরও এক আনন্দ-বাজার। ঝড়-জল-বৃষ্টি সব কিছু উপেক্ষা করেও পুজোয় কলকাতা ঘরে ফেরে, ঘরে ফেরায়।


প্রবাসে পুজোতে কি ঘরে ফেরার টান থাকে? অনেকবার ভেবেছি; বারে বারে ভাবি। ঘর কি কোনও চার দেওয়ালে আটকে থাকা ইট-পাথর-সিমেন্টের অবয়ব? নাকি নিজের মন? "মন চল নিজ নিকেতনে" — স্বামী বিবেকানন্দের খুব প্রিয় গান ছিল এটি। ঘর তৈরি করে ফেলি মনের মধ্যে। বাইরে থেকে পুজোর সময় ঘরে ফেরার ভাবনা তাই নিজের মনেই কোথাও হারিয়ে যায়। সে আমার মন। একবার দেখেছিলাম কী কষ্ট করে তামিলনাড়ুতে জুতোর কারখানায় কাজ করা শ্রমিকরা চেন্নাই মেলে ফিরছেন পুজোর আগে। কেউ যাবেন বাঁকুড়া, কেউ মালদহ,মুর্শিদাবাদ। আমি নেমেছি ভাইজাগ স্টেশনে একটু হাত-পা ছড়িয়ে নেব বলে। এসি লাগোয়া সাধারণ শ্রেণির কামরায় একজন মোবাইলে কথা বলছেন উচ্চ স্বরে — আসছি আসছি... ট্রেন একটু লেট, তা-ও কাল সকালেই ঘরে পৌঁছে যাব... তুমি যা বলেছিলে নিয়ে যাচ্ছি... মা-এর জন্য পুজোর শাড়ি... পরশু চতুর্থী, তাই না? 

Wednesday, 12 April 2017

ছোটবেলায় ছবি দেখা

বাংলা ছায়াছবি তখন চলছে এক যুগসন্ধির মধ্যে দিয়ে। বিশেষত, ছোটদের নিয়ে হলে গিয়ে ছবি দেখার ছবির সংখ্যা খুব বেশি ছিল না; থাকলেও মধ্য '৮০-তে কটা ওরকম ছবি আসত মফস্বলের হলগুলিতে? আমার তো মনে পড়ে না 'ফটিকচাঁদ' কখনো দুর্গাপুরের চিত্রালয় বা দুর্গাপুর সিনেমা (ডিসি)-তে পৌঁছেছিল! ঐ সময়ে আমরা দুর্গাপুরে থাকি; ছোটদের বিনোদনের জন্য শুধুই পার্ক — কুমারমঙ্গলম পার্ক, ডিয়ার পার্ক আর ডিয়ার পার্কের টয় ট্রেন। বড়দের জন্য 'সাগর' আসে ডিসি-তে, চিত্রালয়ে 'শত্রু' করে সিলভার জুবিলী, শুধু কোনও ভূতের রাজা বর দিতে আসে না আমাদের আর।





পানাগড়ের অবস্থাও তথৈবচ। দুর্গাপুরে যখন ছিলাম, তখন অবশ্যি আমার ছবি দেখার বয়স হয়নি। কিন্তু আমরা — আমি আর দিদি — বায়না ধরলাম মা-এর কাছে আমাদের হলে নিয়ে যেতেই হবে। বিশেষত মা আর পাশের বাড়ির কাকিমারা যখন সবাই মিলে একদিন শ্রীদেবীর 'নাগিন' দেখে এল ডিসি-তে, তখন আমাদের জোর গেল বেড়ে। কিছুটা বাধ্য হয়েই মা নিয়ে গেল পানাগড় স্টেশনের ওপারে কবিতা টকিজ-এ। 'রামায়ণ', যেখানে শমিত ভঞ্জ রাম। পোস্টারে এই 'শ্রেষ্ঠ্যাংশে' দেখে কারোর ঐ ছবি দেখতে যাওয়ার কথা নয়, কিন্তু আমাদের জেদের কাছে মা-এর কিছুই করার নেই। এখনকার মাল্টিপ্লেক্সে অভ্যস্ত ছেলেমেয়েরা ভাবতেও পারবে না গদি-বিহীন কাঠের চেয়ারে মাঝখানের রো-তে (যেখানে হলের দেয়ালে লাগানো হাতেগোনা কয়েকটা পাখার হাওয়া পৌঁছত না) বসে ছবি দেখার কি বিভীষিকা! শুধু 'রামায়ণ' নয়, আমরা এরপরেও কবিতা টকিজে দেখেছি 'রাজা হরিশ্চন্দ্র'।



কলকাতার হলে ছবি দেখার বায়না ধরলাম একবার বাবার কাছে। বিধানচন্দ্র রায়ের বাড়িতে যেতাম আমার টন্সিলাইটিসের চিকিৎসার জন্য। শীতকাল। ওয়েলিংটনের ভুটিয়া বাজার থেকে উলের ক্যাপ কিনে বাবা আমার অনেকদিনের আরেকটা আবদার মেটাল, আর তারপর হিন্দ-এ ছবি দেখা। বহু বছর পরে যখন ফিল্ম সোসাইটি মুভমেন্ট করি আমরা, তখন হিন্দ আর মেট্রো ছিল আমাদের ছবি দেখানোর জায়গা। একবিংশ শতাব্দীর প্রথম কয়েক বছর হিন্দ তার আগের রূপ ধরে রাখলেও এখন সেও মাল্টিপ্লেক্সে রূপান্তরিত। মালিকানা বদল হলেও মেট্রো আজ ইতিহাস; যেমন চ্যাপলিনের এখন একটি ইঁটও আর অবশিষ্ট নেই; নেই কোনো জ্যোতি-চিহ্ন; নেই-বাজারে কলকাতার একক-পর্দা হলের সংখ্যা এখন হয়তো হল অফ ফেমে। কালের নিয়মে দুঃখ করাও বিলাসিতা।



পানাগড়ের পাততাড়ি গুটিয়ে আমাদের বাড়ি বারাসতে ফিরে আবিষ্কার করলাম এখানকার বেশ কিছু হল। কিন্তু ছোটদের ছবি কৈ? এল, শেষ পর্যন্ত এল। 'গিলি গিলি গে', জাদুকর পি সি সরকার জুনিয়রের করা ছোটদের জন্য জাদুছবি। আমরা সবাই মিলে দেখতে গেলাম ছায়াবাণী-তে। বারাসতের পাঁচটি হলের অন্যতম এইটি। পরে লালি-সরমা-বিজয়া-তে ছবি দেখা হলেও কোনদিন বিধান হলে ঢোকা হয়নি। ছোটবেলা থেকে কখনো এখানে ভালো ছবি চলতেও দেখিনি। শুনেছি, ৭০-এর দশকে এখানে ভালো ছবি চলত। ঐ সময়ে একবার ছায়াছবির শেষে আমার মেজকাকু জাতীয় সঙ্গীতের সময় না দাঁড়িয়ে বিধান হল থেকে বেরিয়ে গেছিলেন, আর পুলিশ সঙ্গে সঙ্গে ধরে থানার গারদে! আমার উকিল ঠাকুরদা গিয়ে ছাড়িয়ে এনেছিলেন কিছু সময় পর।





মামার বাড়ি বহরমপুরে আমাদের ভারি মজা। গরমের ছুটি আর পুজোর ছুটিতে নিয়ম করে যাওয়া চাই। গরমকালে আমের পাহাড় হয়ে যেত বাড়ির একতলাতে। পুজোর সময় মা আর তাঁর সব বোনেরা মিলে দেখতে যেত ছবি। সাধারণত কল্পনা, বা কখনো মোহন বা সূর্য-তে। ১৯৮৭-তে পুজোতে  'একান্ত আপন' এল কল্পনা-তে এবং অবশ্যই ওরা সবাই ওখানে। আমার জন্য ফেরার সময় ছোটমণি কিনে আনল ক্যাপ-ফাটানো বন্দুক, আমাকে শান্ত করার জন্য। কিন্তু ছবি তো আমি দেখবই, হলে গিয়ে। সেটাও হলো। পরের বছর গ্রীষ্মাবকাশে আবার কল্পনা — আফ্রিকান সাফারি। ডিসকভারি-ন্যাটজিও-এর পূর্বসূরি। 


বিজয়া-তে 'টার্মিনেটর-২' বা অশোকনগরের রূপকথা-তে 'গুপী বাঘা ফিরে এল'-এর পাশাপাশি আরেক ধরণের ছবি দেখা চলত আমাদের। ১৯৮০-এর দশক শুধুমাত্র দূরদর্শনের নয়, ঐ সময়ে ভিডিও ক্যাসেট প্লেয়ার (ভিসিপি) তখন অনেক বাড়িতেই। আমাদের কোনোদিন ছিল না যদিও। পানাগড়ে প্রথম আমরা ভিডিও হলে ছবি দেখি — 'গুরুদক্ষিণা'। বাড়িতে ভিসিপি ভাড়া করে ছবি দেখার চল শুরু হল '৮০ দশকের শেষের দিকে। ভিসিপি আর ক্যাসেট পার্লারের ব্যবসা পুরো '৯০-এর দশক চলে; সিডি/ডিভিডি বাজার দখল করে নেওয়ার আগে। লেক টাউনে মেজপিসির বাড়িতে ভিসিপি ছিল — আকাই-এর। আকাই আর ফুনাই-এর বাজার তখন। একবার মেজপিসির বাড়িতে আমরা দেখলাম কিছু রাজেশ খান্না আর হলিউড। আমার প্রথম জেমস বন্ড ওখানেই দেখা: 'লাইসেন্স টু কিল'। 




ভিসিপি ঘিরে উত্তেজনা উঠতো চরমে — পুজোর সময়। দেবীর বোধনের সঙ্গে ষষ্ঠীর সকালে বুক করে এলাম ভিসিপি এমনকি ক্যাসেট-ও, কিন্তু পেলাম হয়তো নবমীর সন্ধ্যায়! এই অভিজ্ঞতা আমার মনে হয় ঐ সময়ে সকলের হয়েছে কখনো না কখনো। ১৯৯১-এর পুজো। 'আশিকি' পেলাম, 'সাজন' পেলাম না। সেবার বিসর্জন দেখতে আর ভাগীরথীর পারে যাওয়া হল না বাবার আদেশে। কারণ সহজেই অনুমেয় — অঙ্ক না করে 'আশিকি' দেখা আর মাসতুতো ভাই-এর সঙ্গে ছাদে ক্রিকেট খেলা! 


নরেন্দ্রপুরের স্কুলের হস্টেলে আমাদের ছবি দেখানো হত দু'ভাবে — ভিডিও ক্যাসেটে আর প্রজেক্টরে। প্রজেক্টরের-ও দু'রকম ভাগ — মাঠে বা অ্যাসেম্বলি হলে এবং স্বামী বিবেকানন্দ শতবার্ষিকী প্রেক্ষাগৃহে। ভিসিপি-তে আমরা দেখেছিলাম 'টার্মিনেটর-২', 'প্রহার' (প্রতি বছর দেখানো হত দেশাত্মবোধ তৈরির জন্য!) আর বেশ কিছু ছবি যা সব আমার মনেও নেই! প্রজেক্টরে দেখানো হয়েছিল মনে পড়ে 'খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন', 'কুহেলি', 'হীরের আংটি', 'গুপী বাঘা ফিরে এল', 'সোনার কেল্লা', 'সফেদ হাতি' এরকম কিছু ছবি। সব মিলিয়ে মন্দ লাগত না হস্টেলে বন্ধুদের সঙ্গে দেখতে! 





এখন যেমন হাতের মুঠোয় ছায়াছবি এসে গেছে মোবাইল ফোনের সঙ্গে, তা আমাদের ছোটবেলাতে ভাবাও যেত না। আমরাই মনে হয় শেষ প্রজন্ম যারা চলচিত্রের পর্দার বা স্ক্রিনের এবং ছবি প্রেক্ষণের এতরকম বিবর্তন দেখল — বড় পর্দা, টিভি পর্দা, ভিসিপি, ভিসিডি, ডিভিডি, ফিল্ম ক্যান, পেন ড্রাইভ, ডিজিটাল ছবি, মোবাইল ছবি, মেমরি কার্ড, ইউ টিউব, নেটফ্লিক্স... আর কি নয়! 


(ব্লগের ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত। ছবির সত্ত্ব চিত্রগ্রাহকের, আমার নয়। শুধু লেখার সত্ত্ব আমার) 

Thursday, 6 April 2017

লুকোচুরি

সেদিন মাঝরাতের ফ্লাইট। এয়ারপোর্টে পৌঁছে ফোন করলাম, তকাই ঘুমিয়েছে কিনা। শুয়ে পড়েছিল, ঘুমোয়নি। শমিকা বলল, তকাই ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে। আমার ছবি দেখছে কিন্তু মুখে কোনও কথা নেই। বাবা আবার ফোন হয়ে গেল। দু'দিন ছিলাম তো বাবার কোলে কোলে, জন্মদিনের কেক কাটা হল, কত আনন্দ হল...সব হারিয়ে গিয়ে আবার লোকটা ফোনের মধ্যে লুকিয়ে গেল?


বাবা ফোন হতে চায়নি। কোনও বাবা-ই চায়না। আমার বাবা চলে যেত দূর কোন রাজ্যে। গরম বা পুজোর ছুটির মধ্যে বকাঝকা-আদর-ভালোবাসার উপান্তে বাবার চলে যাওয়া — রিকশা করে স্টেশন, সেখান থেকে ট্রেন... তারপর আর জানতাম না কি হত। টেলিগ্রাম আসত টরেটক্কায়। ভালোভাবে পৌঁছনো সংবাদ। কখনো টেলিগ্রাম-ও আসত না — নীল রঙের ইনল্যান্ড চিঠি এল হয়তো এক সপ্তাহ পর। ইংরেজিতে একটা কথা আছে — No news is good news। অনেকটা ওরকমই ছিল আমাদের অবস্থা। আকাশবাণী কলকাতা 'ক' সকাল-সন্ধ্যা জানাতো কিছু দূরপাল্লা ট্রেনের খবর। আমরা অপেক্ষা করতাম কখন বলবে কামরূপ এক্সপ্রেসের কথা। বছরের কিছুদিন বাবা আর কামরূপ ছিল সমার্থক।




শুধু কি বাবা? একদিন দেখলাম সবাই কেমন পোস্টকার্ড হয়ে যাচ্ছে! যে দিদি ছাড়া আমার এক মুহূর্ত কাটতো না ছোটবেলাতে, সেও দেখলাম বাঘ-ছাপ ১৫ পয়সার পোস্টকার্ড হয়ে গেল! প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা মা হোমওয়ার্ক করাতো পাশে বসে... তারপর গল্প বলত... তারপর রাতের খাওয়া। এরকমই এক গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় মা দেখি আর হোমওয়ার্ক করায় না, চিঠি পাঠায় হলুদ কাগজে নীল লেখায়। কেবল আমার মা-এর নয়, আমার সহপাঠীরা সবাই পেয়েছে এমন চিঠি তাদের বাবা-মা-এর কাছ থেকে, সন্ধ্যাবেলায় হস্টেলের ডাইনিং হলে কোন না কোন দিন। অনেকেই কেঁদে ফেলত, কিন্তু আমার তো কান্না আসে না, ভাবনা আসে।






ভাবছিলাম; আজকের স্কাইপ এবং অন্যান্য ভিডিও কলের সময় কিভাবে আমরা আসা-যাওয়া করি স্ক্রিনের এপার-ওপার। কেউ হারায়, কেউ হারিয়ে যায়, আবার কেউ হারিয়ে ফেলে আপনারে। এখন কয়েকদিন তকাই-এর সঙ্গে স্কাইপ করছি না। ভিডিও অন করলেই সে চঞ্চল হয়ে পড়ছে — কখনো  ধরতে আসে আমাকে, কখনো বা ওর পছন্দের বল ! না পেলেই মুখ হয়ে যায় গোমড়া। প্রযুক্তি আমাদের কাছে এনে দিলেও এখনো অনেক দূরত্ব ঘোচাতে পারেনি। আঁকা-বাঁকা রাস্তা দিয়ে মা হারিয়ে যেত হস্টেলের মেন গেটের বাইরে আর এখন মাউস-চার্জার-ইউএসবি কেবলের জটে আমি আর তকাই লুকোচুরি খেলি। এই খেলাতে হার-জিৎ নেই, শুধু 3D থেকে 2D-তে রূপান্তর আছে।


Saturday, 25 March 2017

পানাগড়... তিন বছর

এক্সিস ব্যাংকের এটিএম'টা দেখেছিলাম আগেই, একবার দুর্গাপুর যাওয়ার সময়। রেশন দোকানের কাছেই। আমি আনতাম চিনি। দিদির হাতে কেরোসিনের জেরিক্যান। এক লিটারের, ডিলার যাতে ঠকাতে না পারে, মা বলে দিয়েছিল। আমি কিন্তু ঠকাতাম, মা'কে। এক মুঠো চিনি কম যেত বাড়িতে! সেদিন আমার স্কুল খুঁজছিলাম। গুগল ম্যাপস-এ। কেমন আছে আমার প্রথম স্কুল? তখনই সব উঠে এল...স্মৃতিগুলো। ম্যাপটাকে জুম্ ইন করলাম। ঐ তো! ছোট্ট দো'তলা স্কুল। সেইন্ট জুড'স স্কুল। মাঠটাও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। প্রথম স্কুল স্পোর্টস। অঙ্কে ভালো ছিলাম বলে মা বলেছিল অঙ্ক রেসে নাম দিতে। অন্যরকম সাজার ইচ্ছে ছিল না বলে কোনদিন 'যেমন-খুশি-সাজো'তে নাম দিইনি। হুইসেল পড়ার সাথেই লম্বা ছুট। মাঝখানে রাখা অঙ্কের কাগজ। সাবট্রাকশন।ও মা! ওপরে ছোট সংখ্যা, নিচে বড়! আমি তো রেজাল্ট লিখেছি মাইনাসে। আবার এক ছুটে ওপারে। হল না। অঙ্কের ম্যাডাম বললেন আমার উচিত ছিল বড় সংখ্যা থেকে ছোটকে সাজিয়ে নিয়ে বিয়োগ করতে! আমার প্রথম অঙ্ক বিয়োগান্ত।


স্কুল থেকে ফেরাটা ছিল মজার অভিজ্ঞতা। খাঁচা গাড়িতে লাল মাটির মোরামের ওপর দিয়ে। এই রাস্তা নিশ্চয়ই এখন কালো। কারণ আমরা যেখানে থাকতাম তার অদূরেই দেখছি একটা কলেজ হয়েছে — আর্যভট্ট ইনস্টিটিউট অফ ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড ম্যানেজমেন্ট। আমাদের বাড়িওয়ালার জমিতে। বাড়িওয়ালা বড় ভাল ছিলেন। আমার দৌরাত্ম সহ্য করেও কাকিমা আমাকে 'হরেকরকমবা' দেখতে দিতেন, টিভিতে। তখন শুধুই দূরদর্শন। ছোটদের অনুষ্ঠান হয়ে গেলে আমি দিদির সঙ্গে নিচে চলে আসতাম, পড়তে। আমাদের মতোই আরো এক ঘর ভাড়াটিয়া থাকত যাদের সঙ্গে আমার সখ্য ছিল দারুণ। মা যখন আমার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে আমাকে খুব মারত, হ্যাপি-বুম্বার মা তখন ছুটে আসত! বাবা তখন অনেক দূর, নাগাল্যান্ড। মা-এর ওপর খুব চাপ। দিদি এটা বুঝতো, আমি ছিলাম অবুঝ!


ঐ বয়সটা বোঝারও না। খেলার। গ্রামে দাপিয়ে বেড়ানোর। ঢালাইয়ে। ঢালাইটা আবার কি? সে এক মজার জায়গা। বিস্তর এক প্রান্তর, পুরোটা কংক্রিটে বাঁধানো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তৈরি, সবাই বলত। প্লেন নামত। প্লেন নামা আমিও দেখেছি। এখনো নামে। পানাগড়ের সেনা ছাউনির জন্য রানওয়ে আছে। ঢালাই কিন্তু পরিত্যক্ত রানওয়ে — অনেকটা ঋত্বিক ঘটকের সুবর্ণরেখার দৃশ্যে যা দেখা যায়। ওটা অবশ্য কলাইকুণ্ডাতে শ্যুটিং। ঢালাই ছিল আমাদের গ্রামের ছেলেপিলেদের প্রাণ। ওখানেই ক্রিকেট খেলা, ঘুড়ি ওড়ানো শেখা, শ্যুটিং রেঞ্জ-এর পিছনে লুকোচুরি, ছুটতে গিয়ে হাঁটু রক্তারক্তি... একদিন খবর এল প্লেন নামবে, রাজীব গান্ধীর প্লেন। তিনি তখন প্রধানমন্ত্রী। যাবেন শান্তিনিকেতন, সমাবর্তনে। তখন কি আর জানতাম এরকম সমাবর্তনে আমিও একদিন সপ্তপর্ণী পাব জওহর বেদিতে — তাও একবার না, দু'দু'বার!



সে প্লেন নামলো। সকলের সঙ্গে আমিও হাজির রাজীব দর্শনে। বছরখানেক আগেই ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীদের গুলিতে প্রাণ গিয়েছে ইন্দিরার। তাই আঁটোসাঁটো নিরাপত্তা। প্রথমে নামলো বেশ কিছু সাদা অ্যাম্বাসেডর, প্লেনের পেট থেকে! তারপর রাজীব-সোনিয়া। কত শত লোক। কিন্তু রাজীব গান্ধী ছিলেন জনতার প্রধানমন্ত্রী। সবার সঙ্গে হাত মেলাতে মেলাতে চললেন শান্তিনিকেতনের উদ্দেশে। আমরা ছোটরা পেলাম ক্যাডবেরি এক্লায়র্স — মুঠো-মুঠো! অভাবনীয় তখন... ছোট্ট গ্রামে আমরা মর্টন লজেন্স পাই শুধু! ভাগ্য ভালো থাকলে একটা দোকানে কখনো-সখনো পাওয়া যেত আমূল মিল্ক চকোলেট — সেটাও তখন সদ্য এসেছে মধ্যবিত্তের বাজারে। পকেট ভর্তি করে এক্লায়র্স নিয়ে এসে কদিন চলল খুব লজেন্স খাওয়া!


আরেকটা বিমানের কথা কিছুতেই ভুলতে পারিনা। ছোটবেলাতে যেমন হয় বিভিন্ন রকম শখ, আমারও ছিল হরেকরকম। তার মধ্যে অন্যতম দেশলাই-এর প্যাকেট জমানো। একদিন পল্টুমামা, যে আমাদের বাড়ির সবার সঙ্গেই ভাব জমিয়ে বেশ নিজেদের লোক হয়ে গেছিল, সে এসে খবর দিল একটা দেশলাই-ভর্তি লরি উল্টে গেছে জি টি রোডে। এই রাস্তাই এখনকার সোনালী চতুর্ভুজের পূর্বসূরি। আমি তো শুনেই দৌড় ! জানতাম বাড়ি ফিরে মার খাব মা-এর  কাছে। কিন্তু আগে তো দেখতে হবে দেশলাই-এর প্যাকেট গুলো। রাস্তায় অনেক লোকের ভিড়। হতাহত কেউ নেই। শুধু রাস্তার একদিকে লক্ষাধিক দেশলাই-এর বাক্স। ওপরে লেখা বিমান, একটা প্লেনের ছবি আঁকা। সবাই দেখছি কুড়োতে লেগে গেছে পুলিশ তখনও আসেনি তাই! আমিও একটা প্যাকেট তুলে নিলুম। আমার সংগ্রহের জন্য। কিন্তু মজাটা অন্য জায়গাতে। পরের তিন-চার মাস যে দোকানেই দেশলাই কিনতে যেতাম, সেখানে ল্যাম্প-শিপ-ক্যান্ডল এসব না দিয়ে শুধুই বিমান দিত!


দেশলাই-এর প্যাকেট ছাড়াও আমার আরেকটা জমানোর শখ ছিল মার্বেল গুলি। তখন ১০ পয়সাতে ১০টা গুলি পাওয়া যেত। মাঝে-মাঝেই আমি ১০ পয়সার শোনপাপড়ি বা দানাদার না খেয়ে ১০টা রংবেরঙের গুলি কিনে আনতাম। এমনকি দানবাবার মেলাতেও খেলনা গাড়ির সঙ্গে গুলি কিনতাম! ফ্যারেক্স-এর এক কৌটো গুলি হয়ে গেছিল আমার। এরকম আরেক কৌটো হয়েছিল কাঁইবিচি — তেঁতুলের বিচি। সব একদিন চলে গেল। বাবা জানতে পেরে গেছিল। বছর তিনেক পানাগড়ে কাটানোর পর যখন বারাসত ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তখন বাসাবদলের প্রথম বলি হল আমার কৌটো দু'টো! খাট-টেবিল-বইপত্রের ম্যাটাডোরে ঠাঁই পায়নি আমার অনেক বছরের জমানো আনন্দমেলা, আর কিছু চাঁদমামা, কিছু অরণ্যদেব, কিছু বিক্রম-বেতাল।এদের সংখ্যা কম ছিল, কিন্তু আনন্দমেলা ছিল থরে-থরে সাজানো — তিব্বতে টিনটিন, লোহিত সাগরের হাঙর আর অজস্র গাবলু হাত পরিবর্তন হয়ে ঠোঙা হয়ে গেল। আর কারো জীবনে যেন এরকম কালো দিন না আসে — বাবা-মা-এর বদলির চাকরি কেন ছোটবেলার অভিশাপ হবে?


পানাগড় গ্রামের পর আমাদের পরের পর্ব কেটেছিল কাঁকসাতে, ২-৩ কিলোমিটার দূরে। এই বাড়ি তখন সবে হয়েছে। প্রাথমিক স্কুল-শিক্ষক হারু মাস্টার — সকলেই তাঁকে এই নামেই ডাকত আর তাঁর আসল নাম জানাই হয়নি কোনদিন — সবে তাঁর বাড়ি করেছেন কাঁকসাতে। আমরা যখন সেখানে ভাড়াটিয়া হয়ে যাই, তখনও কাজ অর্ধসমাপ্ত। মনে পড়ে, তখন শীতকাল। ছাদে ওঠার সিঁড়ি সবে ঢালাই হয়েছে। হারু মাস্টার সন্ধ্যে বেলাতে ৪-৫ ডিগ্রী ঠান্ডাতেও এসে জল দিত সেই শীতে। মুখ থেকে আওয়াজ বেরোচ্ছে — হু হু। আমরা জিজ্ঞেস করতাম কেন এতো কষ্ট করছ? উত্তর আসত, নিজের বাড়ি না হলে বুঝবে না গো তোমরা। বুঝেছিলাম এসব অনেক পরে। জানিনা এখন আর হারু মাস্টার বেঁচে আছেন কিনা। ওনার বাড়িতে আমাদের খুব স্বাধীনতা ছিল কারণ বাড়িওয়ালা থাকতেন না ওই বাড়িতে ! ভাড়াবাড়িতে যদি বাড়িওয়ালা না থাকেন, তার মজাই আলাদা! সে যে না থেকেছে সে জানবেও না!!


হারু মাস্টারের বাড়িতে আমাদের সঙ্গে আরেকটা ঘরে থাকতেন মা-এর দুই সহকর্মী — তপু মাসি আর শিখা মাসি। দুজনেই মা-এর থেকে ছোট। এঁরা দুজনই ছিলেন অবিবাহিত, আমৃত্যু। আমার বড় হওয়াতে এঁদের ভূমিকা ছিল অন্যরকম। একদিকে যেমন গিলি 'ডোরাকাটা জামা', অন্যদিকে 'দেখি নাই ফিরে'তে চোখ বোলাই। আমাদের ঘরে আনন্দমেলা, আর পাশের ঘরে দেশ। হয়তো বুঝি না সব, কিন্তু অবচেতনে তৈরি হয় ভালো লাগা, বিকাশ ভট্টাচার্য থেকে রামকিঙ্কর, সমরেশ বসুর হাত ধরে — ভাবাই যায় না! পরে যখন শান্তিনিকেতন যাই পড়াশুনো করতে, প্রথম যে বাড়িটা দেখতে যাই তা হল রামকিঙ্করের কোয়ার্টার। ভগ্নদশা, ভগ্ননীড় বিশ্ব-ভারতীতে। আবিষ্কার করি বলাকা-বিভাস, বিকাশ ভট্টাচার্যের বাড়ি। জানতামই না হয়তো এঁদের কথা যদি না ছোট থেকে দেশ-এর সঙ্গে পরিচয় হত। তপু মাসির কথা লিখেছিলাম অনেকদিন আগে আমার ব্লগ-এ। তখন তপু মাসি শেষশয্যায়, লড়াই করছে ক্যান্সারের সঙ্গে। শেষ দেখা। আর শিখা মাসির সঙ্গেও তাই। একটা লড়াই শেষে যখন অফিসে ফিরলেন, তখন আবার ক্যান্সারের প্রকোপে শেষ নিঃশ্বাস। ৩০ বছর আগের দিনগুলো ছিল না এমন। 'ভালোবাসার রাজপ্রাসাদে' 'জীবনখাতার প্রতিপাতায়' জারি ছিল হিসাব-নিকাশ। পত্রিকার সঙ্গে আমরা আদান-প্রদান করতাম মান্না-হেমন্ত-শ্যামল, লতা-আশা- ফিরোজা বেগম।


দেশ-এর পাতা ছাড়া আরও একটা জায়গাতে ছিল আমার অবাধ স্বাধীনতা। মা-এর অফিস। লক্ষ্মী ভবন, জি টি রোডের ধারে। দিদির তখন স্কুল থাকত সকাল ১১টা থেকে বিকেল পর্যন্ত। আমার সকালের স্কুল শেষে মা অনেকদিনই আমাকে নিয়ে চলে যেত অফিসে। সেখানে সারাদিন কাটিয়ে বাড়ি ফেরত। রোববারের সকাল ছিল রামায়ণ-ময়। তার রেশ চলত পুরো সপ্তাহ।এমনকি স্কুলের পাশের দোকানে পোস্টার পাওয়া যেত রাম-সীতা-হনুমান রূপী অরুন গভীল-দীপিকা চিখালিয়া-দারা সিংহের! কার বাড়িতে কত এরকম পোস্টার আছে তাই নিয়ে কাড়াকাড়ি! আজকের দিনে হরেক চ্যানেল আর সিরিয়াল-এর মধ্যে এসব ভাবাই যাবে না।জীবনটা অন্যরকম ছিল — আল ধরে ঘুরে বেড়ানো, দামোদরের ক্যানেল পার দিয়ে সকালে দৌড়নো, এক পাড়া থেকে অন্য পাড়াতে খেলতে যাওয়া এমনকি ২ টাকার টিকেট কেটে ভিডিও হলে 'ডিস্কো ডান্সার' বা 'গুরুদক্ষিণা' দেখা! পানাগড়ের একমাত্র সিনেমা হল কবিতাতে কখনো মা নিয়ে যেত 'রাজা হরিশ্চন্দ্র' বা শমিত ভঞ্জের বাংলা রামায়ণ দেখাতে। কিন্তু আমার আর দিদির বেশি পছন্দ ছিল ২ টাকায় 'মিলন তিথি' দেখার, পাড়ার সবাই মিলে, হাত-পা ছড়িয়ে! 


এর পাশাপাশি শুরু হয়েছিল আমার তবলা শেখা। পাণ্ডে স্যার ছিলেন খুব কড়া। আমার মত বিচ্ছু একমাত্র পান্ডে স্যারকেই ভয় পেত। আমি দিদির সোমনাথদার গানের ক্লাসে সঙ্গত দিতাম তবলাতে। অনেক পরে যখন স্কুলে তবলাতে সর্বোচ্চ নম্বর আর বৃত্তি পেতাম, মনে পড়তো ছোটবেলাতে পান্ডে স্যারের টোকা — আঙুলের গাঁটে! পান্ডে স্যারকে কোনদিন আর বৃত্তির কথা বলাই হয়নি। যেমন বলা হয়নি বলাইমামাকে। ২০০৮ সালে একবার বলাইমামার সাইকেলের দোকানের সামনে গিয়ে ছোট বলগুলো খোঁজার কথা। ১৯৮৮-তে পেলে এখন কেন পাব না? শুনেছিলাম, বলাইমামার দোকান কবেই উঠে গেছে! অনেক কিছু উঠে গেলেও স্টেশন রোডের আশুতোষ মিষ্টান্ন ভান্ডার এখনও আছে। ওরা আপেল সন্দেশ করে নিশ্চয়ই আজও, না হলে আমার মত ভাইরা কি খাবে ভাইফোঁটার দিন?


বাবা যখন ছুটিতে বাড়ি আসত, তখন ছিল আমার নাওয়া-খাওয়া ভুলে পড়াশুনো করার সময়। বছরের বাকি সময়টা শুধুই খেলা আর বাবার শেষ করিয়ে যাওয়া পাঠক্রম ঝালাই দেওয়া। তবে বাবার কাছে বায়না যে করতাম না তা নয়, কিন্তু বাবা সবকিছু মোটেও মেনে নিত না। এরও ব্যতিক্রম ছিল। সেবার বাবা এসেছে নাগাল্যান্ড থেকে। গরমকাল। আমি আর দিদি বিকেলে বায়না ধরলাম গোল্ড স্পট খাব। বাবা আমাকে উপেক্ষা করতে পারলেও দিদিকে পারত না। নাছোড়বান্দা আমাদের দু'জনকে বাবা নিয়ে গেল দার্জিলিং মোড়ে যেখানে জি টি রোড থেকে গাড়িগুলো চলে যেত উত্তরবঙ্গের দিকে। 


দার্জিলিং মোড়ের দোকানে পাওয়া যেত গোল্ড স্পট। অনেকদিন পরে, প্রায় বছর ২৫ তো হবেই, একদিন আবার দাঁড়ালাম ওখানে। গোল্ড স্পট এখন আর নেই। মিরিন্ডা এসে গেছে। ছোটবেলাতে চাকা না, আমার ভালো লাগত লরিগুলোর ড্রাইভ শ্যাফট দেখা। সেটাও আর দেখতে পেলাম না। বুঝলাম, অনেকটা বড় হয়ে গেছি। ছোটবেলাটা রেখে এসেছি মোরামের রাস্তায় আর আলের ধারে। 

Sunday, 9 October 2016

শিউলি, শিবানন্দ মঠ আর শেঠপুকুরের পুজো

—  দেখি কতটা হলো?
—  অনেক, দাদু। দিদির থেকে বেশি, টুম্পাদির থেকেও বেশি।
—  শুঁয়োপোকা উঠেছিল হাতে?
—  না। তবে কয়েকটা আমি মেরেছি পা দিয়ে।

আমাদের শেঠপুকুরের বাড়িতে একটা বড় গাছ ছিল শিউলি ফুলের। পুজোর আগে দুর্গাপুর থেকে এসে আমার প্রথমেই মনে হত শুঁয়োপোকাগুলো কি শিউলি ফুল খেয়ে ফেলেছে? আমি কি কাল সকালে ফুল কুড়োতে পারব না? সকাল হলেই আমার সব উৎকণ্ঠার অবসান। দাদুর পুজোর ঝুড়ি ভরে গেল শিউলিতে। এরপর আমরা চারজন — দাদু, দিদি, টুম্পাদি আর আমি — একসাথে শিবানন্দ মঠে টুকটুক করে হেঁটে। ১০০ মিটার পথ তখন আমার মনে হত কত্তটা!

শিবানন্দ মঠে আমরা প্রতিদিনই যেতাম কিন্তু পুজোর দিনগুলো ছিল অন্যরকম। অনেক মানুষ, ত্রিপল আর শামিয়ানা ঘেরা লন... আমার বসার জায়গাটাও বেদখল। ছোটদের একটা অধিকারবোধ থাকে সব কিছুর ওপর। আমিও তার ব্যতিক্রম ছিলাম না। সন্ধ্যাবেলা আরতির সময় যখন "খণ্ডন ভব বন্ধন" হত — যা আমি তখন কিছুই বুঝতাম না — তখন আমি চুপ করে বসে থাকতাম পেছনের দিকে কার্পেটের এক কোণে। কিন্তু পুজোর দিনগুলোতে সেই কোণ তখন জবরদখল। সবচেয়ে বেশি ভিড় হত অষ্টমীর দিন, সকালের কুমারী পুজোতে। অত ভিড় ভালো লাগতো না কিন্তু বাড়ির সবাই ওখানে আর আমি একা কি করব!

ডাকের সাজের সাথে আমার প্রথম পরিচয় শেঠপুকুরের পার্কের পুজোতে। এখন যেখানে বারাসতে নতুন রবীন্দ্র ভবন হয়েছে, সেখানেই পুজো হত সাউথ শেঠপুকুর সার্বজনীনের। সকাল যদি কাটে মঠে তবে দুপুর থেকে পার্কের পুজো। একদম আমাদের বাড়ির উল্টোদিকে হওয়াতে আমার আনন্দ বড্ড বেশি। মন খারাপ হয়ে যেত একটাই কারণে — মা দুর্গার মুখটা আমাদের বাড়ি থেকে দেখা যেত না। জানলা থেকে আমি শুধু কার্তিক দেখতে পেতাম। এমনটা হত প্রতিবছর। এখন শুনেছি এই পুজোর বহর কমে গেছে। প্রতিপত্তি বেড়েছে পাশের মাঠের পুজো — শেঠপুকুর অ্যাথলেটিক্স ক্লাব। কোথাও যেন একটা ছদ্ম প্রতিযোগিতা থাকতো এই দুই পুজোর। তখন কেউ তো আর প্রথম-দ্বিতীয়-তৃতীয় ট্রফি দিত না!

এরকমই একবার পুজোর কথা।
১৯৮৯।
শিউলি ফুল পড়ে আছে অজস্র, কেউ তুলছে না। আমাকেও বারণ করা।
ষষ্ঠীর দিন সকালে মা বলল কুড়িয়ে আনতে। শুধু সেদিন আর মঠে গেলাম না।
দাদুর ছবির সামনে রাখলাম এক ঝুড়ি। দাদুর শ্রাদ্ধ সেদিন। ২৪-শে সেপ্টেম্বর দাদু চলে গেল যখন চিরকালের মত, শিউলিগুলো তখনও ঝরে পড়ছে টুপটাপ।
শুধু আমার আর কোনদিন শিউলি ফুল নিয়ে মঠে যাওয়া হল না।