শ্রীচরণেষু বাবা।
এই লিখে শুরু হত আমার চিঠি। জায়গা আমার জন্য সংক্ষিপ্ত। ইনল্যান্ড লেটার-এর পেছনের পাতার অর্ধেক। বাকি অর্ধেক দিদির। বাকি দুই পাতা মা -এর। বাবা বাড়ি আসে বছরে দু-তিনবার। চিঠি আসে যায় প্রতি সপ্তাহে প্রায়। শেখার আবদার করাতে একবার বাবা লিখল পরের বার এসে ঘুড়ি ওড়ানো শিখিয়ে দেবে। ছুটির মধ্যে হঠাৎ ডাক আসে। অফিস যেতে হবে পরদিন। অনেক লম্বা সে রেলযাত্রা। বাবার কাছে আমার ঘুড়ি ওড়ানো শেখা হল না।
শেখা হয়নি অনেক কিছুই। সাঁতার বা ফুটবল। বাবা জেলাস্তরে ফুটবল খেলেছে, হাড়ও ভেঙেছে। আমাদের বাড়ি ছিল পুকুরপাড়ে কিন্তু হস্টেল চলে গেলাম তাই বাবার সঙ্গে দুই-একবার জলে নামলেও সাঁতার শেখা হয়নি তখন। ফুটবলেও তাই হল। কিন্তু এসবের বাইরে শিখলাম অনেক কিছু, বিশেষত অঙ্ক। লোডশেডিং তখন নিয়মিত, অবশ্যম্ভাবী। হ্যারিকেনের আলোতে যুদ্ধ — বাবা, আমি আর অঙ্ক। এমন যুদ্ধে কাবু হতে হতে একসময় আমি জয়ী হতাম। তখন ছাড় পেতাম বাবার কাছে। হয়তো মাঝরাতে।
আসলে বাবাদের কাছে শেখা তো ঠিক স্কুলের মত হয়না। এর না আছে কোনও বাঁধা-ধরা ছক বা সময়। সার্কাস শেষ দেখেছি বাবার সঙ্গে, এবং পি.সি. সরকারের জাদুও। সে-সবের মাঝে উত্তর দিয়ে গেছে আমার অজস্র কেন-এর। হয়তো বইমেলাতে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করেছে ১৩-এর ঘরের নামতা।
ছোটবেলাতে বাসের টিকিট জমাতাম। বাবা একদিন সেখান থেকে একমুঠো টিকিট দিয়ে বলল কত টাকার টিকিট হয়েছে গুনতে! খেলা হয়ে গেল পড়া।
একদিন হেমন্ত গেল আটকে। বাবা শেখাল কি করে টেপ ছাড়াতে হয় হেড থেকে আর তারপর পেনসিল দিয়ে সেটা ঠিক করতে হয়। তবে কখনও শিখিনি সিগারেট খাওয়া, দেখেছি কিভাবে বদলে যায় প্যাকেটের নামগুলো — ক্যাপস্টান, রিজেন্ট, উইলস বা গোল্ড ফ্লেক। যখন বাবাকে নিয়ে যাচ্ছে এঞ্জিওপ্লাস্টি করাতে, তখনও কি বালিশের তলাতে ক্লাসিকের প্যাকেটটা ছিল? দেখলাম, নেই! ছোট থেকে বলতাম খেয়ো না, কথা শুনতো না। কথা শোনা-না-শোনা একটা দ্বিপাক্ষিক ব্যাপার। আমিও তো বাবার অনেক কথা শুনিনি!
২৯শে ফেব্রুয়ারী বাবার জন্মদিন, চার বছরে একবার আসে। এবছর নেই। বাবার যে-বছর পঞ্চাশ হয়েছিল, সেই বছরও ছিল না লিপ ইয়ার। বাবা বাইরে। আমি আর দিদি কার্ড পাঠিয়েছিলাম। এবার বাবার পঁচাত্তর। আমি বাইরে। বাবার জন্মদিন আসে আর যায়। নীরবে।
এই লিখে শুরু হত আমার চিঠি। জায়গা আমার জন্য সংক্ষিপ্ত। ইনল্যান্ড লেটার-এর পেছনের পাতার অর্ধেক। বাকি অর্ধেক দিদির। বাকি দুই পাতা মা -এর। বাবা বাড়ি আসে বছরে দু-তিনবার। চিঠি আসে যায় প্রতি সপ্তাহে প্রায়। শেখার আবদার করাতে একবার বাবা লিখল পরের বার এসে ঘুড়ি ওড়ানো শিখিয়ে দেবে। ছুটির মধ্যে হঠাৎ ডাক আসে। অফিস যেতে হবে পরদিন। অনেক লম্বা সে রেলযাত্রা। বাবার কাছে আমার ঘুড়ি ওড়ানো শেখা হল না।
![]() |
| ষাটের দশকে তখন জিওলজিস্ট। |
শেখা হয়নি অনেক কিছুই। সাঁতার বা ফুটবল। বাবা জেলাস্তরে ফুটবল খেলেছে, হাড়ও ভেঙেছে। আমাদের বাড়ি ছিল পুকুরপাড়ে কিন্তু হস্টেল চলে গেলাম তাই বাবার সঙ্গে দুই-একবার জলে নামলেও সাঁতার শেখা হয়নি তখন। ফুটবলেও তাই হল। কিন্তু এসবের বাইরে শিখলাম অনেক কিছু, বিশেষত অঙ্ক। লোডশেডিং তখন নিয়মিত, অবশ্যম্ভাবী। হ্যারিকেনের আলোতে যুদ্ধ — বাবা, আমি আর অঙ্ক। এমন যুদ্ধে কাবু হতে হতে একসময় আমি জয়ী হতাম। তখন ছাড় পেতাম বাবার কাছে। হয়তো মাঝরাতে।
![]() |
| খাজুরাহোতে সত্তরের দশকে। |
আসলে বাবাদের কাছে শেখা তো ঠিক স্কুলের মত হয়না। এর না আছে কোনও বাঁধা-ধরা ছক বা সময়। সার্কাস শেষ দেখেছি বাবার সঙ্গে, এবং পি.সি. সরকারের জাদুও। সে-সবের মাঝে উত্তর দিয়ে গেছে আমার অজস্র কেন-এর। হয়তো বইমেলাতে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করেছে ১৩-এর ঘরের নামতা।
ছোটবেলাতে বাসের টিকিট জমাতাম। বাবা একদিন সেখান থেকে একমুঠো টিকিট দিয়ে বলল কত টাকার টিকিট হয়েছে গুনতে! খেলা হয়ে গেল পড়া।
![]() |
| বাবা আর আমি। দুর্গাপুর। ১৯৮২ |
২৯শে ফেব্রুয়ারী বাবার জন্মদিন, চার বছরে একবার আসে। এবছর নেই। বাবার যে-বছর পঞ্চাশ হয়েছিল, সেই বছরও ছিল না লিপ ইয়ার। বাবা বাইরে। আমি আর দিদি কার্ড পাঠিয়েছিলাম। এবার বাবার পঁচাত্তর। আমি বাইরে। বাবার জন্মদিন আসে আর যায়। নীরবে।


