Monday, 30 April 2018

জীবনের আখড়া

২১শে ফেব্রুয়ারি ২০১৪। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠ। অশীতিপর এক বৃদ্ধ আমার হাত ধরে একটা ছোট্ট চাপ দিলেন।
আমি তো "ছেড়ে দিন, ছেড়ে দিন" বলে চিৎকার জুড়েছি।
উনি বলছেন, "এ বিশ্বনাথ দত্তের হাত, গোয়াবাগানের আখড়ার।"
"আপনি এখনও কুস্তি করেন?"
"করি মানে? এক প্যাঁচে তোমাকে শুইয়ে দেব এখানে!"
সমবেত হাততালি আর হো-হো হাসি! পাশ থেকে ওঁর নাতি বলল, "দাদুর সঙ্গে মোটেও কিন্তু পাঞ্জা লড়তে যাবেন না।"
"আমি কি পাগল!"
বিশ্বনাথবাবু বলেন, "একদিন গোয়াবাগান আসুন, গোবর গুহর সঠিক উত্তরসূরিদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব।"
"আপনিও কি গোবর গুহর ছাত্র ছিলেন?"
"না তো কি? এমন গুরু আর কোথায় পাবো? তোমাদের প্রজন্ম তো ওঁর নামই শোনেনি!"


বিশ্বনাথবাবুর সঙ্গে আমি আর তর্কে গেলাম না গোবর গুহর — ইংরেজি বানানে পদবি লিখতেন গোহো — নাম ক'জন শুনেছে, বা শোনেনি। বছর কয়েক আগে আমিও তো জানতাম না গোবর গুহর নাম। তখন অবশ্য আমি স্কুলে পড়ি। প্রসিত'দা ডেকে পাঠালেন একদিন ক্লাসের পর।
— সেদিন কি একটা লেখার কথা বলছিলে?
— ঐ ফাল্গুনীতে একটা লেখা দেব ভাবছিলাম।
ফাল্গুনী আমাদের স্কুলের বার্ষিক পত্রিকা। সেখানে ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখা এক অন্যরকম অনুভূতি। আমাদের আবাসিক স্কুলের প্রত্যেক ভবনে একটি করে দেওয়াল পত্রিকা থাকতো। এছাড়াও ছোটদের স্কুলের দেওয়াল পত্রিকা, বড়দের স্কুলে আরও একটা, প্রত্যেক হবি ক্লাবের একটা করে — দেওয়াল পত্রিকার ছড়াছড়ি নরেন্দ্রপুরে। কোনওটা সাপ্তাহিক, কিছু-কিছু পাক্ষিক, আবার হয়তো মাসিক। কেউ লেখে বাংলায়, কেউ ইংরেজি, হিন্দি এমনকি সংস্কৃততেও! কিন্তু এ সব ছাড়িয়ে ফাল্গুনী অনন্য — মোটা আর্ট পেপারের প্রচ্ছদ, ঝকঝকে কাগজে ছাপা, ভাষা-সাহিত্যের শিক্ষকরা বাছাই করেন সেরার সেরা লেখাগুলো, আর সবচেয়ে বড় কথা ফাল্গুনী পৌঁছে যায় নরেন্দ্রপুরের সর্বত্র, যা কোনও দেওয়াল পত্রিকা পারে না!


— গত বছরও একটা লিখেছিলে না?
— হ্যাঁ। কিন্তু সেটা নির্বাচিত হয়নি ছাপানোর জন্য। 
হবে কি! তখন সদ্য এসেছি স্কুলে। বিজ্ঞপ্তি এলো ফাল্গুনীতে লেখা দেওয়ার জন্য। এখনও মনে আছে সবে মাত্র দুটো দেওয়াল পত্রিকাতে লিখেছি ছোটোখাটো কবিতা — চার-ছয় পংক্তির, যেমন লেখে ১০-১১ বছরের বাচ্চারা। তাতেই নিজেকে মনে করছি রবীন্দ্রনাথ। এক রবিবার বাবা-মা এসেছেন দেখা করতে আমার সঙ্গে। বললাম ফাল্গুনীর কথা। ভাবলাম গদ্য লিখি। বলেছে অনধিক ৬০০ শব্দে। বাবা বলল ভ্রমণ কাহিনী। সপ্তাহান্তে বাবা-মা আবার এলেন। দেখলাম। বাবা বললেন, "বাহ্! বেশ হয়েছে।" ওঁরা কখনও নিরুৎসাহ করেন না, কিন্তু কোথায় গলদ সেটাও বলেন না — বিশেষত সাহিত্যের ক্ষেত্রে। অঙ্ক হলে অবশ্য অন্য কথা!
— কোথায় যেন একটা গিয়েছিলে, তাই নিয়ে লেখা...
— হ্যাঁ। বুদ্ধগয়া-গয়া-রাজগীর-নালন্দা... খুব একটা ভালো হয়নি হয়ত।
— সবসময় বড় লেখার জায়গা হয় না।
— এবছর কি একটা কবিতা দেব প্রসিত'দা? অভেদানন্দ ভবনের দেওয়াল...
— না না। কবিতা অনেক পাই আমরা। একটা নিবন্ধ লিখবে?
— লিখতে পারি।
— 'পারি' না। লিখবে যদি বল, আমি বিষয় বলে দিচ্ছি, পড়াশুনো করতে হবে। লাইব্রেরির পঞ্চানন'দাকে বলবে আমার কথা। উনি বইগুলো বের করে দেবেন।


হাতে চিরকুট নিয়ে দৌড়লাম লাইব্রেরিতে। পঞ্চানন'দাকে দিলাম। দশ মিনিটের মধ্যে চারটে বই হাতে। বাংলার ব্যায়ামবীরদের নিয়ে লেখা। এর মধ্যে খুঁজতে হবে গোবর গুহ — প্রসিত'দার দেওয়া বিষয়। পঞ্চানন'দা লাইব্রেরিতে ধুতি-পাঞ্জাবি পরতেন, প্রসিত'দা এবং আরও অনেকের মত। কিন্তু লাইব্রেরির বাইরে উনি ছিলেন আমাদের স্কাউটের শিক্ষক — অনুশাসনের প্রতীক।
— বইগুলো পড়া হয়ে গেলে টেবিলেই রাখবে। আমি তুলে রাখবো।
— কিন্তু এ তো একদিনে পড়া হবে না!
— বেশ। আমি কিন্তু এক সপ্তাহের বেশি রিডিং রুমে রাখতেও পারবো না।
আমি পড়ি বিপদে। যেভাবে হোক শেষ করতে হবে নোট নেওয়া। এদিকে ক্লাসের পরে মাত্র দুটো পিরিয়ড হয়তো পাই, না হলে লাইব্রেরি বন্ধ হয়ে যাবে বিকেলে। যাই হোক, গোবর গুহ চলছে, গোয়াবাগান, কুস্তি শেখা, গামার সঙ্গে পার্ক সার্কাস ময়দানে বিখ্যাত লড়াই, তারও আগে বিশ্বজয়ী হওয়া... আমি নোট নেওয়া শেষ করলাম ৪-৫ দিনে। এরপর লেখার পালা। এর আগে কোনওদিন এরকম গবেষণা করে কিছু লিখিনি। ষষ্ঠ শ্রেণিতে এর বেশি করা সম্ভবও না!


— এত কিছু লিখেছ কেন? শব্দ সংখ্যা কত দেখেছ?
— না। 
— যে কোনও পত্রিকায় লেখার প্রথম শর্তই হচ্ছে, কত শব্দ লিখতে হবে। যেরকম চাওয়া হবে, তার মধ্যে তোমার ভাবনা প্রকাশ করতে হবে।
শুরু হল সম্পাদনার প্রথম পাঠ, প্রসিত'দার কাছে। মাজা-ঘষা চলছে গোবর গুহ'র। প্রায় বার চারেকের পর মোটামুটি একটা দাঁড়ালো ব্যাপারটা। প্রসিত'দার খুব আনন্দ। তার চেয়ে বেশি আনন্দ আমার — ফাল্গুনীতে বেরোবে আমার প্রথম লেখা, ছাপার অক্ষরে নিজের নাম!


এখন অনেক লেখা বেরোয়, নিজের নামে। উত্তেজনা কমে এসেছে, আনন্দও। অন্যের লেখা পুনর্লিখনে মজা বেশি পাই। এরকম আনন্দই কি পেতেন প্রসিত'দা? প্রসিত রায়চৌধুরী। ডক্টরেট। হতেই পারতেন অধ্যাপক। পড়াতে পারতেন কোনও বড় কলেজে। কিন্তু এসেছিলেন স্কুলে, রামকৃষ্ণ মিশনে, আমাদের কিছু শেখাতে। নিজেও লিখেছেন অনেক, গবেষণা করেছেন সোনারপুর-রাজপুর-হরিনাভির আঞ্চলিক ইতিহাস নিয়ে। বোড়াল-আদিগঙ্গার গল্প তো ওঁর কাছেই শোনা। আমার সহপাঠী আবির সে-দিন পাঠালো প্রসিত'দার ছবি, দেখা করতে গিয়েছিল। কোনও এক অজ্ঞাত কারণে ওঁর পেনশন নেই, বা বন্ধ। দুর্দশা। কষ্ট। নিঃসঙ্গতা গ্রাস করেছে। হয়ত সান্ত্বনা একটাই — কেউ কেউ তো লিখছে, লিখতে শিখেছে, পরের প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়েছে কালি-কলম... 


প্রসিত'দা এখন। আবিরের তোলা ছবি 

..............................................

© সুপ্রতিম পাল