Saturday, 14 October 2017

প্রশ্নোত্তর

খুব ইচ্ছে ছিল প্রশ্ন করার। সবারই থাকে — কেউ উত্তর পায়, কেউ পায় না। কখনও মনে হয়, সত্যজিৎ রায়কে জিজ্ঞাসা করতে পারতাম, আপনি আমাকে আঁকা শেখাবেন? আমার অনেক আক্ষেপের মধ্যে এটা একটা বড় আক্ষেপ আছে — আঁকতে না পারা। খুবই হাস্যকর হয়ত। ততোধিক হাস্যকর হত যদি সত্যজিৎবাবুর কাছে আঁকা শেখার একটা বিফল প্রচেষ্টা করতাম। উনি রেগে গিয়ে হয়ত তাড়িয়েই দিতেন! কথা হচ্ছে হঠাৎ সত্যজিৎ রায় কেন? বয়সটাই তো অমন ছিল তখন — ফেলুদা আর শঙ্কু-ময় জীবন। আর্টিস্ট তখন আমার কাছে মাত্র দু'জন — সত্যজিৎ আর আর্জে। দ্বিতীয়জনের সান্নিধ্য পাওয়া অসম্ভব কারণ তিনি আমার জন্মের বছর তিনেকের মধ্যেই প্রয়াত। রইলেন শুধু উনি। কিন্তু তাও প্রশ্নটা করা আর হল না!


যত বড় হয়েছি আমার প্রশ্নমালা বেড়েছে কিন্তু যাদের করব বলে ভেবেছিলাম তাদের সংখ্যা কমেছে কালের নিয়মে। অনেকের সামনা-সামনি হয়েও প্রশ্নগুলো করা হয়ে ওঠেনি। যেমন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। জানা হয়নি, উনি কি ট্রেকিং করতেন? না হলে, কাকাবাবু অত-শত জায়গাতে যেতেন কি করে? নিজে ভীমবেটকাতে না নামলে কি কাকাবাবু নামতে পারতেন? বেশ কয়েকবার ওঁর সঙ্গে দেখা হলেও জানা হয়নি এটা! পূর্ণেন্দু পত্রীর আঁকা যখন বুঝতে শিখলাম তখন উনি আর নেই; শুধু একবার কোনও এক কবিতা উৎসবে আমার খাতায় সই করে দিয়েছিলেন। ও-ভাবে "প" লেখার কত চেষ্টাই না করেছি তারপর! একবার সাহস করে বললে কি ক্যালিগ্রাফি শেখাতেন না?

ঋতুপর্ণ ঘোষের সঙ্গে দেখা হলেও ওঁর ছবিতে feminine sensibility নিয়ে কোনও প্রশ্ন করা হয়নি; আজ ভাবি একটু কথা বলে রাখলে ঋদ্ধ হতাম। নব্বইয়ের দশকে ওরকম বাংলা পরিচালক আর কে ছিলেন? 'তিতলি'র premier-এ প্রথম দেখা; শেষ দেখা টিভির পর্দায় — শায়িত, ভিড় জমে গেছে আনোয়ার শাহ রোডে।

অনেক মুখের ভিড়ে আমিও গেলাম মিশে বাংলা একাডেমি চত্বরে; শুয়ে আছেন তিনি। কেউ যেন এসে রেখে গেল পুষ্পস্তবক। লেখা, 'মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য্যের শ্রদ্ধার্ঘ্য'। আমি তখনও বোকার মত ভাবছি ওঁর মুখ থেকে যদি দেশভাগের সময়টা একটু জানা যেত কিন্তু অন্নদাশঙ্কর রায় তো চিরশয্যায়। কিছুই জানতে পারি না ভালো করে, শিখতে পারি না। ১৯৭৫-এর Emergency নিয়ে গবেষণামূলক পড়াশোনা করছি। ভাবলাম, সাংবাদিক বরুণ সেনগুপ্তের সঙ্গে একদিন দেখা করে শুনব কি করে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করেছিল ইন্দিরা গান্ধী সরকার। ফোন করলাম। অসুস্থ। নিকটাত্মীয় বললেন, ক'দিন পর ফোন করতে। দরকার হয়নি। বর্তমান হঠাৎ অতীত।

মৃত্যুর আকস্মিকতায় আমি বিস্মিত হইনা কিন্তু গুণীজনদের কাছে এসেও শেখা শেষ না হওয়া পীড়িত করে। শেখার শেষ নেই — এ যেমন সত্য তেমন আরও একটু আরও একটু করে অনেকটা শিখে নেওয়াও যেত। আমাদের নাটকের দলে আমি তখন আলোর দায়িত্বে। শিশির মঞ্চ
— কত ওয়াটের আলো নিচ্ছ তোমরা?
— এ তো জানি না! হিসেবে করতে হবে।
— সে কি! এসব তো মুখস্থ থাকা উচিত তোমার। শম্ভু মিত্র একবার রেগে স্টেজ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন কারণ ২৫,০০০ ওয়াট আলো ছিল না বলে! ভাবতে পারো?
এই কথোপকথন যাঁর সঙ্গে, তিনি প্রবাদপ্রতিম তাপস সেন। সময়-সুযোগ বেশি পাইনি ওঁর সঙ্গে কাজ করে আরও কিছু শেখার।

আলো হয়ে আসে অন্ধকার। শান্তিনিকেতনে আঁধার নেমেছে গরমের দুপুরেই। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রয়াত। আশ্রমকন্যা ফিরছেন শকটে, গভীর রাতে, কলকাতা থেকে। 'আনন্দধারা'য় ভুবন বইছে, বহমান মানুষ। শুধু গান গেয়েই কি স্পর্শ করা যায় সবার হৃদয়? গান তো একটা মাধ্যম মাত্র, বলতেন শ্যামলী খাস্তগীর, 'মানুষের কাছে আসতে গেলে তাদের মত ভাবতে হয়, আপন করে নিতে হয়।' যদুগোড়ার ইউরেনিয়াম খনির তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে সচেতনতা তৈরি করেছিলেন শ্যামলীদি দীর্ঘদিন ধরে, গ্রামবাসীদের কাছে তিনি ভগবান। ওঁর বাড়িতে এক দুপুরে হাতে করা নাড়ু খেতে খেতে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, এরকম সব বড় বড় কোম্পানির সঙ্গে সংঘাতে আপনার ভয় করে না? জানলার বাইরে তাকিয়ে শুধু স্মিত একটা হাসি। উত্তর নেই।

উত্তর দিয়েছিলেন মহাশ্বেতা দেবী। 'প্রতিবাদ যেন না থামে। না হলে পরের প্রজন্ম উত্তর চাইবে।' আমরা তখন একটা আদিবাসী গ্রামে আন্দোলন করছি তাকে প্রমোদনগরী বানানোর প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে। ভেবেছিলাম এক ফাঁকে জেনে নেব আমাদের বিশ্বভারতীর ইংরেজি বিভাগের পুরনো কথা বিভাগের প্রাক্তনী মহাশ্বেতাদির কাছে। কিন্ত হল না ঐ ইতিহাস জানা। এর কিছু আমাকে বলেছিলেন অবশ্য অমিতা সেন। আশ্রমের কথা, গুরুদেবের কথা, কষ্ট করে ছেলে অমর্ত্যকে বড় করার কথা... অনেক কথা একসাথে, যা ২০ মিনিটের মধ্যে সম্পাদনা করতে আকাশবাণীর ঠান্ডা ঘরেও ঘেমে গেছিলাম। অমিতাদির জীবনের শেষ সাক্ষাৎকার ছিল ঐটি। এত কিছুর মধ্যেও কোথায় লুকিয়েছিল আনন্দ তা আর খোলসা করলেন না। শুধু বললেন, আনন্দ সর্ব কাজে!

কাজটাই তো করতে চেয়েছিল বিক্রমদা। মধুরাতে একদিন খেলা থেমে যাওয়ার আগে রতনপল্লির আড্ডার মধ্যে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, গান গাওয়া-কবিতা লেখা-ছবি আঁকা, কোনটা বেশি টানে তোমাকে? বলেছিল, ভেবে বলবে। বলেনি আর। চুপচাপ চাঁদের আলোর দেশে চলে গেল হাসি তার আমাদের মাঝে রেখে গিয়ে। অনেকেরই মত। 

Thursday, 5 October 2017

বাংলা, না ইংরেজি?



আমার স্কুলের সহপাঠী মারুফের দুঃখের কারণ আছে। সে বাংলা ভাষার অন্যতম প্রকাশক। যে-বছর আমি ইংরেজি ভাষাশিক্ষান্তে ইংরেজি কাগজে শিক্ষানবিশ সম্পাদক হিসেবে চাকরি পাই, সেই বছর মারুফ উদ্যোগী হয়ে শুরু করে "অভিযান", যা আজ বাংলা প্রকাশনা জগতে আনন্দ-মিত্র ঘোষ-দেজ প্ৰভৃতির সমতুল্য। মারুফ মাঝে-মাঝেই বলে/লেখে প্রকাশক হিসেবে তার অভিজ্ঞতার কথা, যার মধ্যে প্রধান হল দুই ধরণের দৌর্বল্য — আর্থিক এবং সাহিত্যিক।

আনন্দবাজার গোষ্ঠীর মত আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা "আনন্দ" যে-ভাবে পেয়ে এসেছে, তা মারুফের মত শহরতলির মধ্যবিত্ত ঘর থেকে উঠে আসা প্রকাশকরা হয়ত কোনওদিন পাবে না। এহেন প্রকাশকদের একসঙ্গে অনেক কাজ করতে হয় — লেখা খোঁজা থেকে শুরু করে বই বিক্রি করা। এর প্রত্যেক ধাপে থাকে বাধা। সে-সব উপেক্ষা করে একটা ভাষাকে ভালোবেসে মানুষের কাছে বই পৌঁছে দেওয়ার আনন্দ-ই হয়ত মারুফের চালিকাশক্তি — বইপাড়ার অনেকের মতই।

এত কিছুর পরেও বাংলা বই না পড়লে প্রকাশকের দুঃখ তো হবেই। একজন দেখলাম মারুফের এই পোস্টের নিচে লিখেছেন, ইংরেজির মত বাংলাতে ভালো বই কোথায় এখন? বিশেষতঃ, থ্রিলার বা রোমহর্ষক গল্প যা কি না ট্রেন-প্লেনের যাত্রীদের প্রথম পছন্দ। আছে। নিশ্চয়ই লেখা হচ্ছে। কিন্তু আমরা পড়ছি কি? প্রকাশকের দায়িত্ব যদি বই প্রকাশনা করা, পাঠকেরও একটা দায়িত্ব থাকে: পড়া। শেষ কবে আপনি কাউকে বাংলা বই উপহার দিয়েছেন? বা, পেয়েছেন? ভাবুন।

আমরা আসলে অনেক বড় বড় কথা বলি কিন্তু তার সিকিভাগ-ও কি মেনে চলি? ইংরেজি তো শিখবেন ও শেখাবেন কিন্তু নিজের মাতৃভাষাটি ভুলে গেলে কি চলবে? বাংলা কি শুধুই সন্ধ্যেবেলাতে চ্যানেল-ভর্তি সিরিয়ালের মালা? বাংলা পড়েন ও পড়ান তো? নিজেকে প্রশ্ন করুন। আমার আপনার সন্তান phrasal verb-appropriate preposition এসবের পাশাপাশি সন্ধি-কারক-বিভক্তি-প্রত্যয়-সমাস-সমার্থক শব্দ-সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দ শিখছে তো? যদি উত্তর হয়, "হ্যাঁ", তবে চিন্তা নেই; উত্তর "না" হলে দোষ কিন্তু আপনার — কোনও সরকার, স্কুল, কলেজ, প্রকাশকের নয়।

আর বাংলা না শিখে ইংরেজি শিক্ষার মধ্যে আলাদা কোনও সাহেবিয়ানা আছে বলে আমার মনে হয় না। নিজের ভাষা বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন নিজেকেই; একদিন আমার আপনার বাড়ি থেকেই উঠে আসবে ভবিষ্যতের রবীন্দ্রনাথ-আশাপূর্ণা-সুনীল। অন্যকে (স্কুল, পড়ানোর মাধ্যম, কাজের সুযোগ ইত্যাদি ইত্যাদি) দোষারোপ না করে আসুন বাংলা শিখি, পড়ি, লিখি। এখন ইংরেজি তো আছেই সর্বত্র — মোবাইলের কীবোর্ড থেকে ইন্টারনেটে। প্রয়োজন বাংলাকে আয়ত্ত করা — শুনতে অবাস্তব লাগলেও এটাই সত্যি। ২০১৭-তে ইংরেজি ব্যবহার অনেক সোজা, বাংলা রপ্ত করা কঠিন।