সেদিন এক ইংরেজি কাগজে এক বাঙালি লিখেছেন পাশবালিশ নিয়ে অনেক কথা। অবাঙালি পাঠকদের জন্য তাকিয়া এবং ইংরেজিতে bolster শব্দটি ব্যবহার করেছেন। মুশকিল হল আভিধানিক অর্থ আর ব্যবহারিক প্রয়োগে বিস্তর পার্থক্য। লেখাটিতে ব্যবহার হয়েছে 'জলসাঘর' ছবির একটি স্থিরচিত্র। কিন্তু সেটি পাশবালিশ নয়, নিতান্ত তাকিয়া। তাকিয়ার ব্যবহার পুরনো --- নবাবি আমল থেকে চলে আসছে। ১৭৬০ সালে তৈরি মুর্শিদাবাদের বড়নগরের চারবাংলা মন্দিরের গায়ে টেরাকোটার কাজে তাকিয়া দেখা যায় --- বাবু আরাম করে তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে বসে বাঈজী নাচ উপভোগ করছেন। আবার, হুগলির গুপ্তিপাড়াতেও এরকম তাকিয়ার খোঁজ মেলে রাবণ আর মন্দোদরীর আখ্যানে, মন্দিরগাত্রে টেরাকোটার কাজে।
কিন্তু ঠিক কবে তাকিয়া বাবুদের বাহিরমহল থেকে আমবাঙালির অন্দরমহলে পাশবালিশে রূপান্তরিত হল তার কোনও সঠিক সন-তারিখ পাওয়া যায় না। ঊনবিংশ শতাব্দীতে আঁকা বাবুমহলের বেশ কিছু ছবিতেও তাকিয়া দেখতে পাই। হয়ত অন্দরমহলের ছবি আঁকার রেওয়াজ ছিল না বলেই পাশবালিশের সন্ধান পাওয়া যায় না। তবে বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখাতে পাশবালিশ এসেছে। গল্পগুচ্ছের 'অসম্ভব কথা'তে আমরা দিদিমার কাছে গল্প শোনার মাঝে পাই এই কথা --- আমি একটুখানি নড়িয়া-চড়িয়া পাশ-বালিশ আরও একটু সবলে জড়াইয়া ধরিয়া কহিলাম, “তার পরে?”।
এর ঠিক একশো বছর পার করে আরেকজন বাঁধলেন পাশবালিশ নিয়ে গান। কি করে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্ম এগিয়ে চলে কিন্তু ধ্রুবক সেই পাশবালিশ। গানের শেষ দুই কলিতে চন্দ্রিল ভট্টাচার্য লিখছেন --- "বাবা ও খোকা, কমন প্রেমিকা, দুজনে পাশবালিশ / তৃতীয় বিশ্ব, আদতে নিঃস্ব, গতি সেই পাশবালিশ।" চন্দ্রিল যদি পাশবালিশকে বিভিন্ন বলিউডি নায়িকার সঙ্গে তুলনা করে থাকেন, তবে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় 'পাত্রী চাই'তে লিখছেন --- "আমি তো খুব রাজি। কিন্তু খুড়ো আমার কানে কানে বলল, অমন হাঁ করে পাশবালিশটাকে দেখছিস কী? ও তো তোর মাসির বয়সি। পাশবালিশ! পাশবালিশ মানে হল শরীরে উঁচু-নিচু নেই।" আয়েশি জীবনচর্চা, আধুনিক সাহিত্য ও গণমাধ্যমের মধ্য দিয়ে মধ্যবিত্ত বাঙালির পাশবালিশ নিয়ে এক নতুন বোধোদয় হয় --- এই বস্তুটিকে কখনওই হাতছাড়া করা যাবে না। এমনকি বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে নতুন বৌ এসেছে বাপের বাড়ি থেকে ছোটবেলার পাশবালিশ নিয়ে --- এ নিছক গল্প নয়, সত্যি।
পাশবালিশ প্রেমের সবচেয়ে বড় নিদর্শন দেখিয়েছিল আমার এক বন্ধু। কলকাতা থেকে নিজের গাড়িতে মালপত্র তুলে নতুন শহরে চাকরি করতে যাচ্ছে সে। ওড়িশা-অন্ধ্রপ্রদেশের সীমানায় শেষ-ডিসেম্বরের শীতের রাতের অন্ধকারে গাড়ি দাঁড় করালো মাওবাদী মোকাবিলায় পারদর্শী বিশেষ বাহিনী। সমস্ত কাগজপত্র পরীক্ষার পর গাড়ির ভিতরে তল্লাশি চলছে --- ব্যাগ, সুটকেস, বাসনপত্র .... একমাত্র একজন একটু হিন্দি বোঝেন, বাকি সব তেলুগু ছাড়া বোঝেন না।
"ইয়ে ক্যা হ্যায়? ইসকে অন্দর ক্যা হ্যায়?"
"ইয়ে পাশবালিশ হ্যায়।"
"তাকিয়া?"
"নাহি, পাশবালিশ।"
"ইয়ে বঙ্গালী লোগ কিউঁ তাকিয়া লেকে ঘুমতা হ্যায়!"
"আপকো সমঝ মে নাহি আয়েগা কভি।"
![]() |
| (ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত ছবি। আমার স্বত্ত্ব নেই) |









