সোমনাথ'দার চোখে জল। জলের ধারা। আমি কোনওদিন দেখিনি। আমি নিশ্চিত, সর্বসমক্ষে ওঁর মত ব্যক্তিত্ব কাঁদছেন মানে মনের দুর্বল কোথাও আঘাত পেয়েছেন। এটা যে-সময়ের ঘটনা, তখনও সোমনাথ'দাকে ওরা বের করে দেয়নি। যদিও পার্টি তার ঠিক সাত মাস পরে ওটাই করবে যা পরের দশ বছরেও — ১৩ অগস্ট ২০১৮ পর্যন্ত — সোমনাথ'দা ভুলতে পারেননি।
— সোমনাথ'দা, চোখে জল?
— এত ভালো বানিয়েছে ছবিটা, মনটা কেমন করে উঠল।
— আপনি দিল্লিতে সারা দেশের সাংসদ'দের সামলান। আপনাকে কখনও দুর্বলচিত্ত মনে হয়নি...
— আসলে কি জানো, সংসদ তো কাজের জায়গা, সেখানে দৃঢ় থাকতেই হয়। কিন্তু এই ছবিটা আমাকে কেমন যেন করে দিল...
'তারে যমিন পর'।
না ওঁর সেদিন ছবি দেখতে যাওয়ার কথা, না আমার। আমি শান্তিনিকেতনে গেছি চাকরির ফাঁকে একদিনের ছুটিতে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে, উনিও সংসদের শীতকালীন অধিবেশন শেষে বোলপুরে। হঠাৎ দেখা। আমার মত অর্বাচীনকে চিনতে পারার কথা না। কিন্তু সোমনাথ'দা সবার খোঁজ রাখেন — ওঁর এলাকার ভোটার না হলেও! কিন্তু শত ব্যস্ততার মধ্যেও টুক-টাক কথা হয়ে যায়। গীতাঞ্জলিতে অবশ্য সেদিন সন্ধ্যের শো-এর পর বেশি কথা হয়নি।
গীতাঞ্জলি থেকেই সোমনাথ'দার সঙ্গে আমার পরিচয়। তখনও সাংবাদিক হইনি, সিপিএম-ও কোনওদিন করিনি। একটাই পরিচয় — সাংস্কৃতিক কাজ-কর্মে জড়িত ঝোলাওয়ালা ছাত্র, বীক্ষণের সঙ্গে যুক্ত, ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলন করে।
— সোমনাথ'দা, গীতাঞ্জলি উৎসবে কুইজ প্রতিযোগিতা করাব একটা?
— এটা আবার ফিল্ম সোসাইটি-এর সঙ্গে কি সম্পর্ক?
— না না। ফিল্ম সোসাইটি না। জনসাধারণের জন্য কুইজ, যে কেউ আসতে পারবে।
— ও। বেশ তো। করাও। কোন দিন হল ফাঁকা দেখে নাও।
সোমনাথ'দার কথা-ই শেষ কথা। শুধু প্রথামাফিক একটা চিঠি। প্রাক-ফেসবুক যুগে মেমারি-বাঁকুড়া থেকেও লোক এসেছিল বোলপুরে কুইজে। ছবি দেখানো, ফিল্ম সোসাইটি চালানো — এ-সবে সোমনাথ'দার কাছে যা সাহায্য পেয়েছি আমরা, তা লিখে শেষ করতে পারবো না।
— তুমি ফ্রি আছো?
— আপনি ডেকেছেন, কি আর কাজ থাকতে পারে?
— ___-এর স্কুলের একটা অনুষ্ঠান আছে। একটু সঞ্চালনা করে দিতে হবে।
তখন আমি ছাত্র, আকাশবাণীতে গলা বেচে খাই। এক সন্ধ্যায় আকাশবাণীতে কাজ করলে জোটে ৭৫ টাকা। দিনমজুরির মত সন্ধ্যা-মজুরি।
— কিন্তু এর জন্য কোনও পয়সা পাবে না।
— সে না হয় দেবেন না! আকাশবাণী তো ৭৫ টাকা দিচ্ছে পাঁচ ঘন্টার অনুষ্ঠান সঞ্চালনাতে!
— বলো কি! এতো কম?
— ছাড়ুন তো! সবাই গরিব হয়েই থাকবো।
এর ক'দিন পরের কথা। মেলার মাঠে সে'বার ফুল-মেলার আসর। সোমনাথ'দা, সুধাংশু শীল এবং আরও অনেকে। আমার আবার ডাক পড়েছে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সঞ্চালনার। ফুল নিয়ে রবীন্দ্রসংগীত আর অনেক আলোচনা শেষ। আমি ঝোলা গুছিয়ে নেমেছি মঞ্চ থেকে। উদ্যোক্তাদের একজন এসে হাতে ধরালেন সাদা খাম। সোমনাথ'দা কারও সঙ্গে কথার ফাঁকে আড় চোখে দেখলেন। একটা হাসি।
মিলিয়ে যাচ্ছে। হাসিটা মিলিয়ে যাচ্ছে। বাংলা টিভি চ্যানেলের লাইভ নোটিফিকেশন ফেসবুকে। সাদা চাদরে মোড়া শরীর। লাল শুধু সেলামে।
শান্তিনিকেতনে যখন পড়ি, কলকাতার এক রাজনৈতিক আঁতেল বলেছিলেন, তোমাদের তো নাথের জায়গা — রবীন্দ্রনাথ আর সোমনাথ।
সত্যি। একজনকে দেখিনি, অনুভব করেছি নাথ।
অন্য নাথের কাজ দেখেছি, ক্ষয়িষ্ণু সময়ে নিরলস কাজ করে যাওয়া — সবার জন্য।
— সোমনাথ'দা, চোখে জল?
— এত ভালো বানিয়েছে ছবিটা, মনটা কেমন করে উঠল।
— আপনি দিল্লিতে সারা দেশের সাংসদ'দের সামলান। আপনাকে কখনও দুর্বলচিত্ত মনে হয়নি...
— আসলে কি জানো, সংসদ তো কাজের জায়গা, সেখানে দৃঢ় থাকতেই হয়। কিন্তু এই ছবিটা আমাকে কেমন যেন করে দিল...
'তারে যমিন পর'।
না ওঁর সেদিন ছবি দেখতে যাওয়ার কথা, না আমার। আমি শান্তিনিকেতনে গেছি চাকরির ফাঁকে একদিনের ছুটিতে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে, উনিও সংসদের শীতকালীন অধিবেশন শেষে বোলপুরে। হঠাৎ দেখা। আমার মত অর্বাচীনকে চিনতে পারার কথা না। কিন্তু সোমনাথ'দা সবার খোঁজ রাখেন — ওঁর এলাকার ভোটার না হলেও! কিন্তু শত ব্যস্ততার মধ্যেও টুক-টাক কথা হয়ে যায়। গীতাঞ্জলিতে অবশ্য সেদিন সন্ধ্যের শো-এর পর বেশি কথা হয়নি।
গীতাঞ্জলি থেকেই সোমনাথ'দার সঙ্গে আমার পরিচয়। তখনও সাংবাদিক হইনি, সিপিএম-ও কোনওদিন করিনি। একটাই পরিচয় — সাংস্কৃতিক কাজ-কর্মে জড়িত ঝোলাওয়ালা ছাত্র, বীক্ষণের সঙ্গে যুক্ত, ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলন করে।
— সোমনাথ'দা, গীতাঞ্জলি উৎসবে কুইজ প্রতিযোগিতা করাব একটা?
— এটা আবার ফিল্ম সোসাইটি-এর সঙ্গে কি সম্পর্ক?
— না না। ফিল্ম সোসাইটি না। জনসাধারণের জন্য কুইজ, যে কেউ আসতে পারবে।
— ও। বেশ তো। করাও। কোন দিন হল ফাঁকা দেখে নাও।
সোমনাথ'দার কথা-ই শেষ কথা। শুধু প্রথামাফিক একটা চিঠি। প্রাক-ফেসবুক যুগে মেমারি-বাঁকুড়া থেকেও লোক এসেছিল বোলপুরে কুইজে। ছবি দেখানো, ফিল্ম সোসাইটি চালানো — এ-সবে সোমনাথ'দার কাছে যা সাহায্য পেয়েছি আমরা, তা লিখে শেষ করতে পারবো না।
— তুমি ফ্রি আছো?
— আপনি ডেকেছেন, কি আর কাজ থাকতে পারে?
— ___-এর স্কুলের একটা অনুষ্ঠান আছে। একটু সঞ্চালনা করে দিতে হবে।
তখন আমি ছাত্র, আকাশবাণীতে গলা বেচে খাই। এক সন্ধ্যায় আকাশবাণীতে কাজ করলে জোটে ৭৫ টাকা। দিনমজুরির মত সন্ধ্যা-মজুরি।
— কিন্তু এর জন্য কোনও পয়সা পাবে না।
— সে না হয় দেবেন না! আকাশবাণী তো ৭৫ টাকা দিচ্ছে পাঁচ ঘন্টার অনুষ্ঠান সঞ্চালনাতে!
— বলো কি! এতো কম?
— ছাড়ুন তো! সবাই গরিব হয়েই থাকবো।
এর ক'দিন পরের কথা। মেলার মাঠে সে'বার ফুল-মেলার আসর। সোমনাথ'দা, সুধাংশু শীল এবং আরও অনেকে। আমার আবার ডাক পড়েছে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সঞ্চালনার। ফুল নিয়ে রবীন্দ্রসংগীত আর অনেক আলোচনা শেষ। আমি ঝোলা গুছিয়ে নেমেছি মঞ্চ থেকে। উদ্যোক্তাদের একজন এসে হাতে ধরালেন সাদা খাম। সোমনাথ'দা কারও সঙ্গে কথার ফাঁকে আড় চোখে দেখলেন। একটা হাসি।
মিলিয়ে যাচ্ছে। হাসিটা মিলিয়ে যাচ্ছে। বাংলা টিভি চ্যানেলের লাইভ নোটিফিকেশন ফেসবুকে। সাদা চাদরে মোড়া শরীর। লাল শুধু সেলামে।
শান্তিনিকেতনে যখন পড়ি, কলকাতার এক রাজনৈতিক আঁতেল বলেছিলেন, তোমাদের তো নাথের জায়গা — রবীন্দ্রনাথ আর সোমনাথ।
সত্যি। একজনকে দেখিনি, অনুভব করেছি নাথ।
অন্য নাথের কাজ দেখেছি, ক্ষয়িষ্ণু সময়ে নিরলস কাজ করে যাওয়া — সবার জন্য।
![]() |
| সোমনাথ'দা। ছবি ইন্টারনেট থেকে। ছবির সত্ত্ব আমার নয়। |

Great write-up. First hand accounts are always engaging. Came to know a little bit about him and a little bit about you
ReplyDeleteThanks Tathagata.
Deleteঅসাধারণ লেখা।
ReplyDeleteধন্যবাদ। মানুষটাই অসাধারণ ছিলেন। লেখা সামান্যই।
Deleteমন ছুঁয়ে যায়।
ReplyDeleteধন্যবাদ।
Delete