Wednesday, 12 April 2017

ছোটবেলায় ছবি দেখা

বাংলা ছায়াছবি তখন চলছে এক যুগসন্ধির মধ্যে দিয়ে। বিশেষত, ছোটদের নিয়ে হলে গিয়ে ছবি দেখার ছবির সংখ্যা খুব বেশি ছিল না; থাকলেও মধ্য '৮০-তে কটা ওরকম ছবি আসত মফস্বলের হলগুলিতে? আমার তো মনে পড়ে না 'ফটিকচাঁদ' কখনো দুর্গাপুরের চিত্রালয় বা দুর্গাপুর সিনেমা (ডিসি)-তে পৌঁছেছিল! ঐ সময়ে আমরা দুর্গাপুরে থাকি; ছোটদের বিনোদনের জন্য শুধুই পার্ক — কুমারমঙ্গলম পার্ক, ডিয়ার পার্ক আর ডিয়ার পার্কের টয় ট্রেন। বড়দের জন্য 'সাগর' আসে ডিসি-তে, চিত্রালয়ে 'শত্রু' করে সিলভার জুবিলী, শুধু কোনও ভূতের রাজা বর দিতে আসে না আমাদের আর।





পানাগড়ের অবস্থাও তথৈবচ। দুর্গাপুরে যখন ছিলাম, তখন অবশ্যি আমার ছবি দেখার বয়স হয়নি। কিন্তু আমরা — আমি আর দিদি — বায়না ধরলাম মা-এর কাছে আমাদের হলে নিয়ে যেতেই হবে। বিশেষত মা আর পাশের বাড়ির কাকিমারা যখন সবাই মিলে একদিন শ্রীদেবীর 'নাগিন' দেখে এল ডিসি-তে, তখন আমাদের জোর গেল বেড়ে। কিছুটা বাধ্য হয়েই মা নিয়ে গেল পানাগড় স্টেশনের ওপারে কবিতা টকিজ-এ। 'রামায়ণ', যেখানে শমিত ভঞ্জ রাম। পোস্টারে এই 'শ্রেষ্ঠ্যাংশে' দেখে কারোর ঐ ছবি দেখতে যাওয়ার কথা নয়, কিন্তু আমাদের জেদের কাছে মা-এর কিছুই করার নেই। এখনকার মাল্টিপ্লেক্সে অভ্যস্ত ছেলেমেয়েরা ভাবতেও পারবে না গদি-বিহীন কাঠের চেয়ারে মাঝখানের রো-তে (যেখানে হলের দেয়ালে লাগানো হাতেগোনা কয়েকটা পাখার হাওয়া পৌঁছত না) বসে ছবি দেখার কি বিভীষিকা! শুধু 'রামায়ণ' নয়, আমরা এরপরেও কবিতা টকিজে দেখেছি 'রাজা হরিশ্চন্দ্র'।



কলকাতার হলে ছবি দেখার বায়না ধরলাম একবার বাবার কাছে। বিধানচন্দ্র রায়ের বাড়িতে যেতাম আমার টন্সিলাইটিসের চিকিৎসার জন্য। শীতকাল। ওয়েলিংটনের ভুটিয়া বাজার থেকে উলের ক্যাপ কিনে বাবা আমার অনেকদিনের আরেকটা আবদার মেটাল, আর তারপর হিন্দ-এ ছবি দেখা। বহু বছর পরে যখন ফিল্ম সোসাইটি মুভমেন্ট করি আমরা, তখন হিন্দ আর মেট্রো ছিল আমাদের ছবি দেখানোর জায়গা। একবিংশ শতাব্দীর প্রথম কয়েক বছর হিন্দ তার আগের রূপ ধরে রাখলেও এখন সেও মাল্টিপ্লেক্সে রূপান্তরিত। মালিকানা বদল হলেও মেট্রো আজ ইতিহাস; যেমন চ্যাপলিনের এখন একটি ইঁটও আর অবশিষ্ট নেই; নেই কোনো জ্যোতি-চিহ্ন; নেই-বাজারে কলকাতার একক-পর্দা হলের সংখ্যা এখন হয়তো হল অফ ফেমে। কালের নিয়মে দুঃখ করাও বিলাসিতা।



পানাগড়ের পাততাড়ি গুটিয়ে আমাদের বাড়ি বারাসতে ফিরে আবিষ্কার করলাম এখানকার বেশ কিছু হল। কিন্তু ছোটদের ছবি কৈ? এল, শেষ পর্যন্ত এল। 'গিলি গিলি গে', জাদুকর পি সি সরকার জুনিয়রের করা ছোটদের জন্য জাদুছবি। আমরা সবাই মিলে দেখতে গেলাম ছায়াবাণী-তে। বারাসতের পাঁচটি হলের অন্যতম এইটি। পরে লালি-সরমা-বিজয়া-তে ছবি দেখা হলেও কোনদিন বিধান হলে ঢোকা হয়নি। ছোটবেলা থেকে কখনো এখানে ভালো ছবি চলতেও দেখিনি। শুনেছি, ৭০-এর দশকে এখানে ভালো ছবি চলত। ঐ সময়ে একবার ছায়াছবির শেষে আমার মেজকাকু জাতীয় সঙ্গীতের সময় না দাঁড়িয়ে বিধান হল থেকে বেরিয়ে গেছিলেন, আর পুলিশ সঙ্গে সঙ্গে ধরে থানার গারদে! আমার উকিল ঠাকুরদা গিয়ে ছাড়িয়ে এনেছিলেন কিছু সময় পর।





মামার বাড়ি বহরমপুরে আমাদের ভারি মজা। গরমের ছুটি আর পুজোর ছুটিতে নিয়ম করে যাওয়া চাই। গরমকালে আমের পাহাড় হয়ে যেত বাড়ির একতলাতে। পুজোর সময় মা আর তাঁর সব বোনেরা মিলে দেখতে যেত ছবি। সাধারণত কল্পনা, বা কখনো মোহন বা সূর্য-তে। ১৯৮৭-তে পুজোতে  'একান্ত আপন' এল কল্পনা-তে এবং অবশ্যই ওরা সবাই ওখানে। আমার জন্য ফেরার সময় ছোটমণি কিনে আনল ক্যাপ-ফাটানো বন্দুক, আমাকে শান্ত করার জন্য। কিন্তু ছবি তো আমি দেখবই, হলে গিয়ে। সেটাও হলো। পরের বছর গ্রীষ্মাবকাশে আবার কল্পনা — আফ্রিকান সাফারি। ডিসকভারি-ন্যাটজিও-এর পূর্বসূরি। 


বিজয়া-তে 'টার্মিনেটর-২' বা অশোকনগরের রূপকথা-তে 'গুপী বাঘা ফিরে এল'-এর পাশাপাশি আরেক ধরণের ছবি দেখা চলত আমাদের। ১৯৮০-এর দশক শুধুমাত্র দূরদর্শনের নয়, ঐ সময়ে ভিডিও ক্যাসেট প্লেয়ার (ভিসিপি) তখন অনেক বাড়িতেই। আমাদের কোনোদিন ছিল না যদিও। পানাগড়ে প্রথম আমরা ভিডিও হলে ছবি দেখি — 'গুরুদক্ষিণা'। বাড়িতে ভিসিপি ভাড়া করে ছবি দেখার চল শুরু হল '৮০ দশকের শেষের দিকে। ভিসিপি আর ক্যাসেট পার্লারের ব্যবসা পুরো '৯০-এর দশক চলে; সিডি/ডিভিডি বাজার দখল করে নেওয়ার আগে। লেক টাউনে মেজপিসির বাড়িতে ভিসিপি ছিল — আকাই-এর। আকাই আর ফুনাই-এর বাজার তখন। একবার মেজপিসির বাড়িতে আমরা দেখলাম কিছু রাজেশ খান্না আর হলিউড। আমার প্রথম জেমস বন্ড ওখানেই দেখা: 'লাইসেন্স টু কিল'। 




ভিসিপি ঘিরে উত্তেজনা উঠতো চরমে — পুজোর সময়। দেবীর বোধনের সঙ্গে ষষ্ঠীর সকালে বুক করে এলাম ভিসিপি এমনকি ক্যাসেট-ও, কিন্তু পেলাম হয়তো নবমীর সন্ধ্যায়! এই অভিজ্ঞতা আমার মনে হয় ঐ সময়ে সকলের হয়েছে কখনো না কখনো। ১৯৯১-এর পুজো। 'আশিকি' পেলাম, 'সাজন' পেলাম না। সেবার বিসর্জন দেখতে আর ভাগীরথীর পারে যাওয়া হল না বাবার আদেশে। কারণ সহজেই অনুমেয় — অঙ্ক না করে 'আশিকি' দেখা আর মাসতুতো ভাই-এর সঙ্গে ছাদে ক্রিকেট খেলা! 


নরেন্দ্রপুরের স্কুলের হস্টেলে আমাদের ছবি দেখানো হত দু'ভাবে — ভিডিও ক্যাসেটে আর প্রজেক্টরে। প্রজেক্টরের-ও দু'রকম ভাগ — মাঠে বা অ্যাসেম্বলি হলে এবং স্বামী বিবেকানন্দ শতবার্ষিকী প্রেক্ষাগৃহে। ভিসিপি-তে আমরা দেখেছিলাম 'টার্মিনেটর-২', 'প্রহার' (প্রতি বছর দেখানো হত দেশাত্মবোধ তৈরির জন্য!) আর বেশ কিছু ছবি যা সব আমার মনেও নেই! প্রজেক্টরে দেখানো হয়েছিল মনে পড়ে 'খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন', 'কুহেলি', 'হীরের আংটি', 'গুপী বাঘা ফিরে এল', 'সোনার কেল্লা', 'সফেদ হাতি' এরকম কিছু ছবি। সব মিলিয়ে মন্দ লাগত না হস্টেলে বন্ধুদের সঙ্গে দেখতে! 





এখন যেমন হাতের মুঠোয় ছায়াছবি এসে গেছে মোবাইল ফোনের সঙ্গে, তা আমাদের ছোটবেলাতে ভাবাও যেত না। আমরাই মনে হয় শেষ প্রজন্ম যারা চলচিত্রের পর্দার বা স্ক্রিনের এবং ছবি প্রেক্ষণের এতরকম বিবর্তন দেখল — বড় পর্দা, টিভি পর্দা, ভিসিপি, ভিসিডি, ডিভিডি, ফিল্ম ক্যান, পেন ড্রাইভ, ডিজিটাল ছবি, মোবাইল ছবি, মেমরি কার্ড, ইউ টিউব, নেটফ্লিক্স... আর কি নয়! 


(ব্লগের ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত। ছবির সত্ত্ব চিত্রগ্রাহকের, আমার নয়। শুধু লেখার সত্ত্ব আমার) 

Thursday, 6 April 2017

লুকোচুরি

সেদিন মাঝরাতের ফ্লাইট। এয়ারপোর্টে পৌঁছে ফোন করলাম, তকাই ঘুমিয়েছে কিনা। শুয়ে পড়েছিল, ঘুমোয়নি। শমিকা বলল, তকাই ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে। আমার ছবি দেখছে কিন্তু মুখে কোনও কথা নেই। বাবা আবার ফোন হয়ে গেল। দু'দিন ছিলাম তো বাবার কোলে কোলে, জন্মদিনের কেক কাটা হল, কত আনন্দ হল...সব হারিয়ে গিয়ে আবার লোকটা ফোনের মধ্যে লুকিয়ে গেল?


বাবা ফোন হতে চায়নি। কোনও বাবা-ই চায়না। আমার বাবা চলে যেত দূর কোন রাজ্যে। গরম বা পুজোর ছুটির মধ্যে বকাঝকা-আদর-ভালোবাসার উপান্তে বাবার চলে যাওয়া — রিকশা করে স্টেশন, সেখান থেকে ট্রেন... তারপর আর জানতাম না কি হত। টেলিগ্রাম আসত টরেটক্কায়। ভালোভাবে পৌঁছনো সংবাদ। কখনো টেলিগ্রাম-ও আসত না — নীল রঙের ইনল্যান্ড চিঠি এল হয়তো এক সপ্তাহ পর। ইংরেজিতে একটা কথা আছে — No news is good news। অনেকটা ওরকমই ছিল আমাদের অবস্থা। আকাশবাণী কলকাতা 'ক' সকাল-সন্ধ্যা জানাতো কিছু দূরপাল্লা ট্রেনের খবর। আমরা অপেক্ষা করতাম কখন বলবে কামরূপ এক্সপ্রেসের কথা। বছরের কিছুদিন বাবা আর কামরূপ ছিল সমার্থক।




শুধু কি বাবা? একদিন দেখলাম সবাই কেমন পোস্টকার্ড হয়ে যাচ্ছে! যে দিদি ছাড়া আমার এক মুহূর্ত কাটতো না ছোটবেলাতে, সেও দেখলাম বাঘ-ছাপ ১৫ পয়সার পোস্টকার্ড হয়ে গেল! প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা মা হোমওয়ার্ক করাতো পাশে বসে... তারপর গল্প বলত... তারপর রাতের খাওয়া। এরকমই এক গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় মা দেখি আর হোমওয়ার্ক করায় না, চিঠি পাঠায় হলুদ কাগজে নীল লেখায়। কেবল আমার মা-এর নয়, আমার সহপাঠীরা সবাই পেয়েছে এমন চিঠি তাদের বাবা-মা-এর কাছ থেকে, সন্ধ্যাবেলায় হস্টেলের ডাইনিং হলে কোন না কোন দিন। অনেকেই কেঁদে ফেলত, কিন্তু আমার তো কান্না আসে না, ভাবনা আসে।






ভাবছিলাম; আজকের স্কাইপ এবং অন্যান্য ভিডিও কলের সময় কিভাবে আমরা আসা-যাওয়া করি স্ক্রিনের এপার-ওপার। কেউ হারায়, কেউ হারিয়ে যায়, আবার কেউ হারিয়ে ফেলে আপনারে। এখন কয়েকদিন তকাই-এর সঙ্গে স্কাইপ করছি না। ভিডিও অন করলেই সে চঞ্চল হয়ে পড়ছে — কখনো  ধরতে আসে আমাকে, কখনো বা ওর পছন্দের বল ! না পেলেই মুখ হয়ে যায় গোমড়া। প্রযুক্তি আমাদের কাছে এনে দিলেও এখনো অনেক দূরত্ব ঘোচাতে পারেনি। আঁকা-বাঁকা রাস্তা দিয়ে মা হারিয়ে যেত হস্টেলের মেন গেটের বাইরে আর এখন মাউস-চার্জার-ইউএসবি কেবলের জটে আমি আর তকাই লুকোচুরি খেলি। এই খেলাতে হার-জিৎ নেই, শুধু 3D থেকে 2D-তে রূপান্তর আছে।