Thursday, 6 April 2017

লুকোচুরি

সেদিন মাঝরাতের ফ্লাইট। এয়ারপোর্টে পৌঁছে ফোন করলাম, তকাই ঘুমিয়েছে কিনা। শুয়ে পড়েছিল, ঘুমোয়নি। শমিকা বলল, তকাই ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে। আমার ছবি দেখছে কিন্তু মুখে কোনও কথা নেই। বাবা আবার ফোন হয়ে গেল। দু'দিন ছিলাম তো বাবার কোলে কোলে, জন্মদিনের কেক কাটা হল, কত আনন্দ হল...সব হারিয়ে গিয়ে আবার লোকটা ফোনের মধ্যে লুকিয়ে গেল?


বাবা ফোন হতে চায়নি। কোনও বাবা-ই চায়না। আমার বাবা চলে যেত দূর কোন রাজ্যে। গরম বা পুজোর ছুটির মধ্যে বকাঝকা-আদর-ভালোবাসার উপান্তে বাবার চলে যাওয়া — রিকশা করে স্টেশন, সেখান থেকে ট্রেন... তারপর আর জানতাম না কি হত। টেলিগ্রাম আসত টরেটক্কায়। ভালোভাবে পৌঁছনো সংবাদ। কখনো টেলিগ্রাম-ও আসত না — নীল রঙের ইনল্যান্ড চিঠি এল হয়তো এক সপ্তাহ পর। ইংরেজিতে একটা কথা আছে — No news is good news। অনেকটা ওরকমই ছিল আমাদের অবস্থা। আকাশবাণী কলকাতা 'ক' সকাল-সন্ধ্যা জানাতো কিছু দূরপাল্লা ট্রেনের খবর। আমরা অপেক্ষা করতাম কখন বলবে কামরূপ এক্সপ্রেসের কথা। বছরের কিছুদিন বাবা আর কামরূপ ছিল সমার্থক।




শুধু কি বাবা? একদিন দেখলাম সবাই কেমন পোস্টকার্ড হয়ে যাচ্ছে! যে দিদি ছাড়া আমার এক মুহূর্ত কাটতো না ছোটবেলাতে, সেও দেখলাম বাঘ-ছাপ ১৫ পয়সার পোস্টকার্ড হয়ে গেল! প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা মা হোমওয়ার্ক করাতো পাশে বসে... তারপর গল্প বলত... তারপর রাতের খাওয়া। এরকমই এক গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় মা দেখি আর হোমওয়ার্ক করায় না, চিঠি পাঠায় হলুদ কাগজে নীল লেখায়। কেবল আমার মা-এর নয়, আমার সহপাঠীরা সবাই পেয়েছে এমন চিঠি তাদের বাবা-মা-এর কাছ থেকে, সন্ধ্যাবেলায় হস্টেলের ডাইনিং হলে কোন না কোন দিন। অনেকেই কেঁদে ফেলত, কিন্তু আমার তো কান্না আসে না, ভাবনা আসে।






ভাবছিলাম; আজকের স্কাইপ এবং অন্যান্য ভিডিও কলের সময় কিভাবে আমরা আসা-যাওয়া করি স্ক্রিনের এপার-ওপার। কেউ হারায়, কেউ হারিয়ে যায়, আবার কেউ হারিয়ে ফেলে আপনারে। এখন কয়েকদিন তকাই-এর সঙ্গে স্কাইপ করছি না। ভিডিও অন করলেই সে চঞ্চল হয়ে পড়ছে — কখনো  ধরতে আসে আমাকে, কখনো বা ওর পছন্দের বল ! না পেলেই মুখ হয়ে যায় গোমড়া। প্রযুক্তি আমাদের কাছে এনে দিলেও এখনো অনেক দূরত্ব ঘোচাতে পারেনি। আঁকা-বাঁকা রাস্তা দিয়ে মা হারিয়ে যেত হস্টেলের মেন গেটের বাইরে আর এখন মাউস-চার্জার-ইউএসবি কেবলের জটে আমি আর তকাই লুকোচুরি খেলি। এই খেলাতে হার-জিৎ নেই, শুধু 3D থেকে 2D-তে রূপান্তর আছে।


No comments:

Post a Comment