এক্সিস ব্যাংকের এটিএম'টা দেখেছিলাম আগেই, একবার দুর্গাপুর যাওয়ার সময়। রেশন দোকানের কাছেই। আমি আনতাম চিনি। দিদির হাতে কেরোসিনের জেরিক্যান। এক লিটারের, ডিলার যাতে ঠকাতে না পারে, মা বলে দিয়েছিল। আমি কিন্তু ঠকাতাম, মা'কে। এক মুঠো চিনি কম যেত বাড়িতে! সেদিন আমার স্কুল খুঁজছিলাম। গুগল ম্যাপস-এ। কেমন আছে আমার প্রথম স্কুল? তখনই সব উঠে এল...স্মৃতিগুলো। ম্যাপটাকে জুম্ ইন করলাম। ঐ তো! ছোট্ট দো'তলা স্কুল। সেইন্ট জুড'স স্কুল। মাঠটাও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। প্রথম স্কুল স্পোর্টস। অঙ্কে ভালো ছিলাম বলে মা বলেছিল অঙ্ক রেসে নাম দিতে। অন্যরকম সাজার ইচ্ছে ছিল না বলে কোনদিন 'যেমন-খুশি-সাজো'তে নাম দিইনি। হুইসেল পড়ার সাথেই লম্বা ছুট। মাঝখানে রাখা অঙ্কের কাগজ। সাবট্রাকশন।ও মা! ওপরে ছোট সংখ্যা, নিচে বড়! আমি তো রেজাল্ট লিখেছি মাইনাসে। আবার এক ছুটে ওপারে। হল না। অঙ্কের ম্যাডাম বললেন আমার উচিত ছিল বড় সংখ্যা থেকে ছোটকে সাজিয়ে নিয়ে বিয়োগ করতে! আমার প্রথম অঙ্ক বিয়োগান্ত।
স্কুল থেকে ফেরাটা ছিল মজার অভিজ্ঞতা। খাঁচা গাড়িতে লাল মাটির মোরামের ওপর দিয়ে। এই রাস্তা নিশ্চয়ই এখন কালো। কারণ আমরা যেখানে থাকতাম তার অদূরেই দেখছি একটা কলেজ হয়েছে — আর্যভট্ট ইনস্টিটিউট অফ ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড ম্যানেজমেন্ট। আমাদের বাড়িওয়ালার জমিতে। বাড়িওয়ালা বড় ভাল ছিলেন। আমার দৌরাত্ম সহ্য করেও কাকিমা আমাকে 'হরেকরকমবা' দেখতে দিতেন, টিভিতে। তখন শুধুই দূরদর্শন। ছোটদের অনুষ্ঠান হয়ে গেলে আমি দিদির সঙ্গে নিচে চলে আসতাম, পড়তে। আমাদের মতোই আরো এক ঘর ভাড়াটিয়া থাকত যাদের সঙ্গে আমার সখ্য ছিল দারুণ। মা যখন আমার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে আমাকে খুব মারত, হ্যাপি-বুম্বার মা তখন ছুটে আসত! বাবা তখন অনেক দূর, নাগাল্যান্ড। মা-এর ওপর খুব চাপ। দিদি এটা বুঝতো, আমি ছিলাম অবুঝ!
ঐ বয়সটা বোঝারও না। খেলার। গ্রামে দাপিয়ে বেড়ানোর। ঢালাইয়ে। ঢালাইটা আবার কি? সে এক মজার জায়গা। বিস্তর এক প্রান্তর, পুরোটা কংক্রিটে বাঁধানো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তৈরি, সবাই বলত। প্লেন নামত। প্লেন নামা আমিও দেখেছি। এখনো নামে। পানাগড়ের সেনা ছাউনির জন্য রানওয়ে আছে। ঢালাই কিন্তু পরিত্যক্ত রানওয়ে — অনেকটা ঋত্বিক ঘটকের সুবর্ণরেখার দৃশ্যে যা দেখা যায়। ওটা অবশ্য কলাইকুণ্ডাতে শ্যুটিং। ঢালাই ছিল আমাদের গ্রামের ছেলেপিলেদের প্রাণ। ওখানেই ক্রিকেট খেলা, ঘুড়ি ওড়ানো শেখা, শ্যুটিং রেঞ্জ-এর পিছনে লুকোচুরি, ছুটতে গিয়ে হাঁটু রক্তারক্তি... একদিন খবর এল প্লেন নামবে, রাজীব গান্ধীর প্লেন। তিনি তখন প্রধানমন্ত্রী। যাবেন শান্তিনিকেতন, সমাবর্তনে। তখন কি আর জানতাম এরকম সমাবর্তনে আমিও একদিন সপ্তপর্ণী পাব জওহর বেদিতে — তাও একবার না, দু'দু'বার!
সে প্লেন নামলো। সকলের সঙ্গে আমিও হাজির রাজীব দর্শনে। বছরখানেক আগেই ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীদের গুলিতে প্রাণ গিয়েছে ইন্দিরার। তাই আঁটোসাঁটো নিরাপত্তা। প্রথমে নামলো বেশ কিছু সাদা অ্যাম্বাসেডর, প্লেনের পেট থেকে! তারপর রাজীব-সোনিয়া। কত শত লোক। কিন্তু রাজীব গান্ধী ছিলেন জনতার প্রধানমন্ত্রী। সবার সঙ্গে হাত মেলাতে মেলাতে চললেন শান্তিনিকেতনের উদ্দেশে। আমরা ছোটরা পেলাম ক্যাডবেরি এক্লায়র্স — মুঠো-মুঠো! অভাবনীয় তখন... ছোট্ট গ্রামে আমরা মর্টন লজেন্স পাই শুধু! ভাগ্য ভালো থাকলে একটা দোকানে কখনো-সখনো পাওয়া যেত আমূল মিল্ক চকোলেট — সেটাও তখন সদ্য এসেছে মধ্যবিত্তের বাজারে। পকেট ভর্তি করে এক্লায়র্স নিয়ে এসে কদিন চলল খুব লজেন্স খাওয়া!
আরেকটা বিমানের কথা কিছুতেই ভুলতে পারিনা। ছোটবেলাতে যেমন হয় বিভিন্ন রকম শখ, আমারও ছিল হরেকরকম। তার মধ্যে অন্যতম দেশলাই-এর প্যাকেট জমানো। একদিন পল্টুমামা, যে আমাদের বাড়ির সবার সঙ্গেই ভাব জমিয়ে বেশ নিজেদের লোক হয়ে গেছিল, সে এসে খবর দিল একটা দেশলাই-ভর্তি লরি উল্টে গেছে জি টি রোডে। এই রাস্তাই এখনকার সোনালী চতুর্ভুজের পূর্বসূরি। আমি তো শুনেই দৌড় ! জানতাম বাড়ি ফিরে মার খাব মা-এর কাছে। কিন্তু আগে তো দেখতে হবে দেশলাই-এর প্যাকেট গুলো। রাস্তায় অনেক লোকের ভিড়। হতাহত কেউ নেই। শুধু রাস্তার একদিকে লক্ষাধিক দেশলাই-এর বাক্স। ওপরে লেখা বিমান, একটা প্লেনের ছবি আঁকা। সবাই দেখছি কুড়োতে লেগে গেছে পুলিশ তখনও আসেনি তাই! আমিও একটা প্যাকেট তুলে নিলুম। আমার সংগ্রহের জন্য। কিন্তু মজাটা অন্য জায়গাতে। পরের তিন-চার মাস যে দোকানেই দেশলাই কিনতে যেতাম, সেখানে ল্যাম্প-শিপ-ক্যান্ডল এসব না দিয়ে শুধুই বিমান দিত!
দেশলাই-এর প্যাকেট ছাড়াও আমার আরেকটা জমানোর শখ ছিল মার্বেল গুলি। তখন ১০ পয়সাতে ১০টা গুলি পাওয়া যেত। মাঝে-মাঝেই আমি ১০ পয়সার শোনপাপড়ি বা দানাদার না খেয়ে ১০টা রংবেরঙের গুলি কিনে আনতাম। এমনকি দানবাবার মেলাতেও খেলনা গাড়ির সঙ্গে গুলি কিনতাম! ফ্যারেক্স-এর এক কৌটো গুলি হয়ে গেছিল আমার। এরকম আরেক কৌটো হয়েছিল কাঁইবিচি — তেঁতুলের বিচি। সব একদিন চলে গেল। বাবা জানতে পেরে গেছিল। বছর তিনেক পানাগড়ে কাটানোর পর যখন বারাসত ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তখন বাসাবদলের প্রথম বলি হল আমার কৌটো দু'টো! খাট-টেবিল-বইপত্রের ম্যাটাডোরে ঠাঁই পায়নি আমার অনেক বছরের জমানো আনন্দমেলা, আর কিছু চাঁদমামা, কিছু অরণ্যদেব, কিছু বিক্রম-বেতাল।এদের সংখ্যা কম ছিল, কিন্তু আনন্দমেলা ছিল থরে-থরে সাজানো — তিব্বতে টিনটিন, লোহিত সাগরের হাঙর আর অজস্র গাবলু হাত পরিবর্তন হয়ে ঠোঙা হয়ে গেল। আর কারো জীবনে যেন এরকম কালো দিন না আসে — বাবা-মা-এর বদলির চাকরি কেন ছোটবেলার অভিশাপ হবে?
পানাগড় গ্রামের পর আমাদের পরের পর্ব কেটেছিল কাঁকসাতে, ২-৩ কিলোমিটার দূরে। এই বাড়ি তখন সবে হয়েছে। প্রাথমিক স্কুল-শিক্ষক হারু মাস্টার — সকলেই তাঁকে এই নামেই ডাকত আর তাঁর আসল নাম জানাই হয়নি কোনদিন — সবে তাঁর বাড়ি করেছেন কাঁকসাতে। আমরা যখন সেখানে ভাড়াটিয়া হয়ে যাই, তখনও কাজ অর্ধসমাপ্ত। মনে পড়ে, তখন শীতকাল। ছাদে ওঠার সিঁড়ি সবে ঢালাই হয়েছে। হারু মাস্টার সন্ধ্যে বেলাতে ৪-৫ ডিগ্রী ঠান্ডাতেও এসে জল দিত সেই শীতে। মুখ থেকে আওয়াজ বেরোচ্ছে — হু হু। আমরা জিজ্ঞেস করতাম কেন এতো কষ্ট করছ? উত্তর আসত, নিজের বাড়ি না হলে বুঝবে না গো তোমরা। বুঝেছিলাম এসব অনেক পরে। জানিনা এখন আর হারু মাস্টার বেঁচে আছেন কিনা। ওনার বাড়িতে আমাদের খুব স্বাধীনতা ছিল কারণ বাড়িওয়ালা থাকতেন না ওই বাড়িতে ! ভাড়াবাড়িতে যদি বাড়িওয়ালা না থাকেন, তার মজাই আলাদা! সে যে না থেকেছে সে জানবেও না!!
হারু মাস্টারের বাড়িতে আমাদের সঙ্গে আরেকটা ঘরে থাকতেন মা-এর দুই সহকর্মী — তপু মাসি আর শিখা মাসি। দুজনেই মা-এর থেকে ছোট। এঁরা দুজনই ছিলেন অবিবাহিত, আমৃত্যু। আমার বড় হওয়াতে এঁদের ভূমিকা ছিল অন্যরকম। একদিকে যেমন গিলি 'ডোরাকাটা জামা', অন্যদিকে 'দেখি নাই ফিরে'তে চোখ বোলাই। আমাদের ঘরে আনন্দমেলা, আর পাশের ঘরে দেশ। হয়তো বুঝি না সব, কিন্তু অবচেতনে তৈরি হয় ভালো লাগা, বিকাশ ভট্টাচার্য থেকে রামকিঙ্কর, সমরেশ বসুর হাত ধরে — ভাবাই যায় না! পরে যখন শান্তিনিকেতন যাই পড়াশুনো করতে, প্রথম যে বাড়িটা দেখতে যাই তা হল রামকিঙ্করের কোয়ার্টার। ভগ্নদশা, ভগ্ননীড় বিশ্ব-ভারতীতে। আবিষ্কার করি বলাকা-বিভাস, বিকাশ ভট্টাচার্যের বাড়ি। জানতামই না হয়তো এঁদের কথা যদি না ছোট থেকে দেশ-এর সঙ্গে পরিচয় হত। তপু মাসির কথা লিখেছিলাম অনেকদিন আগে আমার ব্লগ-এ। তখন তপু মাসি শেষশয্যায়, লড়াই করছে ক্যান্সারের সঙ্গে। শেষ দেখা। আর শিখা মাসির সঙ্গেও তাই। একটা লড়াই শেষে যখন অফিসে ফিরলেন, তখন আবার ক্যান্সারের প্রকোপে শেষ নিঃশ্বাস। ৩০ বছর আগের দিনগুলো ছিল না এমন। 'ভালোবাসার রাজপ্রাসাদে' 'জীবনখাতার প্রতিপাতায়' জারি ছিল হিসাব-নিকাশ। পত্রিকার সঙ্গে আমরা আদান-প্রদান করতাম মান্না-হেমন্ত-শ্যামল, লতা-আশা- ফিরোজা বেগম।
দেশ-এর পাতা ছাড়া আরও একটা জায়গাতে ছিল আমার অবাধ স্বাধীনতা। মা-এর অফিস। লক্ষ্মী ভবন, জি টি রোডের ধারে। দিদির তখন স্কুল থাকত সকাল ১১টা থেকে বিকেল পর্যন্ত। আমার সকালের স্কুল শেষে মা অনেকদিনই আমাকে নিয়ে চলে যেত অফিসে। সেখানে সারাদিন কাটিয়ে বাড়ি ফেরত। রোববারের সকাল ছিল রামায়ণ-ময়। তার রেশ চলত পুরো সপ্তাহ।এমনকি স্কুলের পাশের দোকানে পোস্টার পাওয়া যেত রাম-সীতা-হনুমান রূপী অরুন গভীল-দীপিকা চিখালিয়া-দারা সিংহের! কার বাড়িতে কত এরকম পোস্টার আছে তাই নিয়ে কাড়াকাড়ি! আজকের দিনে হরেক চ্যানেল আর সিরিয়াল-এর মধ্যে এসব ভাবাই যাবে না।জীবনটা অন্যরকম ছিল — আল ধরে ঘুরে বেড়ানো, দামোদরের ক্যানেল পার দিয়ে সকালে দৌড়নো, এক পাড়া থেকে অন্য পাড়াতে খেলতে যাওয়া এমনকি ২ টাকার টিকেট কেটে ভিডিও হলে 'ডিস্কো ডান্সার' বা 'গুরুদক্ষিণা' দেখা! পানাগড়ের একমাত্র সিনেমা হল কবিতাতে কখনো মা নিয়ে যেত 'রাজা হরিশ্চন্দ্র' বা শমিত ভঞ্জের বাংলা রামায়ণ দেখাতে। কিন্তু আমার আর দিদির বেশি পছন্দ ছিল ২ টাকায় 'মিলন তিথি' দেখার, পাড়ার সবাই মিলে, হাত-পা ছড়িয়ে!
এর পাশাপাশি শুরু হয়েছিল আমার তবলা শেখা। পাণ্ডে স্যার ছিলেন খুব কড়া। আমার মত বিচ্ছু একমাত্র পান্ডে স্যারকেই ভয় পেত। আমি দিদির সোমনাথদার গানের ক্লাসে সঙ্গত দিতাম তবলাতে। অনেক পরে যখন স্কুলে তবলাতে সর্বোচ্চ নম্বর আর বৃত্তি পেতাম, মনে পড়তো ছোটবেলাতে পান্ডে স্যারের টোকা — আঙুলের গাঁটে! পান্ডে স্যারকে কোনদিন আর বৃত্তির কথা বলাই হয়নি। যেমন বলা হয়নি বলাইমামাকে। ২০০৮ সালে একবার বলাইমামার সাইকেলের দোকানের সামনে গিয়ে ছোট বলগুলো খোঁজার কথা। ১৯৮৮-তে পেলে এখন কেন পাব না? শুনেছিলাম, বলাইমামার দোকান কবেই উঠে গেছে! অনেক কিছু উঠে গেলেও স্টেশন রোডের আশুতোষ মিষ্টান্ন ভান্ডার এখনও আছে। ওরা আপেল সন্দেশ করে নিশ্চয়ই আজও, না হলে আমার মত ভাইরা কি খাবে ভাইফোঁটার দিন?
বাবা যখন ছুটিতে বাড়ি আসত, তখন ছিল আমার নাওয়া-খাওয়া ভুলে পড়াশুনো করার সময়। বছরের বাকি সময়টা শুধুই খেলা আর বাবার শেষ করিয়ে যাওয়া পাঠক্রম ঝালাই দেওয়া। তবে বাবার কাছে বায়না যে করতাম না তা নয়, কিন্তু বাবা সবকিছু মোটেও মেনে নিত না। এরও ব্যতিক্রম ছিল। সেবার বাবা এসেছে নাগাল্যান্ড থেকে। গরমকাল। আমি আর দিদি বিকেলে বায়না ধরলাম গোল্ড স্পট খাব। বাবা আমাকে উপেক্ষা করতে পারলেও দিদিকে পারত না। নাছোড়বান্দা আমাদের দু'জনকে বাবা নিয়ে গেল দার্জিলিং মোড়ে যেখানে জি টি রোড থেকে গাড়িগুলো চলে যেত উত্তরবঙ্গের দিকে।
দার্জিলিং মোড়ের দোকানে পাওয়া যেত গোল্ড স্পট। অনেকদিন পরে, প্রায় বছর ২৫ তো হবেই, একদিন আবার দাঁড়ালাম ওখানে। গোল্ড স্পট এখন আর নেই। মিরিন্ডা এসে গেছে। ছোটবেলাতে চাকা না, আমার ভালো লাগত লরিগুলোর ড্রাইভ শ্যাফট দেখা। সেটাও আর দেখতে পেলাম না। বুঝলাম, অনেকটা বড় হয়ে গেছি। ছোটবেলাটা রেখে এসেছি মোরামের রাস্তায় আর আলের ধারে।
স্কুল থেকে ফেরাটা ছিল মজার অভিজ্ঞতা। খাঁচা গাড়িতে লাল মাটির মোরামের ওপর দিয়ে। এই রাস্তা নিশ্চয়ই এখন কালো। কারণ আমরা যেখানে থাকতাম তার অদূরেই দেখছি একটা কলেজ হয়েছে — আর্যভট্ট ইনস্টিটিউট অফ ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড ম্যানেজমেন্ট। আমাদের বাড়িওয়ালার জমিতে। বাড়িওয়ালা বড় ভাল ছিলেন। আমার দৌরাত্ম সহ্য করেও কাকিমা আমাকে 'হরেকরকমবা' দেখতে দিতেন, টিভিতে। তখন শুধুই দূরদর্শন। ছোটদের অনুষ্ঠান হয়ে গেলে আমি দিদির সঙ্গে নিচে চলে আসতাম, পড়তে। আমাদের মতোই আরো এক ঘর ভাড়াটিয়া থাকত যাদের সঙ্গে আমার সখ্য ছিল দারুণ। মা যখন আমার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে আমাকে খুব মারত, হ্যাপি-বুম্বার মা তখন ছুটে আসত! বাবা তখন অনেক দূর, নাগাল্যান্ড। মা-এর ওপর খুব চাপ। দিদি এটা বুঝতো, আমি ছিলাম অবুঝ!
ঐ বয়সটা বোঝারও না। খেলার। গ্রামে দাপিয়ে বেড়ানোর। ঢালাইয়ে। ঢালাইটা আবার কি? সে এক মজার জায়গা। বিস্তর এক প্রান্তর, পুরোটা কংক্রিটে বাঁধানো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তৈরি, সবাই বলত। প্লেন নামত। প্লেন নামা আমিও দেখেছি। এখনো নামে। পানাগড়ের সেনা ছাউনির জন্য রানওয়ে আছে। ঢালাই কিন্তু পরিত্যক্ত রানওয়ে — অনেকটা ঋত্বিক ঘটকের সুবর্ণরেখার দৃশ্যে যা দেখা যায়। ওটা অবশ্য কলাইকুণ্ডাতে শ্যুটিং। ঢালাই ছিল আমাদের গ্রামের ছেলেপিলেদের প্রাণ। ওখানেই ক্রিকেট খেলা, ঘুড়ি ওড়ানো শেখা, শ্যুটিং রেঞ্জ-এর পিছনে লুকোচুরি, ছুটতে গিয়ে হাঁটু রক্তারক্তি... একদিন খবর এল প্লেন নামবে, রাজীব গান্ধীর প্লেন। তিনি তখন প্রধানমন্ত্রী। যাবেন শান্তিনিকেতন, সমাবর্তনে। তখন কি আর জানতাম এরকম সমাবর্তনে আমিও একদিন সপ্তপর্ণী পাব জওহর বেদিতে — তাও একবার না, দু'দু'বার!
সে প্লেন নামলো। সকলের সঙ্গে আমিও হাজির রাজীব দর্শনে। বছরখানেক আগেই ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীদের গুলিতে প্রাণ গিয়েছে ইন্দিরার। তাই আঁটোসাঁটো নিরাপত্তা। প্রথমে নামলো বেশ কিছু সাদা অ্যাম্বাসেডর, প্লেনের পেট থেকে! তারপর রাজীব-সোনিয়া। কত শত লোক। কিন্তু রাজীব গান্ধী ছিলেন জনতার প্রধানমন্ত্রী। সবার সঙ্গে হাত মেলাতে মেলাতে চললেন শান্তিনিকেতনের উদ্দেশে। আমরা ছোটরা পেলাম ক্যাডবেরি এক্লায়র্স — মুঠো-মুঠো! অভাবনীয় তখন... ছোট্ট গ্রামে আমরা মর্টন লজেন্স পাই শুধু! ভাগ্য ভালো থাকলে একটা দোকানে কখনো-সখনো পাওয়া যেত আমূল মিল্ক চকোলেট — সেটাও তখন সদ্য এসেছে মধ্যবিত্তের বাজারে। পকেট ভর্তি করে এক্লায়র্স নিয়ে এসে কদিন চলল খুব লজেন্স খাওয়া!
আরেকটা বিমানের কথা কিছুতেই ভুলতে পারিনা। ছোটবেলাতে যেমন হয় বিভিন্ন রকম শখ, আমারও ছিল হরেকরকম। তার মধ্যে অন্যতম দেশলাই-এর প্যাকেট জমানো। একদিন পল্টুমামা, যে আমাদের বাড়ির সবার সঙ্গেই ভাব জমিয়ে বেশ নিজেদের লোক হয়ে গেছিল, সে এসে খবর দিল একটা দেশলাই-ভর্তি লরি উল্টে গেছে জি টি রোডে। এই রাস্তাই এখনকার সোনালী চতুর্ভুজের পূর্বসূরি। আমি তো শুনেই দৌড় ! জানতাম বাড়ি ফিরে মার খাব মা-এর কাছে। কিন্তু আগে তো দেখতে হবে দেশলাই-এর প্যাকেট গুলো। রাস্তায় অনেক লোকের ভিড়। হতাহত কেউ নেই। শুধু রাস্তার একদিকে লক্ষাধিক দেশলাই-এর বাক্স। ওপরে লেখা বিমান, একটা প্লেনের ছবি আঁকা। সবাই দেখছি কুড়োতে লেগে গেছে পুলিশ তখনও আসেনি তাই! আমিও একটা প্যাকেট তুলে নিলুম। আমার সংগ্রহের জন্য। কিন্তু মজাটা অন্য জায়গাতে। পরের তিন-চার মাস যে দোকানেই দেশলাই কিনতে যেতাম, সেখানে ল্যাম্প-শিপ-ক্যান্ডল এসব না দিয়ে শুধুই বিমান দিত!
দেশলাই-এর প্যাকেট ছাড়াও আমার আরেকটা জমানোর শখ ছিল মার্বেল গুলি। তখন ১০ পয়সাতে ১০টা গুলি পাওয়া যেত। মাঝে-মাঝেই আমি ১০ পয়সার শোনপাপড়ি বা দানাদার না খেয়ে ১০টা রংবেরঙের গুলি কিনে আনতাম। এমনকি দানবাবার মেলাতেও খেলনা গাড়ির সঙ্গে গুলি কিনতাম! ফ্যারেক্স-এর এক কৌটো গুলি হয়ে গেছিল আমার। এরকম আরেক কৌটো হয়েছিল কাঁইবিচি — তেঁতুলের বিচি। সব একদিন চলে গেল। বাবা জানতে পেরে গেছিল। বছর তিনেক পানাগড়ে কাটানোর পর যখন বারাসত ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তখন বাসাবদলের প্রথম বলি হল আমার কৌটো দু'টো! খাট-টেবিল-বইপত্রের ম্যাটাডোরে ঠাঁই পায়নি আমার অনেক বছরের জমানো আনন্দমেলা, আর কিছু চাঁদমামা, কিছু অরণ্যদেব, কিছু বিক্রম-বেতাল।এদের সংখ্যা কম ছিল, কিন্তু আনন্দমেলা ছিল থরে-থরে সাজানো — তিব্বতে টিনটিন, লোহিত সাগরের হাঙর আর অজস্র গাবলু হাত পরিবর্তন হয়ে ঠোঙা হয়ে গেল। আর কারো জীবনে যেন এরকম কালো দিন না আসে — বাবা-মা-এর বদলির চাকরি কেন ছোটবেলার অভিশাপ হবে?
পানাগড় গ্রামের পর আমাদের পরের পর্ব কেটেছিল কাঁকসাতে, ২-৩ কিলোমিটার দূরে। এই বাড়ি তখন সবে হয়েছে। প্রাথমিক স্কুল-শিক্ষক হারু মাস্টার — সকলেই তাঁকে এই নামেই ডাকত আর তাঁর আসল নাম জানাই হয়নি কোনদিন — সবে তাঁর বাড়ি করেছেন কাঁকসাতে। আমরা যখন সেখানে ভাড়াটিয়া হয়ে যাই, তখনও কাজ অর্ধসমাপ্ত। মনে পড়ে, তখন শীতকাল। ছাদে ওঠার সিঁড়ি সবে ঢালাই হয়েছে। হারু মাস্টার সন্ধ্যে বেলাতে ৪-৫ ডিগ্রী ঠান্ডাতেও এসে জল দিত সেই শীতে। মুখ থেকে আওয়াজ বেরোচ্ছে — হু হু। আমরা জিজ্ঞেস করতাম কেন এতো কষ্ট করছ? উত্তর আসত, নিজের বাড়ি না হলে বুঝবে না গো তোমরা। বুঝেছিলাম এসব অনেক পরে। জানিনা এখন আর হারু মাস্টার বেঁচে আছেন কিনা। ওনার বাড়িতে আমাদের খুব স্বাধীনতা ছিল কারণ বাড়িওয়ালা থাকতেন না ওই বাড়িতে ! ভাড়াবাড়িতে যদি বাড়িওয়ালা না থাকেন, তার মজাই আলাদা! সে যে না থেকেছে সে জানবেও না!!
হারু মাস্টারের বাড়িতে আমাদের সঙ্গে আরেকটা ঘরে থাকতেন মা-এর দুই সহকর্মী — তপু মাসি আর শিখা মাসি। দুজনেই মা-এর থেকে ছোট। এঁরা দুজনই ছিলেন অবিবাহিত, আমৃত্যু। আমার বড় হওয়াতে এঁদের ভূমিকা ছিল অন্যরকম। একদিকে যেমন গিলি 'ডোরাকাটা জামা', অন্যদিকে 'দেখি নাই ফিরে'তে চোখ বোলাই। আমাদের ঘরে আনন্দমেলা, আর পাশের ঘরে দেশ। হয়তো বুঝি না সব, কিন্তু অবচেতনে তৈরি হয় ভালো লাগা, বিকাশ ভট্টাচার্য থেকে রামকিঙ্কর, সমরেশ বসুর হাত ধরে — ভাবাই যায় না! পরে যখন শান্তিনিকেতন যাই পড়াশুনো করতে, প্রথম যে বাড়িটা দেখতে যাই তা হল রামকিঙ্করের কোয়ার্টার। ভগ্নদশা, ভগ্ননীড় বিশ্ব-ভারতীতে। আবিষ্কার করি বলাকা-বিভাস, বিকাশ ভট্টাচার্যের বাড়ি। জানতামই না হয়তো এঁদের কথা যদি না ছোট থেকে দেশ-এর সঙ্গে পরিচয় হত। তপু মাসির কথা লিখেছিলাম অনেকদিন আগে আমার ব্লগ-এ। তখন তপু মাসি শেষশয্যায়, লড়াই করছে ক্যান্সারের সঙ্গে। শেষ দেখা। আর শিখা মাসির সঙ্গেও তাই। একটা লড়াই শেষে যখন অফিসে ফিরলেন, তখন আবার ক্যান্সারের প্রকোপে শেষ নিঃশ্বাস। ৩০ বছর আগের দিনগুলো ছিল না এমন। 'ভালোবাসার রাজপ্রাসাদে' 'জীবনখাতার প্রতিপাতায়' জারি ছিল হিসাব-নিকাশ। পত্রিকার সঙ্গে আমরা আদান-প্রদান করতাম মান্না-হেমন্ত-শ্যামল, লতা-আশা- ফিরোজা বেগম।
দেশ-এর পাতা ছাড়া আরও একটা জায়গাতে ছিল আমার অবাধ স্বাধীনতা। মা-এর অফিস। লক্ষ্মী ভবন, জি টি রোডের ধারে। দিদির তখন স্কুল থাকত সকাল ১১টা থেকে বিকেল পর্যন্ত। আমার সকালের স্কুল শেষে মা অনেকদিনই আমাকে নিয়ে চলে যেত অফিসে। সেখানে সারাদিন কাটিয়ে বাড়ি ফেরত। রোববারের সকাল ছিল রামায়ণ-ময়। তার রেশ চলত পুরো সপ্তাহ।এমনকি স্কুলের পাশের দোকানে পোস্টার পাওয়া যেত রাম-সীতা-হনুমান রূপী অরুন গভীল-দীপিকা চিখালিয়া-দারা সিংহের! কার বাড়িতে কত এরকম পোস্টার আছে তাই নিয়ে কাড়াকাড়ি! আজকের দিনে হরেক চ্যানেল আর সিরিয়াল-এর মধ্যে এসব ভাবাই যাবে না।জীবনটা অন্যরকম ছিল — আল ধরে ঘুরে বেড়ানো, দামোদরের ক্যানেল পার দিয়ে সকালে দৌড়নো, এক পাড়া থেকে অন্য পাড়াতে খেলতে যাওয়া এমনকি ২ টাকার টিকেট কেটে ভিডিও হলে 'ডিস্কো ডান্সার' বা 'গুরুদক্ষিণা' দেখা! পানাগড়ের একমাত্র সিনেমা হল কবিতাতে কখনো মা নিয়ে যেত 'রাজা হরিশ্চন্দ্র' বা শমিত ভঞ্জের বাংলা রামায়ণ দেখাতে। কিন্তু আমার আর দিদির বেশি পছন্দ ছিল ২ টাকায় 'মিলন তিথি' দেখার, পাড়ার সবাই মিলে, হাত-পা ছড়িয়ে!
এর পাশাপাশি শুরু হয়েছিল আমার তবলা শেখা। পাণ্ডে স্যার ছিলেন খুব কড়া। আমার মত বিচ্ছু একমাত্র পান্ডে স্যারকেই ভয় পেত। আমি দিদির সোমনাথদার গানের ক্লাসে সঙ্গত দিতাম তবলাতে। অনেক পরে যখন স্কুলে তবলাতে সর্বোচ্চ নম্বর আর বৃত্তি পেতাম, মনে পড়তো ছোটবেলাতে পান্ডে স্যারের টোকা — আঙুলের গাঁটে! পান্ডে স্যারকে কোনদিন আর বৃত্তির কথা বলাই হয়নি। যেমন বলা হয়নি বলাইমামাকে। ২০০৮ সালে একবার বলাইমামার সাইকেলের দোকানের সামনে গিয়ে ছোট বলগুলো খোঁজার কথা। ১৯৮৮-তে পেলে এখন কেন পাব না? শুনেছিলাম, বলাইমামার দোকান কবেই উঠে গেছে! অনেক কিছু উঠে গেলেও স্টেশন রোডের আশুতোষ মিষ্টান্ন ভান্ডার এখনও আছে। ওরা আপেল সন্দেশ করে নিশ্চয়ই আজও, না হলে আমার মত ভাইরা কি খাবে ভাইফোঁটার দিন?
বাবা যখন ছুটিতে বাড়ি আসত, তখন ছিল আমার নাওয়া-খাওয়া ভুলে পড়াশুনো করার সময়। বছরের বাকি সময়টা শুধুই খেলা আর বাবার শেষ করিয়ে যাওয়া পাঠক্রম ঝালাই দেওয়া। তবে বাবার কাছে বায়না যে করতাম না তা নয়, কিন্তু বাবা সবকিছু মোটেও মেনে নিত না। এরও ব্যতিক্রম ছিল। সেবার বাবা এসেছে নাগাল্যান্ড থেকে। গরমকাল। আমি আর দিদি বিকেলে বায়না ধরলাম গোল্ড স্পট খাব। বাবা আমাকে উপেক্ষা করতে পারলেও দিদিকে পারত না। নাছোড়বান্দা আমাদের দু'জনকে বাবা নিয়ে গেল দার্জিলিং মোড়ে যেখানে জি টি রোড থেকে গাড়িগুলো চলে যেত উত্তরবঙ্গের দিকে।
দার্জিলিং মোড়ের দোকানে পাওয়া যেত গোল্ড স্পট। অনেকদিন পরে, প্রায় বছর ২৫ তো হবেই, একদিন আবার দাঁড়ালাম ওখানে। গোল্ড স্পট এখন আর নেই। মিরিন্ডা এসে গেছে। ছোটবেলাতে চাকা না, আমার ভালো লাগত লরিগুলোর ড্রাইভ শ্যাফট দেখা। সেটাও আর দেখতে পেলাম না। বুঝলাম, অনেকটা বড় হয়ে গেছি। ছোটবেলাটা রেখে এসেছি মোরামের রাস্তায় আর আলের ধারে।
No comments:
Post a Comment