ইনবক্স তো খোলা কিন্তু মন খোলা কি? কথা বলি বড়-বড়, লিখি তারও বেশি। কিন্তু কারোর মনের খবর কি রাখি?
এমনই বর্ষার রাতে বসে আছে হাসপাতালের বারান্দার এক বেঞ্চে। কেউ একজন। ভর্তি যে, সে তার এক বন্ধু। জ্বর। শ্বাসকষ্ট। আজ এই করোনাকবলিত দেশে সে বন্ধু কি জ্বরে আক্রান্ত? বর্ষায় কি কবিতা লিখছে, না কৃত্রিম শ্বাসপ্রক্রিয়া চলছে? খবর রাখেনি দু’জনের কেউ — কত বছর পার ইতিমধ্যে। ইনবক্স কিন্তু খোলা।
ফেসবুকে লাইকানোও জারি। তবু কি পাশে থাকার চেষ্টা করেনি ২০ বছরের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া বন্ধুর? না। একবারও জিজ্ঞাসা করেনি কেমন আছে সে। জানেই না কি করে পাশে থাকতে হয় — ফোন করবে না গল্প করবে চ্যাটে না ‘তোমায় গান শোনাবো’।এ’সব তো ইস্কুলে শেখায় না। তবুও বড় মুখে বলব ইনবক্স খোলা।
কোনও চিঠি আসে না। গয়না যা ছিল বিক্রি করে ছেলেকে বিদেশে পড়তে পাঠানো। বিলেত-ফেরত সেই ছেলে তৈরি করল নিজের সংস্থা, সংসার পাতল, কিন্তু মা-কে চিঠি লেখা আর হল না। প্রায় ২৫ বছর পর মা-এর মুখ শেষ দেখা, শ্মশানে। বোন এগিয়ে দেয় যত্ন করে রাখা এক বাণ্ডিল কাগজ। বিলেত থেকে শেষ পাঠানো পোস্টকার্ড, এয়ারমেলের খাম। ইনবক্স তো খোলা ছিল, ছেলে খবর নেয়নি।
“একসময় কতজনের CV forward করেছি যদি কোথাও কোনও কাজ পায়। সেদিন আমার চাকরি গেল কিন্তু নিজের অফিসের কেউ একবারও ফোন করে খবর নিল না কেমন আছি, কি করে সংসার চালাব; এদের এত connection কিন্তু একবারও বলল না CV-টা পাঠাও, দেখি কিছু করা যায় কি না।” এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে থামল ও। নিস্তব্ধতা গ্রাস করে ফোন... ফোনটা খোলা ছিল। মানবিক মুখটা বন্ধ ছিল, অনেকের।
এইরকম ছোট-বড় ঘটনা অগুনতি আমাদের প্রত্যেকের জীবনে। গত কয়েকদিন ধরে social media ছেয়ে গেছে ইনবক্স খোলা-ফোন খোলা ধরণের পোস্টে। কিন্তু আমরা ক'জনের খবর সত্যি রাখি। কার মনে কি চলছে, তা জানার চেষ্টা করি কি? সেদিন একজন লিখেছে, “দাদা কেন একবারও আমাদের সঙ্গে কথা বলল না? আমরা কি এতো দূরের?” উত্তর দেয়ারও কেউ নেই। মনখারাপ-একাকীত্ব থেকে অবসাদ হয়ে আত্মহত্যার পথ সুদীর্ঘ। অকস্মাৎ কোনও কিছু হয় কি? নিজের কাছের মানুষগুলো কেমন আছে? সেই খবর রাখার জন্য কোনও খোলা ডাকবাক্স লাগে না, প্রয়োজন পড়ে না হাজারো পোস্টের।
কথা বলাটা আসল। যার মনখারাপ সে তো বলবে না, আমাকেই বলতে হবে। একটু মানবিক হই। যোগাযোগ রাখার চেষ্টা পাশাপাশি বসে একে-অপরের পোস্ট লাইকানো নয়।
