— শান্তিনিকেতন গ্যাছো?
— না। ও তো বাবুদের জায়গা! তবে কলা ভবনে যাওয়ার একটা ইচ্ছে আছে।
— বেশ তো। তোমার তথ্যচিত্র দেখানোর ব্যবস্থা করি। ওখানে একটা ফিল্ম ক্লাব, বীক্ষণ, আমরা শুরু করেছিলাম। তার সদস্যদের ভালো লাগবে। সর্বোপরি, বিনয় মজুমদারকে নিয়ে এমন কাজ তো আগে হয়নি।
— আর হবেও না, বুঝলা? কলকাতার বাবুরা ওঁকে পাত্তা দেয়নি। ভাবতে পারো, একটা লোক সবার আড়ালে বসে অঙ্ক করে আর কবিতা লেখে। এরকম মানুষ তুমি দেখেছ কয়ডা?
— কিন্তু উনি তো অভিমানি। সাহিত্য সভাতে যাবেন না!
— কে বলেছে? কলকাতা মর্যাদা দেয় কবিকে? কত কবি-শিল্পী হারিয়ে গেলো ওদের জন্য...
ওরা কারা? এটা শঙ্করদাকে জিজ্ঞাসা করলে হাসতো শুধু, আর হাজারো আঁকা খুলে দেখাতো।
— আমার তো আঁকার কোনো প্রথাগত শিক্ষা নেই। বঙ্গবাসি কলেজ। তাই সাহস করে কলা ভবন-মুখো হইনি।
শঙ্করদা গিয়েছিল কলা ভবন, বীক্ষণের আমন্ত্রণে তথ্যচিত্র, 'অন্য আলো, অন্য আঁধার' দেখাতে। আমি শিবদাকে (শিবাদিত্য সেন) বলেছিলাম শঙ্করদার কথা। রতনে রতন চেনে। পরিচয় হল দুজনের। প্রান্ত কবির কথা প্রান্তিক ছবি-করিয়ে শোনালো শান্তিনিকেতনকে। সেদিন কি আনন্দ শঙ্করদার। আমাকে ফোন করে বলল সে কথা, আর বলল রামকিঙ্করের কলের বাঁশি, সাঁওতাল পরিবারের কথা। শিবদা যেদিন চলে গেল গত বছর, শঙ্করদা আমার ফেবু পোস্টের তলায় লিখল, "শিবদা আমাদের স্মৃতিতে থাকবেন। ওনার আমন্ত্রণেই প্রথম শান্তিনিকেতনে যাই।"
গতকাল ফেবু বলল, শঙ্করদা নেই। দু'সপ্তাহ সময় দিয়েছিল ক্যান্সার, বা একটু বেশি। কাউকে জানায়নি তেমন, বাড়ির লোকজন ছাড়া। এর মাঝেই কাজ করেছে। আমি সেদিন বাদামিতে। হোটেলে সকাল হোলো শঙ্করদার ছবি দেখে, ফেবুতেই। ওই সকালেই শেষ পোস্ট। ২৬শে জানুয়ারি তো প্রজাতন্ত্র দিবস, সেদিনই 'লাস্ট পোস্ট'? যুদ্ধ তো বাকি। পরদিন শেষ।
— জানো, ওরা কতটা যুদ্ধ করে?
— কারা?
— ইঁটভাটার মহিলারা। সারা দুপুর ধরে স্কেচ করলাম। কোলে বাচ্চা নিয়ে মা কাজ করছে, সে-ই মা আবার রান্না করছে, সন্ধ্যে নামলেই অন্ধকার, অত্যাচার।
— তো কি করবে তুমি?
— ছবি বানাবো। ওরা ঝাড়খণ্ড থেকে এসেছে। আবার চলে যাবে। আবার আসবে। কিন্তু ঘামঝরা এই ইতিহাস ধরে রাখা দরকার।
পাঁচ বছর ধরে চলল কাজ। তথ্যচিত্র 'পোড়া মাটি মুখ' তৈরি হোলো। সঙ্গে চলছে রাতভর ছবি আঁকা। আমার সাধ্যমত একটা ছোট লেখা লিখলাম। সে-ও প্রায় এগারো বছর আগে।
— করেছ কি? ইংরেজি কাগজে আমার নাম?
— মানে ঐ আর কি। তোমাদের মত মানুষদের জন্য যেটুকু পারি।
— প্রান্ত কথাটার মানে বোঝো? আমাদের কথা কেউ লেখে না, আর এটা অভিমানের কথা না, উপেক্ষিতর কথা।
— কিন্তু তোমার চলচিত্র আর রেখাচিত্র অন্য কথা বলে। তুমি মোটেও উপেক্ষিত নও।
— সে তুমি বুঝবা না।
মাঝে মাঝে আমরা হারিয়ে যাই। যে যার কাজে ব্যস্ত। হঠাৎ মোবাইলের পর্দায় ভেসে ওঠে, "মনে রেখো"। কোনওদিন ভাবতে পারিনি লিখতে হবে মনে রাখার কথা।
কত কথা মনে আসছে, সব লেখাও যায় না। যেমন, নতুন ফ্ল্যাট কিনেছি, শঙ্করদাকে বললাম। এসে দেখে বলল, একটা দেওয়াল আমার জন্য ছেড়ে দাও, ছবি আঁকবো। আমি বললুম, বেশ তো, আঁকো। তারপর আর আঁকলো না। সারারাত ধরে ভাবলো আঁকবে কিন্তু সকালে একটা বিড়ি ধরিয়ে নিচে চা-এর দোকানে চা খেয়ে ধাঁ! একদিন দুপুরে বাড়ি এসে আমার মা-এর হাতে রান্না খেয়ে বলে, আবার একদিন খাবো কাকিমা। কিন্তু আর এলো না! এরকম বিভিন্ন সময়ে শঙ্করদা দেখা দিয়েছে হঠাৎ আবার হারিয়েও গেছে তেমনই। শুধু এবার হারিয়ে গেল, আর দেখা হবে না।
— না। ও তো বাবুদের জায়গা! তবে কলা ভবনে যাওয়ার একটা ইচ্ছে আছে।
— বেশ তো। তোমার তথ্যচিত্র দেখানোর ব্যবস্থা করি। ওখানে একটা ফিল্ম ক্লাব, বীক্ষণ, আমরা শুরু করেছিলাম। তার সদস্যদের ভালো লাগবে। সর্বোপরি, বিনয় মজুমদারকে নিয়ে এমন কাজ তো আগে হয়নি।
— আর হবেও না, বুঝলা? কলকাতার বাবুরা ওঁকে পাত্তা দেয়নি। ভাবতে পারো, একটা লোক সবার আড়ালে বসে অঙ্ক করে আর কবিতা লেখে। এরকম মানুষ তুমি দেখেছ কয়ডা?
— কিন্তু উনি তো অভিমানি। সাহিত্য সভাতে যাবেন না!
— কে বলেছে? কলকাতা মর্যাদা দেয় কবিকে? কত কবি-শিল্পী হারিয়ে গেলো ওদের জন্য...
ওরা কারা? এটা শঙ্করদাকে জিজ্ঞাসা করলে হাসতো শুধু, আর হাজারো আঁকা খুলে দেখাতো।
— আমার তো আঁকার কোনো প্রথাগত শিক্ষা নেই। বঙ্গবাসি কলেজ। তাই সাহস করে কলা ভবন-মুখো হইনি।
শঙ্করদা গিয়েছিল কলা ভবন, বীক্ষণের আমন্ত্রণে তথ্যচিত্র, 'অন্য আলো, অন্য আঁধার' দেখাতে। আমি শিবদাকে (শিবাদিত্য সেন) বলেছিলাম শঙ্করদার কথা। রতনে রতন চেনে। পরিচয় হল দুজনের। প্রান্ত কবির কথা প্রান্তিক ছবি-করিয়ে শোনালো শান্তিনিকেতনকে। সেদিন কি আনন্দ শঙ্করদার। আমাকে ফোন করে বলল সে কথা, আর বলল রামকিঙ্করের কলের বাঁশি, সাঁওতাল পরিবারের কথা। শিবদা যেদিন চলে গেল গত বছর, শঙ্করদা আমার ফেবু পোস্টের তলায় লিখল, "শিবদা আমাদের স্মৃতিতে থাকবেন। ওনার আমন্ত্রণেই প্রথম শান্তিনিকেতনে যাই।"
গতকাল ফেবু বলল, শঙ্করদা নেই। দু'সপ্তাহ সময় দিয়েছিল ক্যান্সার, বা একটু বেশি। কাউকে জানায়নি তেমন, বাড়ির লোকজন ছাড়া। এর মাঝেই কাজ করেছে। আমি সেদিন বাদামিতে। হোটেলে সকাল হোলো শঙ্করদার ছবি দেখে, ফেবুতেই। ওই সকালেই শেষ পোস্ট। ২৬শে জানুয়ারি তো প্রজাতন্ত্র দিবস, সেদিনই 'লাস্ট পোস্ট'? যুদ্ধ তো বাকি। পরদিন শেষ।
— জানো, ওরা কতটা যুদ্ধ করে?
— কারা?
— ইঁটভাটার মহিলারা। সারা দুপুর ধরে স্কেচ করলাম। কোলে বাচ্চা নিয়ে মা কাজ করছে, সে-ই মা আবার রান্না করছে, সন্ধ্যে নামলেই অন্ধকার, অত্যাচার।
— তো কি করবে তুমি?
— ছবি বানাবো। ওরা ঝাড়খণ্ড থেকে এসেছে। আবার চলে যাবে। আবার আসবে। কিন্তু ঘামঝরা এই ইতিহাস ধরে রাখা দরকার।
পাঁচ বছর ধরে চলল কাজ। তথ্যচিত্র 'পোড়া মাটি মুখ' তৈরি হোলো। সঙ্গে চলছে রাতভর ছবি আঁকা। আমার সাধ্যমত একটা ছোট লেখা লিখলাম। সে-ও প্রায় এগারো বছর আগে।
— করেছ কি? ইংরেজি কাগজে আমার নাম?
— মানে ঐ আর কি। তোমাদের মত মানুষদের জন্য যেটুকু পারি।
— প্রান্ত কথাটার মানে বোঝো? আমাদের কথা কেউ লেখে না, আর এটা অভিমানের কথা না, উপেক্ষিতর কথা।
— কিন্তু তোমার চলচিত্র আর রেখাচিত্র অন্য কথা বলে। তুমি মোটেও উপেক্ষিত নও।
— সে তুমি বুঝবা না।
মাঝে মাঝে আমরা হারিয়ে যাই। যে যার কাজে ব্যস্ত। হঠাৎ মোবাইলের পর্দায় ভেসে ওঠে, "মনে রেখো"। কোনওদিন ভাবতে পারিনি লিখতে হবে মনে রাখার কথা।
কত কথা মনে আসছে, সব লেখাও যায় না। যেমন, নতুন ফ্ল্যাট কিনেছি, শঙ্করদাকে বললাম। এসে দেখে বলল, একটা দেওয়াল আমার জন্য ছেড়ে দাও, ছবি আঁকবো। আমি বললুম, বেশ তো, আঁকো। তারপর আর আঁকলো না। সারারাত ধরে ভাবলো আঁকবে কিন্তু সকালে একটা বিড়ি ধরিয়ে নিচে চা-এর দোকানে চা খেয়ে ধাঁ! একদিন দুপুরে বাড়ি এসে আমার মা-এর হাতে রান্না খেয়ে বলে, আবার একদিন খাবো কাকিমা। কিন্তু আর এলো না! এরকম বিভিন্ন সময়ে শঙ্করদা দেখা দিয়েছে হঠাৎ আবার হারিয়েও গেছে তেমনই। শুধু এবার হারিয়ে গেল, আর দেখা হবে না।


