Saturday, 4 July 2020

পাশবালিশ চর্চা

পাশবালিশ নিয়ে হৈচৈ করা বাঙালি পছন্দ করে না, এবং তা যদি রাজনৈতিক চাপানউতোরের পর্যায়ে চলে যায়, তা আমরা ভালোভাবে নিতে পারিনা! এর একটাই কারণ --- পাশবালিশ আমাদের আপনজন, চিরসখা।

সেদিন এক ইংরেজি কাগজে এক বাঙালি লিখেছেন পাশবালিশ নিয়ে অনেক কথা। অবাঙালি পাঠকদের জন্য তাকিয়া এবং ইংরেজিতে bolster শব্দটি ব্যবহার করেছেন। মুশকিল হল আভিধানিক অর্থ আর ব্যবহারিক প্রয়োগে বিস্তর পার্থক্য। লেখাটিতে ব্যবহার হয়েছে 'জলসাঘর' ছবির একটি স্থিরচিত্র। কিন্তু সেটি পাশবালিশ নয়, নিতান্ত তাকিয়া। তাকিয়ার ব্যবহার পুরনো --- নবাবি আমল থেকে চলে আসছে। ১৭৬০ সালে তৈরি মুর্শিদাবাদের বড়নগরের চারবাংলা মন্দিরের গায়ে টেরাকোটার কাজে তাকিয়া দেখা যায় --- বাবু আরাম করে তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে বসে বাঈজী নাচ উপভোগ করছেন। আবার, হুগলির গুপ্তিপাড়াতেও এরকম তাকিয়ার খোঁজ মেলে রাবণ আর মন্দোদরীর আখ্যানে, মন্দিরগাত্রে টেরাকোটার কাজে।

কিন্তু ঠিক কবে তাকিয়া বাবুদের বাহিরমহল থেকে আমবাঙালির অন্দরমহলে পাশবালিশে রূপান্তরিত হল তার কোনও সঠিক সন-তারিখ পাওয়া যায় না। ঊনবিংশ শতাব্দীতে আঁকা বাবুমহলের বেশ কিছু ছবিতেও তাকিয়া দেখতে পাই। হয়ত অন্দরমহলের ছবি আঁকার রেওয়াজ ছিল না বলেই পাশবালিশের সন্ধান পাওয়া যায় না। তবে বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখাতে পাশবালিশ এসেছে। গল্পগুচ্ছের 'অসম্ভব কথা'তে আমরা দিদিমার কাছে গল্প শোনার মাঝে পাই এই কথা --- আমি একটুখানি নড়িয়া-চড়িয়া পাশ-বালিশ আরও একটু সবলে জড়াইয়া ধরিয়া কহিলাম, “তার পরে?”।

এর ঠিক একশো বছর পার করে আরেকজন বাঁধলেন পাশবালিশ নিয়ে গান। কি করে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্ম এগিয়ে চলে কিন্তু ধ্রুবক সেই পাশবালিশ। গানের শেষ দুই কলিতে চন্দ্রিল ভট্টাচার্য লিখছেন --- "বাবা ও খোকা, কমন প্রেমিকা, দুজনে পাশবালিশ / তৃতীয় বিশ্ব, আদতে নিঃস্ব, গতি সেই পাশবালিশ।" চন্দ্রিল যদি পাশবালিশকে বিভিন্ন বলিউডি নায়িকার সঙ্গে তুলনা করে থাকেন, তবে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় 'পাত্রী চাই'তে লিখছেন --- "আমি তো খুব রাজি। কিন্তু খুড়ো আমার কানে কানে বলল, অমন হাঁ করে পাশবালিশটাকে দেখছিস কী? ও তো তোর মাসির বয়সি। পাশবালিশ! পাশবালিশ মানে হল শরীরে উঁচু-নিচু নেই।" আয়েশি জীবনচর্চা, আধুনিক সাহিত্য ও গণমাধ্যমের মধ্য দিয়ে মধ্যবিত্ত বাঙালির পাশবালিশ নিয়ে এক নতুন বোধোদয় হয় --- এই বস্তুটিকে কখনওই হাতছাড়া করা যাবে না। এমনকি বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে নতুন বৌ এসেছে বাপের বাড়ি থেকে ছোটবেলার পাশবালিশ নিয়ে --- এ নিছক গল্প নয়, সত্যি।

পাশবালিশ প্রেমের সবচেয়ে বড় নিদর্শন দেখিয়েছিল আমার এক বন্ধু। কলকাতা থেকে নিজের গাড়িতে মালপত্র তুলে নতুন শহরে চাকরি করতে যাচ্ছে সে। ওড়িশা-অন্ধ্রপ্রদেশের সীমানায় শেষ-ডিসেম্বরের শীতের রাতের অন্ধকারে গাড়ি দাঁড় করালো মাওবাদী মোকাবিলায় পারদর্শী বিশেষ বাহিনী। সমস্ত কাগজপত্র পরীক্ষার পর গাড়ির ভিতরে তল্লাশি চলছে --- ব্যাগ, সুটকেস, বাসনপত্র .... একমাত্র একজন একটু হিন্দি বোঝেন, বাকি সব তেলুগু ছাড়া বোঝেন না।  
"ইয়ে ক্যা হ্যায়? ইসকে অন্দর ক্যা হ্যায়?"
"ইয়ে পাশবালিশ হ্যায়।"
"তাকিয়া?"
"নাহি, পাশবালিশ।"
"ইয়ে বঙ্গালী লোগ কিউঁ তাকিয়া লেকে ঘুমতা হ্যায়!"
"আপকো সমঝ মে নাহি আয়েগা কভি।"   
(ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত ছবি। আমার স্বত্ত্ব নেই)

Tuesday, 30 June 2020

ইনবক্স তো খোলা...

ইনবক্স তো খোলা কিন্তু মন খোলা কি? কথা বলি বড়-বড়, লিখি তারও বেশি। কিন্তু কারোর মনের খবর কি রাখি? 

এমনই বর্ষার রাতে বসে আছে হাসপাতালের বারান্দার এক বেঞ্চে। কেউ একজন। ভর্তি যে, সে তার এক বন্ধু। জ্বর। শ্বাসকষ্ট। আজ এই করোনাকবলিত দেশে সে বন্ধু কি জ্বরে আক্রান্ত? বর্ষায় কি কবিতা লিখছে, না কৃত্রিম শ্বাসপ্রক্রিয়া চলছে? খবর রাখেনি দু’জনের কেউ — কত বছর পার ইতিমধ্যে। ইনবক্স কিন্তু খোলা।

ফেসবুকে লাইকানোও জারি। তবু কি পাশে থাকার চেষ্টা করেনি ২০ বছরের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া বন্ধুর? না। একবারও জিজ্ঞাসা করেনি কেমন আছে সে। জানেই না কি করে পাশে থাকতে হয় — ফোন করবে না গল্প করবে চ্যাটে না ‘তোমায় গান শোনাবো’।এ’সব তো ইস্কুলে শেখায় না। তবুও বড় মুখে বলব ইনবক্স খোলা। 

কোনও চিঠি আসে না। গয়না যা ছিল বিক্রি করে ছেলেকে বিদেশে পড়তে পাঠানো। বিলেত-ফেরত সেই ছেলে তৈরি করল নিজের সংস্থা, সংসার পাতল, কিন্তু মা-কে চিঠি লেখা আর হল না। প্রায় ২৫ বছর পর মা-এর মুখ শেষ দেখা, শ্মশানে। বোন এগিয়ে দেয় যত্ন করে রাখা এক বাণ্ডিল কাগজ। বিলেত থেকে শেষ পাঠানো পোস্টকার্ড, এয়ারমেলের খাম। ইনবক্স তো খোলা ছিল, ছেলে খবর নেয়নি। 

“একসময় কতজনের CV forward করেছি যদি কোথাও কোনও কাজ পায়। সেদিন আমার চাকরি গেল কিন্তু নিজের অফিসের কেউ একবারও ফোন করে খবর নিল না কেমন আছি, কি করে সংসার চালাব; এদের এত connection কিন্তু একবারও বলল না CV-টা পাঠাও, দেখি কিছু করা যায় কি না।” এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে থামল ও। নিস্তব্ধতা গ্রাস করে ফোন... ফোনটা খোলা ছিল। মানবিক মুখটা বন্ধ ছিল, অনেকের।

এইরকম ছোট-বড় ঘটনা অগুনতি আমাদের প্রত্যেকের জীবনে। গত কয়েকদিন ধরে social media ছেয়ে গেছে ইনবক্স খোলা-ফোন খোলা ধরণের পোস্টে। কিন্তু আমরা ক'জনের খবর সত্যি রাখি। কার মনে কি চলছে, তা জানার চেষ্টা করি কি? সেদিন একজন লিখেছে, “দাদা কেন একবারও আমাদের সঙ্গে কথা বলল না? আমরা কি এতো দূরের?” উত্তর দেয়ারও কেউ নেই। মনখারাপ-একাকীত্ব থেকে অবসাদ হয়ে আত্মহত্যার পথ সুদীর্ঘ। অকস্মাৎ কোনও কিছু হয় কি? নিজের কাছের মানুষগুলো কেমন আছে? সেই খবর রাখার জন্য কোনও খোলা ডাকবাক্স লাগে না, প্রয়োজন পড়ে না হাজারো পোস্টের।

কথা বলাটা আসল। যার মনখারাপ সে তো বলবে না, আমাকেই বলতে হবে। একটু মানবিক হই। যোগাযোগ রাখার চেষ্টা পাশাপাশি বসে একে-অপরের পোস্ট লাইকানো নয়। 


Thursday, 23 April 2020

বন্দী সময়ের কথা

(অভিজ্ঞতাগুলি লিখে না রাখলে পরে হয়ত ভুলে যাব)


মৃত্যু।


— আপনি একদম ঘরে ঢুকে পড়ুন। বেরোবেন না। 
— একবার দেখা করা যেত না?
— না না, আপনি ঠিক পাশের ফ্ল্যাটেই থাকেন তো। যদি কোভিড কেস হয়!
— নাও তো হতে পারে! 
তবুও দেখা করা হয়নি ওঁদের সঙ্গে। ওঁর মা-এর বয়স হয়েছিল ৮৩। শেষকাজের সময় পুরোহিত দরকার ছিল তাঁদের ধর্মীয় নিয়মানুসারে। সে মুম্বইতে আটকে। একদিন পর এলেন তিনি। মর্গে একরাত কাটানোর পরেও চারজন পাওয়া দুষ্কর হয়ে গেল ওঁকে টাওয়ার অব সাইলেন্সে নিয়ে যাওয়ার জন্য। 


ক্ষুধা। 


বেগম হাঁটছে। বেগম আমাদের বাড়িতে কাজ করে; পুণেতে নয়, কলকাতার উপকণ্ঠে যেখানে আমাদের স্থায়ী বাস সেখানে। খবর পেয়েছে বাবা ঠাকুরতলাতে কুপন দেবে — একটু খাবার পাওয়া যাবে। হয়তো ইফতারটা হয়ে যাবে। সেহরিটা জানা নেই। প্রায় ৪০ডিগ্রি সেলসিয়সে হাঁটছে প্রৌঢ়া, অগুণতি ক্রোশ, যে’রকম ঐ পরিযায়ী শ্রমিকেরা হাঁটছে রাজপথ ধরে, প্রতিদিন। কব্জিতে নেই কোনও ফিটবিট। 


জীবিকা। 

বাইরের সব লোক ঢোকা বন্ধ আমাদের এই উচ্চ মধ্যবিত্তের ফ্ল্যাট কম্প্লেক্সে। একে পুণেতে আমরা হাউসিং সোসাইটি বলি।সেদিন বাইরে দেখা চন্দনের সঙ্গে।
— তুমি পশ্চিম মেদিনীপুরের গ্রামে ফিরে গেলে না কেন?
— ট্রেন বন্ধ হয়ে গেল হঠাৎ। তখনও মাস শেষ হয়নি। অনেকে টাকা দেবে বলেছিল। 
— পেলে সব?
— দিল। কিন্তু সেটা গত মাসের কথা। এপ্রিলে তো আপনাদের সোসাইটির একটাও গাড়ি ধুতে পারিনি। টাকা কি পাব?
আমার গাড়ি নেই। উত্তরও নেই। 


মামলা।


— শেষ মামলা ছিল ১৬ই মার্চ। ১৭ থেকে বন্ধ। 
— তাহলে? 
— কিভাবে চলছে জানি না। আর ঠিক দু’মাসের মত সম্বল আছে। পুরো মে মাসটা এরকম চললে...
আমার উকিল বন্ধু, আলিপুর কোর্টে মামলা লড়ে।


চাকরি।


— ৩০শে জুন পর্যন্ত কোনও টাকা দিতে পারবে না। ছুটিতে পাঠিয়ে দিয়েছে। এরপর চাকরি থাকবে কি না তাও জানি না।আপনার কাগজে লেখালেখির কাজ পাওয়া যাবে? গত বছর আপনার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল। ভালো লেগেছিল কথা বলে।বলেছিলেন কাজের সুযোগ হলে জানাবেন। কিছু হবে কি?
লিঙ্কডইনে পাওয়া এই মেসেজের একটা উত্তর দিই। তার উত্তর আসে কিছু ঘন্টা পর। 
— ভাগ্য ভালো যে আপনার মতো স্ত্রী-কন্যা সমেত আমার এরকম সংসার নেই। 


জন্মদিন।


— ড্যাডি আসতে পারবে না। বাস চলছে না, ট্রেন চলছে না, প্লেন চলছে না... কিচ্ছু চলছে না। আমার জন্মদিনে আসতে পারলনা, তোমার জন্মদিনে আসতে পারল না, পিপির জন্মদিনেও আসতে পারল না। ড্যাডি কি করে আসবে?
৩০শে মার্চ সমাবতী, ৩রা এপ্রিল শমিকা আর ৬ই এপ্রিল দিদির জন্মদিন কেটে গেল কোনও কেক না কেটেই... ভিডিও ফোনে। 


প্রতিবেশী। 


— গেট পর্যন্ত যেতে পারছি না, রাস্তা সব বন্ধ করে দিয়েছে পুলিশ। 
গ্যাসওয়ালার ফোন পেয়ে হন্তদন্ত হয়ে স্কুটারে ফাঁকা সিলিণ্ডার নিয়ে যাই রাস্তার মোড়ে। ভর্তিটা নিয়ে সোসাইটির গেটের কাছেনামিয়ে তারপর গড়ানোর পালা। কোমরের ব্যথায় ভারি কিছু বওয়া বারণ। 
— আরে চলুন! দু’জনে ধরে নিয়ে যাই। কতক্ষণ ধরে গোলগোল করবেন?
পুণেতে পরিষ্কার বাংলায় এমন কথা বলে এগিয়ে আসা মানুষটা তো আমার ডাক্তার প্রতিবেশী! কথা হয়না এমনিতে উভয়ের ব্যস্ততার জন্য। 


দোকানদার। 


— এই আপনার মত লোকদের জন্যই এনেছি। খরাডির ডিস্ট্রিবিউটর মাল পাঠাতে পারবে না। তাই ১২ কিলোমিটার দূর থেকে মাল আনলাম বাইকের পিছনে বসিয়ে। চার পেটি পেয়েছি। 
— তা, দাম কি বেশি নেবেন? অনেকেই নিচ্ছেন তো। 
— তা হয় না কি? আপনি লেখা দামই দেবেন। 
মনের আনন্দে আট প্যাকেট ম্যাগি নিয়ে বাড়ি এলাম — আট দিনের বিকেল। আগের দিন বহু চেষ্টাতেও কোথাও পাইনি। 


ইমেল।


— কেমন কাটছে পরিবারের সবার সঙ্গে বসে কাজ করা? পাঠিয়ে দিন আপনার আনন্দের ভিডিও আর ছবি। অফিসের সব সহকর্মীদের পাঠানো এরকম কোলাজ আগে কখনও হয়নি! 
এক নিমেষে চলে গেল বিনে।