সেদিন একটা বাংলা ছবির সারণি দিয়েছিলাম ফেসবুকে। চার সপ্তাহে প্রায় চল্লিশটা ছবি দেখেছিলাম একটা অ্যাপে। অবশ্যই এর একটা বড় কারণ ছিল না-দেখা ছবিগুলো দেখে ফেলা। অন্য একটা কারণও ছিল — গত সাত বছরে কিভাবে বাংলা চলচ্চিত্র পরিবর্তিত হয়েছে। সাত বছর আগে আমি শেষ হলে গিয়ে কোনও বাংলা ছবি দেখি।
ফেসবুকে তালিকাটি দেওয়ার পরেই বেশ কিছু মন্তব্য এল, সঙ্গে হরেকরকম ইমোজি। অনেকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আমি মানসিক ভাবে সুস্থ কি না! যখন আমরা ইংরেজি সাহিত্য পড়তাম, তখন থেকেই একটা অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল সবকিছুকেই টেক্সট হিসেবে দেখা। চলচ্চিত্র-চর্চা চলত তখন থেকেই। কলকাতার সিনে সেন্ট্রালের লাইফ মেম্বার হওয়ার কারণে সারা বছর বিভিন্ন দেশের ছবি দেখেছি বছরের পর বছর। আমার বন্ধুদের ক'জন তিউনিসিয়ার ছবি দেখেছে জানিনা, কিন্তু আমার মত কিছু পাগল, এই মনে করুন ১০-১২ জন সাতদিন ধরে দুপুরে নন্দন-২ হলে সেই চলচ্চিত্র উৎসব দেখেছি — বলা ভালো, গিলেছি। শান্তিনিকেতনে আমরা শুরু করেছিলাম বীক্ষণ ফিল্ম সোসাইটি আর তার আন্তর্জাতিক উৎসবের সময় ছবি যোগাতেন সিনে সেন্ট্রালের অলোকদা। ছবি কিউরেট করা থেকে শুরু করে কলকাতা থেকে ক্যান এনে বোলপুরের গীতাঞ্জলিতে দেখানোর কাজ করেছি দীর্ঘদিন। তখন কেউ পাগল বলেনি, বরং ৭৫০ সিটের প্রেক্ষাগৃহ পূর্ণ করে লোকজন দেখতে এসেছে, মাত্র ১০ টাকার টিকিটে।
তো এখন কেন ভাবল যে আমি পাগল? বা, আমার মত যারা বাংলা ছবি দেখে, তারাও কি পাগল? এই ৪০-টি ছবির পরিচালকরা আমাদের সময়ের সেরা বলা চলে। সেরা দু'রকম হয় — সত্যজিৎ রায়-ঋত্বিক ঘটক আর অন্যদিকে অজয় কর-অগ্রদূত। পৃথিবীর সব ভাষাতেই হয়ত এই দুই ধরণের ছবি হয়। আমাদের সময় তো অনেক ভালো যখন দেখি সৃজিত মুখোপাধ্যায়, রাজ চক্রবর্তী, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় এবং আরও অনেকেই হাউসফুল পাচ্ছেন। যদি মনে করি, চলচ্চিত্রের একমাত্র উদ্দেশ্য বিনোদন, তবে একথা অনস্বীকার্য যে আমি সব ছবিগুলো দেখে আনন্দ পেয়েছি। প্রত্যেকটা ছবির স্বাদ আলাদা, এমনকি পার্থক্য আছে 'চৌরঙ্গী' আর 'শাহজাহান রিজেন্সি'-তেও। 'বিবাহ অভিযান' না দেখলে জানতেও পারতাম না 'শাহজাহান রিজেন্সি'-তে নিজের গাওয়া গানের প্যারডি নিজেই কি করে করেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য! বিরসা-অরিন্দম-প্রতিম-নন্দিতা-শিবপ্রসাদ-ধ্রুব এঁরা প্রত্যেকে যথেষ্ট ভেবে এবং পরিশ্রম করে ছবিগুলো বানিয়েছেন, তা বোঝাই যায়। প্রত্যেকের নিজস্ব ধারা আছে।
তবে বাঙালি দর্শকের মুশকিলটা কোথায়? ভালো গল্প নেই? না কি পরিচালকরা গল্প বলতে পারছেন না? না কি ভালো অভিনেতা নেই? মানছি, উত্তম-সুচিত্রার মত জুটি আবার হবে না, কিন্তু মিমি-সোহম বা আবির-পায়েল? এঁরা কি খুব খারাপ? চিত্রনাট্য অনুসারে এঁদের অভিনয় খারাপ না, বরং এখনকার হিন্দি ছবিগুলোর তুলনাতে অনেকের অভিনয় বেশ ভালো — যেমন যীশু বা শাশ্বত বা আবির বা অনির্বাণ, আর সর্বোপরি প্রসেনজিৎ। মজার ব্যাপার হলো, বেশ কিছু ছবি জনপ্রিয় দক্ষিণ ভারতীয় ছবির পুনর্নির্মাণ। কিন্তু তাও নাকি আজকের বাঙালির পছন্দ না। এ কি আমাদের উন্নাসিকতা? আমরাও কি রবীন্দ্রনাথ আর সত্যজিতে আটকে পড়েছি? তবে কিন্তু বিপদ। রবীন্দ্রনাথের থেকে ভালো গীতিকার হয় না, মানছি; কিন্তু অনুপম বা দীপাংশু বা ঋতম কি খুব-খুউব খারাপ? গৌরীপ্রসন্ন-নচিকেতা-পুলকের যুগ ফিরে আসবে না জানি। যুগের সঙ্গে পরিবর্তনটাও তো চাই। কারণ দর্শকেরও তো পরিবর্তন হয়েছে।
সমস্যাটা হয়ত অন্য জায়গায়। আমার মনে হয় কয়েকটি কারণ — ১. টিভির ছোট পর্দাকে আপন করে নেওয়া ২. সেই জন্য হলে গিয়ে ছবি দেখার নেশা চলে যাওয়া ৩. এই নেশার ফলে মফস্সলে হলগুলোর অবনতি এবং ক্রমহ্রাসমান দর্শক ৪. কলকাতা ও শহরতলিতেও হল বাঁচিয়ে রাখতে বাংলা ছবির জায়গা কম দেওয়া ৫. বিভিন্ন অ্যাপে ছবি দেখা
এর প্রত্যেকটি কারণ একে-অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এর সঙ্গে যোগ করুন মিলেনিয়াল বাবা-মা'দের উত্তর-মিলেনিয়াল সন্তানদের 'জঙ্গল বুক' দেখাতে নিয়ে যাওয়া কিন্তু 'গুপ্তধনের সন্ধানে' দেখানো থেকে নিরস্ত করা। আমরা ধরেই নিয়েছি বাংলা ভাষার সব ছবি খারাপ — সে বড়দের হোক বা ছোটদের। আচ্ছা, বাংলা ছবির স্বর্ণযুগে একটা 'ভিঞ্চি দা' বা একটা 'সোয়েটার' বা 'বেলাশেষে' হয়েছে? যাঁরা একটু অন্যরকম ভাবেন বা ছবি করেন, তাঁদের ভাবনার স্বীকৃতির জন্যও তো ছবিগুলো দেখা যায়।
[চার সপ্তাহে দেখা প্রায় চল্লিশটা ছবির তালিকাটি আবার দিলাম —বর্ণ পরিচয়, শাহজাহান রিজেন্সি, চৌরঙ্গী, মুখার্জিদার বৌ, আহারে মন, বিবাহ অভিযান, রসগোল্লা, গুপ্তধনের সন্ধানে, দুর্গেশগড়ের গুপ্তধন, সোয়েটার, ভিঞ্চি দা, ভিলেন, বাপি বাড়ি যা, বোঝে না সে বোঝে না, চিরদিনই তুমি যে আমার, চিরদিনই তুমি যে আমার ২, এবার শবর, আসছে আবার শবর, গল্প হলেও সত্যি, প্রলয়, হেমলক সোসাইটি, শুধু তোমারই জন্য, ক্রিসক্রস, বাঙালি বাবু ইংলিশ মেম, বেলাশেষে, জামাই ৪২০, জাতিস্মর, চতুষ্কোণ, কাটমুণ্ডু, গ্যাংস্টার, কি করে তোকে বলবো, নির্বাক, এক যে ছিল রাজা, কেলোর কীর্তি, প্রাক্তন, টোটাল দাদাগিরি, জুলফিকার, হামি, পারব না আমি ছাড়তে তোকে ]
ফেসবুকে তালিকাটি দেওয়ার পরেই বেশ কিছু মন্তব্য এল, সঙ্গে হরেকরকম ইমোজি। অনেকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আমি মানসিক ভাবে সুস্থ কি না! যখন আমরা ইংরেজি সাহিত্য পড়তাম, তখন থেকেই একটা অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল সবকিছুকেই টেক্সট হিসেবে দেখা। চলচ্চিত্র-চর্চা চলত তখন থেকেই। কলকাতার সিনে সেন্ট্রালের লাইফ মেম্বার হওয়ার কারণে সারা বছর বিভিন্ন দেশের ছবি দেখেছি বছরের পর বছর। আমার বন্ধুদের ক'জন তিউনিসিয়ার ছবি দেখেছে জানিনা, কিন্তু আমার মত কিছু পাগল, এই মনে করুন ১০-১২ জন সাতদিন ধরে দুপুরে নন্দন-২ হলে সেই চলচ্চিত্র উৎসব দেখেছি — বলা ভালো, গিলেছি। শান্তিনিকেতনে আমরা শুরু করেছিলাম বীক্ষণ ফিল্ম সোসাইটি আর তার আন্তর্জাতিক উৎসবের সময় ছবি যোগাতেন সিনে সেন্ট্রালের অলোকদা। ছবি কিউরেট করা থেকে শুরু করে কলকাতা থেকে ক্যান এনে বোলপুরের গীতাঞ্জলিতে দেখানোর কাজ করেছি দীর্ঘদিন। তখন কেউ পাগল বলেনি, বরং ৭৫০ সিটের প্রেক্ষাগৃহ পূর্ণ করে লোকজন দেখতে এসেছে, মাত্র ১০ টাকার টিকিটে।
তো এখন কেন ভাবল যে আমি পাগল? বা, আমার মত যারা বাংলা ছবি দেখে, তারাও কি পাগল? এই ৪০-টি ছবির পরিচালকরা আমাদের সময়ের সেরা বলা চলে। সেরা দু'রকম হয় — সত্যজিৎ রায়-ঋত্বিক ঘটক আর অন্যদিকে অজয় কর-অগ্রদূত। পৃথিবীর সব ভাষাতেই হয়ত এই দুই ধরণের ছবি হয়। আমাদের সময় তো অনেক ভালো যখন দেখি সৃজিত মুখোপাধ্যায়, রাজ চক্রবর্তী, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় এবং আরও অনেকেই হাউসফুল পাচ্ছেন। যদি মনে করি, চলচ্চিত্রের একমাত্র উদ্দেশ্য বিনোদন, তবে একথা অনস্বীকার্য যে আমি সব ছবিগুলো দেখে আনন্দ পেয়েছি। প্রত্যেকটা ছবির স্বাদ আলাদা, এমনকি পার্থক্য আছে 'চৌরঙ্গী' আর 'শাহজাহান রিজেন্সি'-তেও। 'বিবাহ অভিযান' না দেখলে জানতেও পারতাম না 'শাহজাহান রিজেন্সি'-তে নিজের গাওয়া গানের প্যারডি নিজেই কি করে করেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য! বিরসা-অরিন্দম-প্রতিম-নন্দিতা-শিবপ্রসাদ-ধ্রুব এঁরা প্রত্যেকে যথেষ্ট ভেবে এবং পরিশ্রম করে ছবিগুলো বানিয়েছেন, তা বোঝাই যায়। প্রত্যেকের নিজস্ব ধারা আছে।
![]() |
| (ছবি ইন্টারনেট থেকে) |
তবে বাঙালি দর্শকের মুশকিলটা কোথায়? ভালো গল্প নেই? না কি পরিচালকরা গল্প বলতে পারছেন না? না কি ভালো অভিনেতা নেই? মানছি, উত্তম-সুচিত্রার মত জুটি আবার হবে না, কিন্তু মিমি-সোহম বা আবির-পায়েল? এঁরা কি খুব খারাপ? চিত্রনাট্য অনুসারে এঁদের অভিনয় খারাপ না, বরং এখনকার হিন্দি ছবিগুলোর তুলনাতে অনেকের অভিনয় বেশ ভালো — যেমন যীশু বা শাশ্বত বা আবির বা অনির্বাণ, আর সর্বোপরি প্রসেনজিৎ। মজার ব্যাপার হলো, বেশ কিছু ছবি জনপ্রিয় দক্ষিণ ভারতীয় ছবির পুনর্নির্মাণ। কিন্তু তাও নাকি আজকের বাঙালির পছন্দ না। এ কি আমাদের উন্নাসিকতা? আমরাও কি রবীন্দ্রনাথ আর সত্যজিতে আটকে পড়েছি? তবে কিন্তু বিপদ। রবীন্দ্রনাথের থেকে ভালো গীতিকার হয় না, মানছি; কিন্তু অনুপম বা দীপাংশু বা ঋতম কি খুব-খুউব খারাপ? গৌরীপ্রসন্ন-নচিকেতা-পুলকের যুগ ফিরে আসবে না জানি। যুগের সঙ্গে পরিবর্তনটাও তো চাই। কারণ দর্শকেরও তো পরিবর্তন হয়েছে।
সমস্যাটা হয়ত অন্য জায়গায়। আমার মনে হয় কয়েকটি কারণ — ১. টিভির ছোট পর্দাকে আপন করে নেওয়া ২. সেই জন্য হলে গিয়ে ছবি দেখার নেশা চলে যাওয়া ৩. এই নেশার ফলে মফস্সলে হলগুলোর অবনতি এবং ক্রমহ্রাসমান দর্শক ৪. কলকাতা ও শহরতলিতেও হল বাঁচিয়ে রাখতে বাংলা ছবির জায়গা কম দেওয়া ৫. বিভিন্ন অ্যাপে ছবি দেখা
এর প্রত্যেকটি কারণ একে-অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এর সঙ্গে যোগ করুন মিলেনিয়াল বাবা-মা'দের উত্তর-মিলেনিয়াল সন্তানদের 'জঙ্গল বুক' দেখাতে নিয়ে যাওয়া কিন্তু 'গুপ্তধনের সন্ধানে' দেখানো থেকে নিরস্ত করা। আমরা ধরেই নিয়েছি বাংলা ভাষার সব ছবি খারাপ — সে বড়দের হোক বা ছোটদের। আচ্ছা, বাংলা ছবির স্বর্ণযুগে একটা 'ভিঞ্চি দা' বা একটা 'সোয়েটার' বা 'বেলাশেষে' হয়েছে? যাঁরা একটু অন্যরকম ভাবেন বা ছবি করেন, তাঁদের ভাবনার স্বীকৃতির জন্যও তো ছবিগুলো দেখা যায়।
[চার সপ্তাহে দেখা প্রায় চল্লিশটা ছবির তালিকাটি আবার দিলাম —বর্ণ পরিচয়, শাহজাহান রিজেন্সি, চৌরঙ্গী, মুখার্জিদার বৌ, আহারে মন, বিবাহ অভিযান, রসগোল্লা, গুপ্তধনের সন্ধানে, দুর্গেশগড়ের গুপ্তধন, সোয়েটার, ভিঞ্চি দা, ভিলেন, বাপি বাড়ি যা, বোঝে না সে বোঝে না, চিরদিনই তুমি যে আমার, চিরদিনই তুমি যে আমার ২, এবার শবর, আসছে আবার শবর, গল্প হলেও সত্যি, প্রলয়, হেমলক সোসাইটি, শুধু তোমারই জন্য, ক্রিসক্রস, বাঙালি বাবু ইংলিশ মেম, বেলাশেষে, জামাই ৪২০, জাতিস্মর, চতুষ্কোণ, কাটমুণ্ডু, গ্যাংস্টার, কি করে তোকে বলবো, নির্বাক, এক যে ছিল রাজা, কেলোর কীর্তি, প্রাক্তন, টোটাল দাদাগিরি, জুলফিকার, হামি, পারব না আমি ছাড়তে তোকে ]






