Tuesday, 19 September 2017

ঘরে ফেরা

ঢালাই ঠিক কী বস্তু, সেটা বোঝার বয়স হয়নি তখনও। আমরা ওখানে ফুটবল-ক্রিকেট খেলি, ঘুড়ি ওড়াই, বড় ইটের গাঁথনিগুলোর পিছনে লুকোচুরি। লোকজন বলত, ওখানে নাকি প্লেন নামে। আমি কোনও দিন দেখিনি। বাবা বলেছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বানানো এই ঢালাই — রানওয়ে, যুদ্ধবিমান নামার। আমি যুদ্ধ বুঝি না — তখনও না, এখনও না — তায় আবার বিশ্বযুদ্ধ, এবং দ্বিতীয়।আমার বিশ্ব তখন ঢালাই-এ খেলতে যাওয়া। আমার সবচেয়ে পছন্দের খেলা মার্বেল, কালো মার্বেল। একটা ফায়ারিং রেঞ্জ ছিল ঢালাই-এর এক কোণে।সেখানে হয়তো সেনারা গুলি চালানোর মহড়া দিত কোনও এক সময়ে কিন্তু আমাদের গুলি হল মার্বেল ! সে দিয়ে মহড়া হয় না, যুদ্ধ হয় না — শুধু পাশের বাড়ির হ্যাপি-বুম্বার সঙ্গে ঝগড়া হয় খেলতে খেলতে।


সেদিন এরকম বাড়ি ফিরেছি। সন্ধ্যা নেমেছে চারপাশে। চোখে-মুখে সকালের রোদ মাখা আলো নিয়ে দিদি বলল, টিকিট হয়ে গিয়েছে।
— কিসের?
— তুই একটা হাবা।
— কেন?
— আবার কেন? ভুলে গিয়েছিস, আমরা পরশু বহরমপুর যাব?
— তাই?
— তুই সারাদিন খেলেই বেড়া। পরশু যে চতুর্থী। 





ডিএসটিসি-র বাস চলত দুর্গাপুর থেকে বহরমপুর। আমরা উঠতাম পানাগড়ের দার্জিলিং মোড় থেকে।পুজোর আগে ডিএসটিসি (দুর্গাপুর স্টেট ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশন, এখন অতীত) বাসের টিকিট পাওয়া ছিল দুঃসাধ্য।পানাগড়ের আমাদের পাড়ার একজন চাকরি করতেন ডিএসটিসি-তে। তিনি একদিন আগেই টিকিট দিয়ে যেতেন আমাদের। ‘ঘরে ফেরা’ সুষ্ঠু ও নিশ্চিত করতে এই ধরনের কত ‘আপনে’র সাহায্য আমরা বিভিন্ন সময় পেয়ে এসেছি; খুব আশ্চর্য ভাবে এঁরা কেউই আমাদের আপন সম্পর্কের ছিলেন না।এরকম ছিলেন কেষ্টদা। শিয়ালদহতে কারশেডের শান্টিং বিভাগে কাজ করতেন; আর আমরা যখন বারাসত থেকে বহরমপুর যেতাম, লালগোলা প্যাসেঞ্জারে জায়গা রেখে দিতেন! শুধু মা-এর বাপের বাড়ি যাত্রা সুগম করার জন্য ‘আপনার’ এই মানুষটির সে কী সদিচ্ছা। কোনও এক কুমোর শিল্পীর ঘর থেকে আমি-আপনি এরকমই আগ্রহে কতবার মা দূর্গা-কে এনেছি মণ্ডপে। সে কি কেবল পুজো করব বলে? না কি অভয়াশক্তি বলপ্রদায়িনী আমাদেরই মা।


— কিন্তু মা, এ তো চারিদিকে জল! আমাদের বাস যাবে কী করে?
— যাবে যাবে। এবার মা-এর নৌকোয় আগমন, তাই এমন অবস্থা।
— আমরা তো বাসে যাচ্ছি।
—  আমি মা দূর্গার কথা বলছি।
— ওঁর নৌকা কে চালায়? ড্রাইভার?
— মাঝি আছে দেবীর।
— কোথায়? আমরা দেখতে পাই না তো!
— পাবি। এবার কেউ না কেউ ঠিক করবেই দেখিস। মা আসছেন নৌকোয়।
—  অজানা বা অভ্যুদয়?
— করতে পারে। কিন্তু ওগুলো তো আমাদের বাড়ি থেকে অনেক দূর। বৃষ্টি কমলে দেখতে যাবো।
— রিকশা-তে?
— হ্যাঁ।
— কিন্তু স্বর্গধাম করে না কেন? বাড়ির কাছেই তো।
— ওরা মণ্ডপ নিয়ে বেশি ভাবে না। ওদের প্রতিমা-ই আসল। যামিনী পালের করা।
— যামিনী পাল কি আমাদের কেউ হয়? আমরাও তো পাল।
— না! আমাদের কেন হবে?
— যদি হত... 


অনেক কিছুই ভাবি যদি হত, কিন্তু হয় না। বাস চলে ধীরে, জল কেটে। সিউড়ি-তে যখন ১৫ মিনিটের জন্য দাঁড়িয়ে ছিল, তখনও বুঝতে পারিনি এত জল। সাঁইথিয়ার পরে ময়ূরাক্ষী পার হয়ে বুঝলাম এই ১৯৮৭-এর বন্যা কেন রেডিওতে খবরে সারাক্ষণ। পাট শুকোচ্ছে রাস্তার উপর, গরু নিয়ে উঁচু ডাঙায় ঘর বেঁধেছে মানুষ, ত্রিপলের ঘর। কান্দি, গোকর্ণ সব জলের তলায়। বৃষ্টি বন্ধ কিন্তু জল নামেনি তেমন। পরশু ষষ্ঠী... 


— মা, এরা কী করে পুজো করবে?
— খুব দুর্দশা। হয়তো হবে না এখানে এ-বছর।
— তাহলে দূর্গা ঠাকুর এ-বছর ঘরে ফিরবেন না?
— ফিরবেন। এখানে না।
— ওঁর কি অনেক ঘর? অনেক বাড়ি?
— অনেক। 


আমাদের বহরমপুরে একটাই বাড়ি — দিদার বাড়ি। সে বাড়িতে আমার অনেক আদর। সেখানে দিদা আমার জন্য মুড়কি করে রাখে, ছোটমণি বন্দুক আর ক্যাপ কিনে রাখে, অষ্টমীর সকালে অঞ্জলি দিতে যাওয়ার জামা কিনে দেয় ফুলমণি, রাঙামেসো পেতলের হাঁড়িতে নবমীর সকালে পোলাও করে খাওয়ায়, আর দশমীতে অঢেল ছানাবড়া। সেখানে কেউ তখন আর হয়তো বলে না, "যাও যাও গিরি আনিতে গৌরী, উমা নাকি বড় কেঁদেছে"। কিন্তু আগমনী সুর সেই বাড়িতে কখনও থামেওনি। দিদার সঙ্গে আচার্যপাড়া সার্বজনীনে খিচুড়ি ভোগ খাওয়া বা জগদম্বাতে সবুজ অসুর দেখতে যাওয়া বা সবাই মিলে ভাগীরথীতে বিসর্জনের সময় বাজি পোড়ানো হয় না এখন আর। হবেও না আমার; ১৯৯৮-এ কালীপুজোর ঠিক পরেই দিদা চলে গেল। অন্য বাড়ি। অন্য ফেরা। 


১৯৮৯। সেবার বহরমপুর গেলাম না আমরা। পানাগড় ছেড়ে আমরা তখন বারাসতে চলে এসেছি। আমাদের আদি বাড়ি। দূর্গার ঘরে ফেরার সময় হয়ে এল। শেঠপুকুর সার্বজনীনের বাঁশবাঁধা শেষ। দাদুর বাড়ির জানলা থেকে দেখা যেত শুধু কার্তিক ঠাকুর। বাইরে চাকরির সুবাদে বাবা বেশির ভাগ দূর্গাপুজোয় বাড়ি থেকে দূরে। সেবার বদলি হয়ে ঘরে, বাবার কাছে। শেঠপুকুর আর আমার স্কুলের মাঝে বিশাল জায়গা জুড়ে কাশফুল ফুটত। কাশের না কি বেশি কাছে যেতে নেই। রোঁয়া উড়ে মুখে যায় ঢুকে, দিদি বলত। আমি ভাবতাম, তাহলে অপু আর দূর্গা কী ভাবে কাশবনের মধ্যে দিয়ে ছুটছে? প্রশ্নের উত্তর যেখানে মেলে না, সেখানে একদিন হারিয়ে গেল দাদু। সেদিন ষষ্ঠী; ঢাকে পড়ল কাঠি; বোধন — দূর্গা আসছে ঘরে। সেদিন শ্রাদ্ধ, দাদুর। অন্য ঘরে ফেরা — হয়তো ঠাকুমার সঙ্গে দেখাও হবে।





হস্টেলে যারা থাকে, পুজোর সময় তাদের ঘরে ফেরা কেমন হয়? রামকৃষ্ণ মিশন নরেন্দ্রপুরে পড়তাম তখন। পুজোর ঠিক আগেই শেষ হত আমাদের ষান্মাসিক পরীক্ষা, আর মহালয়াতে "অয়ি গিরি নন্দিনী" বেঁধে দিত বাড়ি ফেরার সুর। এখনও ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয় সমবেত ১২০ জনের গাওয়া মহিষাসুরমর্দিনী স্তোত্র। ক্লাস সেভেন। তখনও কেবল রেডিওতেই শোনা যেত বীরেন্দ্রকৃষ্ণের "আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জীর..."উত্তম মহারাজের ঘরে ফিলিপস্-এর বড় রেডিও। সেদিন — বলা ভাল ভোররাতে — রেডিও বাইরে রাখা। সুপ্রীতি ঘোষের "...সে সুর শুনে, খুলে দিনু মন..." সেদিন আবার ভৌতবিজ্ঞান পরীক্ষা। কিন্তু মন ভেসে বেড়ায় সাদা মেঘের ভেলাতে। পরীক্ষা শেষ হলেই দুপুরের খাওয়া শেষে বাড়ি। মা আসবে নিতে। ২১৮ বাস। বারুইপুর থেকে নরেন্দ্রপুর হয়ে ধৰ্মতলা। যাওয়ার পথে কিছু ঠাকুর দেখে নেওয়া — বাসের জানালা থেকে। কোথাও প্রতিমা যাচ্ছে মণ্ডপে, কোথাও মণ্ডপ তখনও অর্ধসমাপ্ত। 


— দিদি জামা কিনে রেখেছে তোর জন্য।
— ক’টা?
— অনেক। বাবাও মানি অর্ডার করেছে। সেটাতে কাল কিনে দেব কিছু একটা।
— জিন্স কিনব।
— কী রঙের কিনবি?
— নীল। বাবা আসবে না পুজোতে?
— না। ছুটি পায়নি।
— বাবাদের অফিসে কেন ছুটি হয় না?
— আসবে হয়তো পুজোর পর।
— পুজোর পর কেউ ঘরে ফেরে?


সকালের বিশ্ব-ভারতীতে কী ভিড়! বসার জায়গা তো দূর অস্ত, দাঁড়ানোই যাচ্ছে না ভাল করে। ওদিক থেকে তমোঘ্ন জিজ্ঞেস করে, পেলে জায়গা? কেউ কি বর্ধমানে নামবে? আমি বলি, কেউনা। সবাই বলছে হাওড়া। মহালয়ার পরের সকাল। শান্তিনিকেতনে আমরা মহালয়াতে আনন্দ-বাজার করি। সে অন্য রকম মজা। সকাল থেকে দোকান বাঁধা, রান্নার বাজার করা, রান্নায় যাতে কারও অসুবিধা না হয় তা দেখা, বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ সেগুলো দোকানে এনে পসরা সাজিয়ে বসা, ক্যাশ সামলানো, তারপর রাত ন'টার সময় দোকান-পাট গুটিয়ে ঘরে ফেরা।নিজেদের দোকান, নিজেরাই ক্রেতা-বিক্রেতা, নিজেদের আনন্দ। এই আনন্দ-বাজারের লভ্যাংশ যায় বিশ্ব-ভারতীর সেবা বিভাগে; স্থানীয় গ্রামোন্নয়নে সাহায্য করে ওরা। পুজোর আনন্দ অনেকের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া। "আনন্দ সর্বকালে, দুঃখে বিপদ ভালে" — এ ভাবতে ভাবতে বোলপুর থেকে হাওড়া, সাড়ে তিন ঘণ্টার পথ চলে এলাম দাঁড়িয়ে। অন্যদের মতো আমি ট্যাক্সি বা বাস ধরতাম না সঙ্গে সঙ্গে। সাবওয়ে দিয়ে লঞ্চঘাট। ২ টাকার টিকিট। অনেক জায়গাতেই যাওয়া যায় সেই টিকিটে। আমি চড়ে পড়লুম বাগবাজারের লঞ্চে।  





হাঁটছি বাগবাজার ঘাটে নেমে। অলিগলি ঘুরে কুমোরটুলি। রং হচ্ছে। হালকা হলুদ। কেউ আবার শুকোচ্ছেন প্রতিমা, গ্যাস বার্নার দিয়ে। দূর্গা সপরিবারে তৈরি হচ্ছেন বাপের বাড়ি যাবেনবলে। সপরিবার কথাটা ঠিক না; শিব তো কৈলাসে! কুমোরটুলি পার্কের মণ্ডপকে ডাইনে রেখে হেঁটে চলেছি শোভাবাজারের দিকে। উঁকি মেরে রাজবাড়ির একচালা ঠাকুরের চালাটাই দেখা গেল। হাতিবাগান শুধু দেখলাম অপরিবর্তিত — সেই ভিড়, সেই ফুটপাথ-জোড়া দোকানের সারি, সেই মিত্রা-মিনার-দর্পনাতে ম্যাটিনি শো-এর লাইন, সেই সেন মহাশয়! পুজোর মুখে কলকাতা আরও এক আনন্দ-বাজার। ঝড়-জল-বৃষ্টি সব কিছু উপেক্ষা করেও পুজোয় কলকাতা ঘরে ফেরে, ঘরে ফেরায়।


প্রবাসে পুজোতে কি ঘরে ফেরার টান থাকে? অনেকবার ভেবেছি; বারে বারে ভাবি। ঘর কি কোনও চার দেওয়ালে আটকে থাকা ইট-পাথর-সিমেন্টের অবয়ব? নাকি নিজের মন? "মন চল নিজ নিকেতনে" — স্বামী বিবেকানন্দের খুব প্রিয় গান ছিল এটি। ঘর তৈরি করে ফেলি মনের মধ্যে। বাইরে থেকে পুজোর সময় ঘরে ফেরার ভাবনা তাই নিজের মনেই কোথাও হারিয়ে যায়। সে আমার মন। একবার দেখেছিলাম কী কষ্ট করে তামিলনাড়ুতে জুতোর কারখানায় কাজ করা শ্রমিকরা চেন্নাই মেলে ফিরছেন পুজোর আগে। কেউ যাবেন বাঁকুড়া, কেউ মালদহ,মুর্শিদাবাদ। আমি নেমেছি ভাইজাগ স্টেশনে একটু হাত-পা ছড়িয়ে নেব বলে। এসি লাগোয়া সাধারণ শ্রেণির কামরায় একজন মোবাইলে কথা বলছেন উচ্চ স্বরে — আসছি আসছি... ট্রেন একটু লেট, তা-ও কাল সকালেই ঘরে পৌঁছে যাব... তুমি যা বলেছিলে নিয়ে যাচ্ছি... মা-এর জন্য পুজোর শাড়ি... পরশু চতুর্থী, তাই না? 

No comments:

Post a Comment