Monday, 13 August 2018

প্রণাম সোমনাথ'দা

সোমনাথ'দার চোখে জল। জলের ধারা। আমি কোনওদিন দেখিনি। আমি নিশ্চিত, সর্বসমক্ষে ওঁর মত ব্যক্তিত্ব কাঁদছেন মানে মনের দুর্বল কোথাও আঘাত পেয়েছেন। এটা যে-সময়ের ঘটনা, তখনও সোমনাথ'দাকে ওরা বের করে দেয়নি। যদিও পার্টি তার ঠিক সাত মাস পরে ওটাই করবে যা পরের দশ বছরেও — ১৩ অগস্ট ২০১৮ পর্যন্ত — সোমনাথ'দা ভুলতে পারেননি।

— সোমনাথ'দা, চোখে জল?
— এত ভালো বানিয়েছে ছবিটা, মনটা কেমন করে উঠল।
— আপনি দিল্লিতে সারা দেশের সাংসদ'দের সামলান। আপনাকে কখনও দুর্বলচিত্ত মনে হয়নি...
— আসলে কি জানো, সংসদ তো কাজের জায়গা, সেখানে দৃঢ় থাকতেই হয়। কিন্তু এই ছবিটা আমাকে কেমন যেন করে দিল...

'তারে যমিন পর'।

না ওঁর সেদিন ছবি দেখতে যাওয়ার কথা, না আমার। আমি শান্তিনিকেতনে গেছি চাকরির ফাঁকে একদিনের ছুটিতে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে, উনিও সংসদের শীতকালীন অধিবেশন শেষে বোলপুরে। হঠাৎ দেখা। আমার মত অর্বাচীনকে চিনতে পারার কথা না। কিন্তু সোমনাথ'দা সবার খোঁজ রাখেন — ওঁর এলাকার ভোটার না হলেও! কিন্তু শত ব্যস্ততার মধ্যেও টুক-টাক কথা হয়ে যায়। গীতাঞ্জলিতে অবশ্য সেদিন সন্ধ্যের শো-এর পর বেশি কথা হয়নি।

গীতাঞ্জলি থেকেই সোমনাথ'দার সঙ্গে আমার পরিচয়। তখনও সাংবাদিক হইনি, সিপিএম-ও কোনওদিন করিনি। একটাই পরিচয় — সাংস্কৃতিক কাজ-কর্মে জড়িত ঝোলাওয়ালা ছাত্র, বীক্ষণের সঙ্গে যুক্ত, ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলন করে।

— সোমনাথ'দা, গীতাঞ্জলি উৎসবে কুইজ প্রতিযোগিতা করাব একটা?
— এটা আবার ফিল্ম সোসাইটি-এর সঙ্গে কি সম্পর্ক?
— না না। ফিল্ম সোসাইটি না। জনসাধারণের জন্য কুইজ, যে কেউ আসতে পারবে।
— ও। বেশ তো। করাও। কোন দিন হল ফাঁকা দেখে নাও।

সোমনাথ'দার কথা-ই শেষ কথা। শুধু প্রথামাফিক একটা চিঠি। প্রাক-ফেসবুক যুগে মেমারি-বাঁকুড়া থেকেও লোক এসেছিল বোলপুরে কুইজে। ছবি দেখানো, ফিল্ম সোসাইটি চালানো — এ-সবে সোমনাথ'দার কাছে যা সাহায্য পেয়েছি আমরা, তা লিখে শেষ করতে পারবো না।

— তুমি ফ্রি আছো?
— আপনি ডেকেছেন, কি আর কাজ থাকতে পারে?
— ___-এর স্কুলের একটা অনুষ্ঠান আছে। একটু সঞ্চালনা করে দিতে হবে।

তখন আমি ছাত্র, আকাশবাণীতে গলা বেচে খাই। এক সন্ধ্যায় আকাশবাণীতে কাজ করলে জোটে ৭৫ টাকা। দিনমজুরির মত সন্ধ্যা-মজুরি।

— কিন্তু এর জন্য কোনও পয়সা পাবে না।
— সে না হয় দেবেন না! আকাশবাণী তো ৭৫ টাকা দিচ্ছে পাঁচ ঘন্টার অনুষ্ঠান সঞ্চালনাতে!
— বলো কি! এতো কম?
— ছাড়ুন তো! সবাই গরিব হয়েই থাকবো।

এর ক'দিন পরের কথা। মেলার মাঠে সে'বার ফুল-মেলার আসর। সোমনাথ'দা, সুধাংশু শীল এবং আরও অনেকে। আমার আবার ডাক পড়েছে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সঞ্চালনার। ফুল নিয়ে রবীন্দ্রসংগীত আর অনেক আলোচনা শেষ। আমি ঝোলা গুছিয়ে নেমেছি মঞ্চ থেকে। উদ্যোক্তাদের একজন এসে হাতে ধরালেন সাদা খাম। সোমনাথ'দা কারও সঙ্গে কথার ফাঁকে আড় চোখে দেখলেন। একটা হাসি।

মিলিয়ে যাচ্ছে। হাসিটা মিলিয়ে যাচ্ছে। বাংলা টিভি চ্যানেলের লাইভ নোটিফিকেশন ফেসবুকে। সাদা চাদরে মোড়া শরীর। লাল শুধু সেলামে।
শান্তিনিকেতনে যখন পড়ি, কলকাতার এক রাজনৈতিক আঁতেল বলেছিলেন, তোমাদের তো নাথের জায়গা — রবীন্দ্রনাথ আর সোমনাথ।
সত্যি। একজনকে দেখিনি, অনুভব করেছি নাথ।
অন্য নাথের কাজ দেখেছি, ক্ষয়িষ্ণু সময়ে নিরলস কাজ করে যাওয়া — সবার জন্য।


সোমনাথ'দা। ছবি ইন্টারনেট থেকে। ছবির সত্ত্ব আমার নয়।  

Monday, 30 April 2018

জীবনের আখড়া

২১শে ফেব্রুয়ারি ২০১৪। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠ। অশীতিপর এক বৃদ্ধ আমার হাত ধরে একটা ছোট্ট চাপ দিলেন।
আমি তো "ছেড়ে দিন, ছেড়ে দিন" বলে চিৎকার জুড়েছি।
উনি বলছেন, "এ বিশ্বনাথ দত্তের হাত, গোয়াবাগানের আখড়ার।"
"আপনি এখনও কুস্তি করেন?"
"করি মানে? এক প্যাঁচে তোমাকে শুইয়ে দেব এখানে!"
সমবেত হাততালি আর হো-হো হাসি! পাশ থেকে ওঁর নাতি বলল, "দাদুর সঙ্গে মোটেও কিন্তু পাঞ্জা লড়তে যাবেন না।"
"আমি কি পাগল!"
বিশ্বনাথবাবু বলেন, "একদিন গোয়াবাগান আসুন, গোবর গুহর সঠিক উত্তরসূরিদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব।"
"আপনিও কি গোবর গুহর ছাত্র ছিলেন?"
"না তো কি? এমন গুরু আর কোথায় পাবো? তোমাদের প্রজন্ম তো ওঁর নামই শোনেনি!"


বিশ্বনাথবাবুর সঙ্গে আমি আর তর্কে গেলাম না গোবর গুহর — ইংরেজি বানানে পদবি লিখতেন গোহো — নাম ক'জন শুনেছে, বা শোনেনি। বছর কয়েক আগে আমিও তো জানতাম না গোবর গুহর নাম। তখন অবশ্য আমি স্কুলে পড়ি। প্রসিত'দা ডেকে পাঠালেন একদিন ক্লাসের পর।
— সেদিন কি একটা লেখার কথা বলছিলে?
— ঐ ফাল্গুনীতে একটা লেখা দেব ভাবছিলাম।
ফাল্গুনী আমাদের স্কুলের বার্ষিক পত্রিকা। সেখানে ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখা এক অন্যরকম অনুভূতি। আমাদের আবাসিক স্কুলের প্রত্যেক ভবনে একটি করে দেওয়াল পত্রিকা থাকতো। এছাড়াও ছোটদের স্কুলের দেওয়াল পত্রিকা, বড়দের স্কুলে আরও একটা, প্রত্যেক হবি ক্লাবের একটা করে — দেওয়াল পত্রিকার ছড়াছড়ি নরেন্দ্রপুরে। কোনওটা সাপ্তাহিক, কিছু-কিছু পাক্ষিক, আবার হয়তো মাসিক। কেউ লেখে বাংলায়, কেউ ইংরেজি, হিন্দি এমনকি সংস্কৃততেও! কিন্তু এ সব ছাড়িয়ে ফাল্গুনী অনন্য — মোটা আর্ট পেপারের প্রচ্ছদ, ঝকঝকে কাগজে ছাপা, ভাষা-সাহিত্যের শিক্ষকরা বাছাই করেন সেরার সেরা লেখাগুলো, আর সবচেয়ে বড় কথা ফাল্গুনী পৌঁছে যায় নরেন্দ্রপুরের সর্বত্র, যা কোনও দেওয়াল পত্রিকা পারে না!


— গত বছরও একটা লিখেছিলে না?
— হ্যাঁ। কিন্তু সেটা নির্বাচিত হয়নি ছাপানোর জন্য। 
হবে কি! তখন সদ্য এসেছি স্কুলে। বিজ্ঞপ্তি এলো ফাল্গুনীতে লেখা দেওয়ার জন্য। এখনও মনে আছে সবে মাত্র দুটো দেওয়াল পত্রিকাতে লিখেছি ছোটোখাটো কবিতা — চার-ছয় পংক্তির, যেমন লেখে ১০-১১ বছরের বাচ্চারা। তাতেই নিজেকে মনে করছি রবীন্দ্রনাথ। এক রবিবার বাবা-মা এসেছেন দেখা করতে আমার সঙ্গে। বললাম ফাল্গুনীর কথা। ভাবলাম গদ্য লিখি। বলেছে অনধিক ৬০০ শব্দে। বাবা বলল ভ্রমণ কাহিনী। সপ্তাহান্তে বাবা-মা আবার এলেন। দেখলাম। বাবা বললেন, "বাহ্! বেশ হয়েছে।" ওঁরা কখনও নিরুৎসাহ করেন না, কিন্তু কোথায় গলদ সেটাও বলেন না — বিশেষত সাহিত্যের ক্ষেত্রে। অঙ্ক হলে অবশ্য অন্য কথা!
— কোথায় যেন একটা গিয়েছিলে, তাই নিয়ে লেখা...
— হ্যাঁ। বুদ্ধগয়া-গয়া-রাজগীর-নালন্দা... খুব একটা ভালো হয়নি হয়ত।
— সবসময় বড় লেখার জায়গা হয় না।
— এবছর কি একটা কবিতা দেব প্রসিত'দা? অভেদানন্দ ভবনের দেওয়াল...
— না না। কবিতা অনেক পাই আমরা। একটা নিবন্ধ লিখবে?
— লিখতে পারি।
— 'পারি' না। লিখবে যদি বল, আমি বিষয় বলে দিচ্ছি, পড়াশুনো করতে হবে। লাইব্রেরির পঞ্চানন'দাকে বলবে আমার কথা। উনি বইগুলো বের করে দেবেন।


হাতে চিরকুট নিয়ে দৌড়লাম লাইব্রেরিতে। পঞ্চানন'দাকে দিলাম। দশ মিনিটের মধ্যে চারটে বই হাতে। বাংলার ব্যায়ামবীরদের নিয়ে লেখা। এর মধ্যে খুঁজতে হবে গোবর গুহ — প্রসিত'দার দেওয়া বিষয়। পঞ্চানন'দা লাইব্রেরিতে ধুতি-পাঞ্জাবি পরতেন, প্রসিত'দা এবং আরও অনেকের মত। কিন্তু লাইব্রেরির বাইরে উনি ছিলেন আমাদের স্কাউটের শিক্ষক — অনুশাসনের প্রতীক।
— বইগুলো পড়া হয়ে গেলে টেবিলেই রাখবে। আমি তুলে রাখবো।
— কিন্তু এ তো একদিনে পড়া হবে না!
— বেশ। আমি কিন্তু এক সপ্তাহের বেশি রিডিং রুমে রাখতেও পারবো না।
আমি পড়ি বিপদে। যেভাবে হোক শেষ করতে হবে নোট নেওয়া। এদিকে ক্লাসের পরে মাত্র দুটো পিরিয়ড হয়তো পাই, না হলে লাইব্রেরি বন্ধ হয়ে যাবে বিকেলে। যাই হোক, গোবর গুহ চলছে, গোয়াবাগান, কুস্তি শেখা, গামার সঙ্গে পার্ক সার্কাস ময়দানে বিখ্যাত লড়াই, তারও আগে বিশ্বজয়ী হওয়া... আমি নোট নেওয়া শেষ করলাম ৪-৫ দিনে। এরপর লেখার পালা। এর আগে কোনওদিন এরকম গবেষণা করে কিছু লিখিনি। ষষ্ঠ শ্রেণিতে এর বেশি করা সম্ভবও না!


— এত কিছু লিখেছ কেন? শব্দ সংখ্যা কত দেখেছ?
— না। 
— যে কোনও পত্রিকায় লেখার প্রথম শর্তই হচ্ছে, কত শব্দ লিখতে হবে। যেরকম চাওয়া হবে, তার মধ্যে তোমার ভাবনা প্রকাশ করতে হবে।
শুরু হল সম্পাদনার প্রথম পাঠ, প্রসিত'দার কাছে। মাজা-ঘষা চলছে গোবর গুহ'র। প্রায় বার চারেকের পর মোটামুটি একটা দাঁড়ালো ব্যাপারটা। প্রসিত'দার খুব আনন্দ। তার চেয়ে বেশি আনন্দ আমার — ফাল্গুনীতে বেরোবে আমার প্রথম লেখা, ছাপার অক্ষরে নিজের নাম!


এখন অনেক লেখা বেরোয়, নিজের নামে। উত্তেজনা কমে এসেছে, আনন্দও। অন্যের লেখা পুনর্লিখনে মজা বেশি পাই। এরকম আনন্দই কি পেতেন প্রসিত'দা? প্রসিত রায়চৌধুরী। ডক্টরেট। হতেই পারতেন অধ্যাপক। পড়াতে পারতেন কোনও বড় কলেজে। কিন্তু এসেছিলেন স্কুলে, রামকৃষ্ণ মিশনে, আমাদের কিছু শেখাতে। নিজেও লিখেছেন অনেক, গবেষণা করেছেন সোনারপুর-রাজপুর-হরিনাভির আঞ্চলিক ইতিহাস নিয়ে। বোড়াল-আদিগঙ্গার গল্প তো ওঁর কাছেই শোনা। আমার সহপাঠী আবির সে-দিন পাঠালো প্রসিত'দার ছবি, দেখা করতে গিয়েছিল। কোনও এক অজ্ঞাত কারণে ওঁর পেনশন নেই, বা বন্ধ। দুর্দশা। কষ্ট। নিঃসঙ্গতা গ্রাস করেছে। হয়ত সান্ত্বনা একটাই — কেউ কেউ তো লিখছে, লিখতে শিখেছে, পরের প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়েছে কালি-কলম... 


প্রসিত'দা এখন। আবিরের তোলা ছবি 

..............................................

© সুপ্রতিম পাল 

Monday, 20 November 2017

রফি আর গৌতমদা

वो जब याद आए बहुत याद आए
ग़म-ए-ज़िंदगी के अंधेरे में हमने
चिराग-ए-मुहब्बत जलाए बुझाए...

মুহম্মদ রফি। 'পরশমণি'। ১৯৬৩।

সেদিন মধ্যরাতে মেসেঞ্জারে ভেসে আসে রফি সাব। গৌতমদার হাত ধরে। ভেসে আসে সেই সময়। বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছে চারপাশ। রাস্তার পাশে এক মন্দিরে আশ্রয় নিয়েছি আমরা। কীর্ণাহারের কাছে মুণ্ডমালিনী মন্দির। এর অদূরে আমাদের ত্রিপল টাঙানো হয়েছিল — পিকনিকের রান্নার জন্য। জানুয়ারির আচমকা বৃষ্টি এসে এলোমেলো করে দিচ্ছে রান্নার তোড়জোড়। এলোমেলো সময়ে ভেসে আসে রফি, গৌতমদার গলায় —

दिल की कहानी पहुची ज़ुबां तक, किस को खबर अब पहुंचे कहाँ तक
प्यार के राही आये यहाँ तक, जायेंगे दिल की हद है जहाँ तक
तुम साथ दो तो चले हम आसमां तक
दिल में अरमां लिए, लाख तूफां लिए
आ गये, आ गये ...

আমাদের কোনও লতা নেই? 'হাসিনা মান জায়েগী'। কেউ কি গৌতমদার সঙ্গে গলা মেলাতে পারে না? ১৯৬৮-র লতা পাওয়া দুষ্কর ২০০০-এর ১৯-শে জানুয়ারী। একাই গেয়ে যান গৌতামদা। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গৌতম ঘোষাল। অনেকের মধ্যে থেকেও একা। অসময়ের বৃষ্টি উপেক্ষা করেও কেউ-কেউ হাতে হাত রেখে সর্ষেক্ষেতের আলপথ ধরে পাড়ি দিয়েছে আহমদপুর-কাটোয়া ছোটরেল লাইনের দিকে। গৌতমদা গাইছেন,

... मुसाफ़िर मैं तू मंज़िल है, मैं प्यासा हूँ तू सावन है
मेरी दुनिया ये नज़रें हैं, मेरी जन्नत ये दामन है...
लिखे जो ख़त तुझे
वो तेरी याद में
हज़ारों रंग के
नज़ारे बन गए ...

আমিনিয়াতে বিরিয়ানি খাওয়ার ইচ্ছে থাকলেও ছাত্রাবস্থায় পয়সার অভাবে কোনওদিন হয়ে ওঠেনি। একদিন অফিসে আসার আগে গেলুম খেতে। পাশের রফি-ভক্ত পানের দোকানে শুনি,

... मुहब्बत कर तो लें लेकिन, मुहब्बत रास आये भी
दिलों को बोझ लगते हैं, कभी ज़ुल्फ़ों के साये भी
हज़ारों ग़म हैं इस दुनिया में, अपने भी पराये भी
मुहब्बत ही का ग़म तन्हा नहीं, हम क्या करें ... 

পরশু রাতে গৌতমদা পাঠালেন এটাই — लुटे दिल में दिया जलता नहीं, हम क्या करें । तुम्ही कह दो, अब ऐ जाने-अदा, हम क्या करें...

আমি তখন খুব ছোট। বাবা কিনলেন ফিলিপসের টেপ রেকর্ডার। সে শুয়ে থাকতো। অনেক ক্যাসেটের সঙ্গে সাজানো 'হম কিসি সে কম নাহি-ইয়াদঁ কি বরাত'। বি-পিঠের দ্বিতীয় গান পনেরো বছর পর শান্তিনিকেতনের হাতিপুকুরের কোণের কোয়ার্টারে শুনি এরকমই এক প্রাক-শীতের সন্ধ্যায়, সঙ্গে গৌতমদারই করা কালো কফি —

याद है मुझको तूने कहा था
तुमसे नहीं रुठेंगे कभी
फिर इस तरह से आज मिले हैं
कैसे भला छूटेंगे कभी
तेरी बाहों में बीते हर शाम
के तुझे कुछ भी याद नहीं
क्या हुआ ...


মুহম্মদ রফি। ইন্টারনেটের সৌজন্যে প্রাপ্ত

Monday, 6 November 2017

আঠারো বছর আগের এক রাত

সেই প্রথম কোনও হাসপাতালে আমার রাত জাগা। সরকারি হাসপাতাল। বসার জায়গা নেই বললেই চলে। একটা বেঞ্চে জায়গা পেলাম। আরও কয়েকজনের সঙ্গে। বাইরে কালিপুজোর মাইক বেজে চলেছে। কলকাতার শহরতলি মধ্যমগ্রাম বিখ্যাত কালিপুজোর জন্য। হাসপাতাল বলে মাইকের জোর কমে না — সামাজিক জ্ঞান মানুষের তখনও ছিল না, এখনও নেই। রাতের খাবার আয়ার হাত দিয়ে পৌঁছে গেছে উপরে। আমার কোনও কাজ নেই — বসে বসে মশা মারা ছাড়া। পাশের ওষুধের দোকানে খোঁজ করতে অবশ্য মেলে মশা মারার ধূপ — কছুয়ার তখন ভালো বাজার। মাঝরাতে কোনও এক সময় ধূপ নিভে গেলে দেশলাইয়ের খোঁজ করি নিদ্রামগ্ন পাশের লোকের কাছে। দেশলাই পেলাম, সঙ্গে ঘুম ভাঙানোর জন্য একরাশ বকা — কেন দেশলাই রাখতে পারেন না, বিড়ি খান না তো কি দেশলাই রাখা যায় না... ইত্যাদি ইত্যাদি। বনগাঁ লাইনে যাতায়াতের সূত্রে গালাগাল খাওয়া-দেওয়া তখন জলভাত। এসব ছোটখাটো ব্যাপারে কান দিতে নেই।

বরঞ্চ কান খাড়া রাখতে হয় আয়াদের ডাকের জন্য। আঠারো বছর আগে "......... বাড়ির লোক কে আছেন?" এসব শোনার জন্য কান অভ্যস্ত ছিল না। এখনকার কর্পোরেট হাসপাতালের মত মাইকে ঘোষণা আসতো না ভেসে। এক আয়ার চীৎকারে ঘুম ভাঙে ভোরের দিকে। না, আমার তলব হয়নি। যার ডাক পড়েছে সেই সকালে সে চিন্তিত মুখে ছোটে ভেতরে। ফিরে আসে উদভ্রান্ত হয়ে — রক্ত লাগবে। ছুটল স্টেশনের দিকে। মানিকতলায় সেন্ট্রাল ব্লাড ব্যাঙ্ক ছাড়া রক্ত পাওয়া দুষ্কর। আমি রাতের আয়াকে চুপচাপ জিজ্ঞাসা করি বেড নম্বরের কথা — হাসপাতালে বেড নম্বরটাই দিদির পরিচয়। বললেন, ভালোই আছে, স্যালাইন চলছে। আর ছেলে?
— আপনার ছেলে ভীষণ দুরন্ত। দেখে কে বলবে কাল দুপুরেই হয়েছে!
— আমার না। আমি ওর মামা।
— ও বাবা! তা, মিষ্টি কৈ?
— কাল যে সব্বাইকে খাওয়ালাম।
— সে তো দিনের আয়ারা খেয়েছে। আমি আছি আটটা পর্যন্ত, নিয়ে এস।

দত্তপুকুর । ২৬-জানুয়ারী-২০০১

কাছাকাছির মধ্যে একটাই মিষ্টির দোকান খুলেছে সবে। এক হাঁড়ি রসগোল্লা। আরেক প্রস্ত মিষ্টি খাওয়া, বা খাওয়ানো, ওয়ার্ডের বাইরে। ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করি তাকে।
— উঁকি না দিয়ে চলেই যাও না ভেতরে!
— কিন্তু এখন তো ভেতরে যাওয়া মানা। ভিজিটিং আওয়ার্স তো সকাল দশটা থেকে...
— অতশত না ভেবে দেখে এস কেমন দুষ্টুমি করছে সে!
একা ছেলে খেলে বেড়াচ্ছে সকাল থেকেই — আজও যেমন করে! দিদিকে ডাকি, কোনও অসুবিধে হচ্ছে কিনা জানতে। আচ্ছন্ন গলায় দিদি মাথা নেড়ে বোঝায় সব ঠিক আছে। বেরিয়ে আসছি, কান্না জুড়েছে সে। ফিরে তাকাই, চুপ। আবার বেরনোর চেষ্টা; আবার কান্না। আয়া মজা করে বলে, ও তোমাকে ছাড়বে না।

ছাড়েও নি। আজও দু'হাজার কিলোমিটার দূর থেকে শুনতে পাই, মামাই ও মামাই, ইডেনে খেলা দেখাতে নিয়ে যাবে না? 

Saturday, 14 October 2017

প্রশ্নোত্তর

খুব ইচ্ছে ছিল প্রশ্ন করার। সবারই থাকে — কেউ উত্তর পায়, কেউ পায় না। কখনও মনে হয়, সত্যজিৎ রায়কে জিজ্ঞাসা করতে পারতাম, আপনি আমাকে আঁকা শেখাবেন? আমার অনেক আক্ষেপের মধ্যে এটা একটা বড় আক্ষেপ আছে — আঁকতে না পারা। খুবই হাস্যকর হয়ত। ততোধিক হাস্যকর হত যদি সত্যজিৎবাবুর কাছে আঁকা শেখার একটা বিফল প্রচেষ্টা করতাম। উনি রেগে গিয়ে হয়ত তাড়িয়েই দিতেন! কথা হচ্ছে হঠাৎ সত্যজিৎ রায় কেন? বয়সটাই তো অমন ছিল তখন — ফেলুদা আর শঙ্কু-ময় জীবন। আর্টিস্ট তখন আমার কাছে মাত্র দু'জন — সত্যজিৎ আর আর্জে। দ্বিতীয়জনের সান্নিধ্য পাওয়া অসম্ভব কারণ তিনি আমার জন্মের বছর তিনেকের মধ্যেই প্রয়াত। রইলেন শুধু উনি। কিন্তু তাও প্রশ্নটা করা আর হল না!


যত বড় হয়েছি আমার প্রশ্নমালা বেড়েছে কিন্তু যাদের করব বলে ভেবেছিলাম তাদের সংখ্যা কমেছে কালের নিয়মে। অনেকের সামনা-সামনি হয়েও প্রশ্নগুলো করা হয়ে ওঠেনি। যেমন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। জানা হয়নি, উনি কি ট্রেকিং করতেন? না হলে, কাকাবাবু অত-শত জায়গাতে যেতেন কি করে? নিজে ভীমবেটকাতে না নামলে কি কাকাবাবু নামতে পারতেন? বেশ কয়েকবার ওঁর সঙ্গে দেখা হলেও জানা হয়নি এটা! পূর্ণেন্দু পত্রীর আঁকা যখন বুঝতে শিখলাম তখন উনি আর নেই; শুধু একবার কোনও এক কবিতা উৎসবে আমার খাতায় সই করে দিয়েছিলেন। ও-ভাবে "প" লেখার কত চেষ্টাই না করেছি তারপর! একবার সাহস করে বললে কি ক্যালিগ্রাফি শেখাতেন না?

ঋতুপর্ণ ঘোষের সঙ্গে দেখা হলেও ওঁর ছবিতে feminine sensibility নিয়ে কোনও প্রশ্ন করা হয়নি; আজ ভাবি একটু কথা বলে রাখলে ঋদ্ধ হতাম। নব্বইয়ের দশকে ওরকম বাংলা পরিচালক আর কে ছিলেন? 'তিতলি'র premier-এ প্রথম দেখা; শেষ দেখা টিভির পর্দায় — শায়িত, ভিড় জমে গেছে আনোয়ার শাহ রোডে।

অনেক মুখের ভিড়ে আমিও গেলাম মিশে বাংলা একাডেমি চত্বরে; শুয়ে আছেন তিনি। কেউ যেন এসে রেখে গেল পুষ্পস্তবক। লেখা, 'মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য্যের শ্রদ্ধার্ঘ্য'। আমি তখনও বোকার মত ভাবছি ওঁর মুখ থেকে যদি দেশভাগের সময়টা একটু জানা যেত কিন্তু অন্নদাশঙ্কর রায় তো চিরশয্যায়। কিছুই জানতে পারি না ভালো করে, শিখতে পারি না। ১৯৭৫-এর Emergency নিয়ে গবেষণামূলক পড়াশোনা করছি। ভাবলাম, সাংবাদিক বরুণ সেনগুপ্তের সঙ্গে একদিন দেখা করে শুনব কি করে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করেছিল ইন্দিরা গান্ধী সরকার। ফোন করলাম। অসুস্থ। নিকটাত্মীয় বললেন, ক'দিন পর ফোন করতে। দরকার হয়নি। বর্তমান হঠাৎ অতীত।

মৃত্যুর আকস্মিকতায় আমি বিস্মিত হইনা কিন্তু গুণীজনদের কাছে এসেও শেখা শেষ না হওয়া পীড়িত করে। শেখার শেষ নেই — এ যেমন সত্য তেমন আরও একটু আরও একটু করে অনেকটা শিখে নেওয়াও যেত। আমাদের নাটকের দলে আমি তখন আলোর দায়িত্বে। শিশির মঞ্চ
— কত ওয়াটের আলো নিচ্ছ তোমরা?
— এ তো জানি না! হিসেবে করতে হবে।
— সে কি! এসব তো মুখস্থ থাকা উচিত তোমার। শম্ভু মিত্র একবার রেগে স্টেজ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন কারণ ২৫,০০০ ওয়াট আলো ছিল না বলে! ভাবতে পারো?
এই কথোপকথন যাঁর সঙ্গে, তিনি প্রবাদপ্রতিম তাপস সেন। সময়-সুযোগ বেশি পাইনি ওঁর সঙ্গে কাজ করে আরও কিছু শেখার।

আলো হয়ে আসে অন্ধকার। শান্তিনিকেতনে আঁধার নেমেছে গরমের দুপুরেই। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রয়াত। আশ্রমকন্যা ফিরছেন শকটে, গভীর রাতে, কলকাতা থেকে। 'আনন্দধারা'য় ভুবন বইছে, বহমান মানুষ। শুধু গান গেয়েই কি স্পর্শ করা যায় সবার হৃদয়? গান তো একটা মাধ্যম মাত্র, বলতেন শ্যামলী খাস্তগীর, 'মানুষের কাছে আসতে গেলে তাদের মত ভাবতে হয়, আপন করে নিতে হয়।' যদুগোড়ার ইউরেনিয়াম খনির তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে সচেতনতা তৈরি করেছিলেন শ্যামলীদি দীর্ঘদিন ধরে, গ্রামবাসীদের কাছে তিনি ভগবান। ওঁর বাড়িতে এক দুপুরে হাতে করা নাড়ু খেতে খেতে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, এরকম সব বড় বড় কোম্পানির সঙ্গে সংঘাতে আপনার ভয় করে না? জানলার বাইরে তাকিয়ে শুধু স্মিত একটা হাসি। উত্তর নেই।

উত্তর দিয়েছিলেন মহাশ্বেতা দেবী। 'প্রতিবাদ যেন না থামে। না হলে পরের প্রজন্ম উত্তর চাইবে।' আমরা তখন একটা আদিবাসী গ্রামে আন্দোলন করছি তাকে প্রমোদনগরী বানানোর প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে। ভেবেছিলাম এক ফাঁকে জেনে নেব আমাদের বিশ্বভারতীর ইংরেজি বিভাগের পুরনো কথা বিভাগের প্রাক্তনী মহাশ্বেতাদির কাছে। কিন্ত হল না ঐ ইতিহাস জানা। এর কিছু আমাকে বলেছিলেন অবশ্য অমিতা সেন। আশ্রমের কথা, গুরুদেবের কথা, কষ্ট করে ছেলে অমর্ত্যকে বড় করার কথা... অনেক কথা একসাথে, যা ২০ মিনিটের মধ্যে সম্পাদনা করতে আকাশবাণীর ঠান্ডা ঘরেও ঘেমে গেছিলাম। অমিতাদির জীবনের শেষ সাক্ষাৎকার ছিল ঐটি। এত কিছুর মধ্যেও কোথায় লুকিয়েছিল আনন্দ তা আর খোলসা করলেন না। শুধু বললেন, আনন্দ সর্ব কাজে!

কাজটাই তো করতে চেয়েছিল বিক্রমদা। মধুরাতে একদিন খেলা থেমে যাওয়ার আগে রতনপল্লির আড্ডার মধ্যে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, গান গাওয়া-কবিতা লেখা-ছবি আঁকা, কোনটা বেশি টানে তোমাকে? বলেছিল, ভেবে বলবে। বলেনি আর। চুপচাপ চাঁদের আলোর দেশে চলে গেল হাসি তার আমাদের মাঝে রেখে গিয়ে। অনেকেরই মত। 

Thursday, 5 October 2017

বাংলা, না ইংরেজি?



আমার স্কুলের সহপাঠী মারুফের দুঃখের কারণ আছে। সে বাংলা ভাষার অন্যতম প্রকাশক। যে-বছর আমি ইংরেজি ভাষাশিক্ষান্তে ইংরেজি কাগজে শিক্ষানবিশ সম্পাদক হিসেবে চাকরি পাই, সেই বছর মারুফ উদ্যোগী হয়ে শুরু করে "অভিযান", যা আজ বাংলা প্রকাশনা জগতে আনন্দ-মিত্র ঘোষ-দেজ প্ৰভৃতির সমতুল্য। মারুফ মাঝে-মাঝেই বলে/লেখে প্রকাশক হিসেবে তার অভিজ্ঞতার কথা, যার মধ্যে প্রধান হল দুই ধরণের দৌর্বল্য — আর্থিক এবং সাহিত্যিক।

আনন্দবাজার গোষ্ঠীর মত আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা "আনন্দ" যে-ভাবে পেয়ে এসেছে, তা মারুফের মত শহরতলির মধ্যবিত্ত ঘর থেকে উঠে আসা প্রকাশকরা হয়ত কোনওদিন পাবে না। এহেন প্রকাশকদের একসঙ্গে অনেক কাজ করতে হয় — লেখা খোঁজা থেকে শুরু করে বই বিক্রি করা। এর প্রত্যেক ধাপে থাকে বাধা। সে-সব উপেক্ষা করে একটা ভাষাকে ভালোবেসে মানুষের কাছে বই পৌঁছে দেওয়ার আনন্দ-ই হয়ত মারুফের চালিকাশক্তি — বইপাড়ার অনেকের মতই।

এত কিছুর পরেও বাংলা বই না পড়লে প্রকাশকের দুঃখ তো হবেই। একজন দেখলাম মারুফের এই পোস্টের নিচে লিখেছেন, ইংরেজির মত বাংলাতে ভালো বই কোথায় এখন? বিশেষতঃ, থ্রিলার বা রোমহর্ষক গল্প যা কি না ট্রেন-প্লেনের যাত্রীদের প্রথম পছন্দ। আছে। নিশ্চয়ই লেখা হচ্ছে। কিন্তু আমরা পড়ছি কি? প্রকাশকের দায়িত্ব যদি বই প্রকাশনা করা, পাঠকেরও একটা দায়িত্ব থাকে: পড়া। শেষ কবে আপনি কাউকে বাংলা বই উপহার দিয়েছেন? বা, পেয়েছেন? ভাবুন।

আমরা আসলে অনেক বড় বড় কথা বলি কিন্তু তার সিকিভাগ-ও কি মেনে চলি? ইংরেজি তো শিখবেন ও শেখাবেন কিন্তু নিজের মাতৃভাষাটি ভুলে গেলে কি চলবে? বাংলা কি শুধুই সন্ধ্যেবেলাতে চ্যানেল-ভর্তি সিরিয়ালের মালা? বাংলা পড়েন ও পড়ান তো? নিজেকে প্রশ্ন করুন। আমার আপনার সন্তান phrasal verb-appropriate preposition এসবের পাশাপাশি সন্ধি-কারক-বিভক্তি-প্রত্যয়-সমাস-সমার্থক শব্দ-সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দ শিখছে তো? যদি উত্তর হয়, "হ্যাঁ", তবে চিন্তা নেই; উত্তর "না" হলে দোষ কিন্তু আপনার — কোনও সরকার, স্কুল, কলেজ, প্রকাশকের নয়।

আর বাংলা না শিখে ইংরেজি শিক্ষার মধ্যে আলাদা কোনও সাহেবিয়ানা আছে বলে আমার মনে হয় না। নিজের ভাষা বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন নিজেকেই; একদিন আমার আপনার বাড়ি থেকেই উঠে আসবে ভবিষ্যতের রবীন্দ্রনাথ-আশাপূর্ণা-সুনীল। অন্যকে (স্কুল, পড়ানোর মাধ্যম, কাজের সুযোগ ইত্যাদি ইত্যাদি) দোষারোপ না করে আসুন বাংলা শিখি, পড়ি, লিখি। এখন ইংরেজি তো আছেই সর্বত্র — মোবাইলের কীবোর্ড থেকে ইন্টারনেটে। প্রয়োজন বাংলাকে আয়ত্ত করা — শুনতে অবাস্তব লাগলেও এটাই সত্যি। ২০১৭-তে ইংরেজি ব্যবহার অনেক সোজা, বাংলা রপ্ত করা কঠিন।

Tuesday, 19 September 2017

ঘরে ফেরা

ঢালাই ঠিক কী বস্তু, সেটা বোঝার বয়স হয়নি তখনও। আমরা ওখানে ফুটবল-ক্রিকেট খেলি, ঘুড়ি ওড়াই, বড় ইটের গাঁথনিগুলোর পিছনে লুকোচুরি। লোকজন বলত, ওখানে নাকি প্লেন নামে। আমি কোনও দিন দেখিনি। বাবা বলেছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বানানো এই ঢালাই — রানওয়ে, যুদ্ধবিমান নামার। আমি যুদ্ধ বুঝি না — তখনও না, এখনও না — তায় আবার বিশ্বযুদ্ধ, এবং দ্বিতীয়।আমার বিশ্ব তখন ঢালাই-এ খেলতে যাওয়া। আমার সবচেয়ে পছন্দের খেলা মার্বেল, কালো মার্বেল। একটা ফায়ারিং রেঞ্জ ছিল ঢালাই-এর এক কোণে।সেখানে হয়তো সেনারা গুলি চালানোর মহড়া দিত কোনও এক সময়ে কিন্তু আমাদের গুলি হল মার্বেল ! সে দিয়ে মহড়া হয় না, যুদ্ধ হয় না — শুধু পাশের বাড়ির হ্যাপি-বুম্বার সঙ্গে ঝগড়া হয় খেলতে খেলতে।


সেদিন এরকম বাড়ি ফিরেছি। সন্ধ্যা নেমেছে চারপাশে। চোখে-মুখে সকালের রোদ মাখা আলো নিয়ে দিদি বলল, টিকিট হয়ে গিয়েছে।
— কিসের?
— তুই একটা হাবা।
— কেন?
— আবার কেন? ভুলে গিয়েছিস, আমরা পরশু বহরমপুর যাব?
— তাই?
— তুই সারাদিন খেলেই বেড়া। পরশু যে চতুর্থী। 





ডিএসটিসি-র বাস চলত দুর্গাপুর থেকে বহরমপুর। আমরা উঠতাম পানাগড়ের দার্জিলিং মোড় থেকে।পুজোর আগে ডিএসটিসি (দুর্গাপুর স্টেট ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশন, এখন অতীত) বাসের টিকিট পাওয়া ছিল দুঃসাধ্য।পানাগড়ের আমাদের পাড়ার একজন চাকরি করতেন ডিএসটিসি-তে। তিনি একদিন আগেই টিকিট দিয়ে যেতেন আমাদের। ‘ঘরে ফেরা’ সুষ্ঠু ও নিশ্চিত করতে এই ধরনের কত ‘আপনে’র সাহায্য আমরা বিভিন্ন সময় পেয়ে এসেছি; খুব আশ্চর্য ভাবে এঁরা কেউই আমাদের আপন সম্পর্কের ছিলেন না।এরকম ছিলেন কেষ্টদা। শিয়ালদহতে কারশেডের শান্টিং বিভাগে কাজ করতেন; আর আমরা যখন বারাসত থেকে বহরমপুর যেতাম, লালগোলা প্যাসেঞ্জারে জায়গা রেখে দিতেন! শুধু মা-এর বাপের বাড়ি যাত্রা সুগম করার জন্য ‘আপনার’ এই মানুষটির সে কী সদিচ্ছা। কোনও এক কুমোর শিল্পীর ঘর থেকে আমি-আপনি এরকমই আগ্রহে কতবার মা দূর্গা-কে এনেছি মণ্ডপে। সে কি কেবল পুজো করব বলে? না কি অভয়াশক্তি বলপ্রদায়িনী আমাদেরই মা।


— কিন্তু মা, এ তো চারিদিকে জল! আমাদের বাস যাবে কী করে?
— যাবে যাবে। এবার মা-এর নৌকোয় আগমন, তাই এমন অবস্থা।
— আমরা তো বাসে যাচ্ছি।
—  আমি মা দূর্গার কথা বলছি।
— ওঁর নৌকা কে চালায়? ড্রাইভার?
— মাঝি আছে দেবীর।
— কোথায়? আমরা দেখতে পাই না তো!
— পাবি। এবার কেউ না কেউ ঠিক করবেই দেখিস। মা আসছেন নৌকোয়।
—  অজানা বা অভ্যুদয়?
— করতে পারে। কিন্তু ওগুলো তো আমাদের বাড়ি থেকে অনেক দূর। বৃষ্টি কমলে দেখতে যাবো।
— রিকশা-তে?
— হ্যাঁ।
— কিন্তু স্বর্গধাম করে না কেন? বাড়ির কাছেই তো।
— ওরা মণ্ডপ নিয়ে বেশি ভাবে না। ওদের প্রতিমা-ই আসল। যামিনী পালের করা।
— যামিনী পাল কি আমাদের কেউ হয়? আমরাও তো পাল।
— না! আমাদের কেন হবে?
— যদি হত... 


অনেক কিছুই ভাবি যদি হত, কিন্তু হয় না। বাস চলে ধীরে, জল কেটে। সিউড়ি-তে যখন ১৫ মিনিটের জন্য দাঁড়িয়ে ছিল, তখনও বুঝতে পারিনি এত জল। সাঁইথিয়ার পরে ময়ূরাক্ষী পার হয়ে বুঝলাম এই ১৯৮৭-এর বন্যা কেন রেডিওতে খবরে সারাক্ষণ। পাট শুকোচ্ছে রাস্তার উপর, গরু নিয়ে উঁচু ডাঙায় ঘর বেঁধেছে মানুষ, ত্রিপলের ঘর। কান্দি, গোকর্ণ সব জলের তলায়। বৃষ্টি বন্ধ কিন্তু জল নামেনি তেমন। পরশু ষষ্ঠী... 


— মা, এরা কী করে পুজো করবে?
— খুব দুর্দশা। হয়তো হবে না এখানে এ-বছর।
— তাহলে দূর্গা ঠাকুর এ-বছর ঘরে ফিরবেন না?
— ফিরবেন। এখানে না।
— ওঁর কি অনেক ঘর? অনেক বাড়ি?
— অনেক। 


আমাদের বহরমপুরে একটাই বাড়ি — দিদার বাড়ি। সে বাড়িতে আমার অনেক আদর। সেখানে দিদা আমার জন্য মুড়কি করে রাখে, ছোটমণি বন্দুক আর ক্যাপ কিনে রাখে, অষ্টমীর সকালে অঞ্জলি দিতে যাওয়ার জামা কিনে দেয় ফুলমণি, রাঙামেসো পেতলের হাঁড়িতে নবমীর সকালে পোলাও করে খাওয়ায়, আর দশমীতে অঢেল ছানাবড়া। সেখানে কেউ তখন আর হয়তো বলে না, "যাও যাও গিরি আনিতে গৌরী, উমা নাকি বড় কেঁদেছে"। কিন্তু আগমনী সুর সেই বাড়িতে কখনও থামেওনি। দিদার সঙ্গে আচার্যপাড়া সার্বজনীনে খিচুড়ি ভোগ খাওয়া বা জগদম্বাতে সবুজ অসুর দেখতে যাওয়া বা সবাই মিলে ভাগীরথীতে বিসর্জনের সময় বাজি পোড়ানো হয় না এখন আর। হবেও না আমার; ১৯৯৮-এ কালীপুজোর ঠিক পরেই দিদা চলে গেল। অন্য বাড়ি। অন্য ফেরা। 


১৯৮৯। সেবার বহরমপুর গেলাম না আমরা। পানাগড় ছেড়ে আমরা তখন বারাসতে চলে এসেছি। আমাদের আদি বাড়ি। দূর্গার ঘরে ফেরার সময় হয়ে এল। শেঠপুকুর সার্বজনীনের বাঁশবাঁধা শেষ। দাদুর বাড়ির জানলা থেকে দেখা যেত শুধু কার্তিক ঠাকুর। বাইরে চাকরির সুবাদে বাবা বেশির ভাগ দূর্গাপুজোয় বাড়ি থেকে দূরে। সেবার বদলি হয়ে ঘরে, বাবার কাছে। শেঠপুকুর আর আমার স্কুলের মাঝে বিশাল জায়গা জুড়ে কাশফুল ফুটত। কাশের না কি বেশি কাছে যেতে নেই। রোঁয়া উড়ে মুখে যায় ঢুকে, দিদি বলত। আমি ভাবতাম, তাহলে অপু আর দূর্গা কী ভাবে কাশবনের মধ্যে দিয়ে ছুটছে? প্রশ্নের উত্তর যেখানে মেলে না, সেখানে একদিন হারিয়ে গেল দাদু। সেদিন ষষ্ঠী; ঢাকে পড়ল কাঠি; বোধন — দূর্গা আসছে ঘরে। সেদিন শ্রাদ্ধ, দাদুর। অন্য ঘরে ফেরা — হয়তো ঠাকুমার সঙ্গে দেখাও হবে।





হস্টেলে যারা থাকে, পুজোর সময় তাদের ঘরে ফেরা কেমন হয়? রামকৃষ্ণ মিশন নরেন্দ্রপুরে পড়তাম তখন। পুজোর ঠিক আগেই শেষ হত আমাদের ষান্মাসিক পরীক্ষা, আর মহালয়াতে "অয়ি গিরি নন্দিনী" বেঁধে দিত বাড়ি ফেরার সুর। এখনও ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয় সমবেত ১২০ জনের গাওয়া মহিষাসুরমর্দিনী স্তোত্র। ক্লাস সেভেন। তখনও কেবল রেডিওতেই শোনা যেত বীরেন্দ্রকৃষ্ণের "আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জীর..."উত্তম মহারাজের ঘরে ফিলিপস্-এর বড় রেডিও। সেদিন — বলা ভাল ভোররাতে — রেডিও বাইরে রাখা। সুপ্রীতি ঘোষের "...সে সুর শুনে, খুলে দিনু মন..." সেদিন আবার ভৌতবিজ্ঞান পরীক্ষা। কিন্তু মন ভেসে বেড়ায় সাদা মেঘের ভেলাতে। পরীক্ষা শেষ হলেই দুপুরের খাওয়া শেষে বাড়ি। মা আসবে নিতে। ২১৮ বাস। বারুইপুর থেকে নরেন্দ্রপুর হয়ে ধৰ্মতলা। যাওয়ার পথে কিছু ঠাকুর দেখে নেওয়া — বাসের জানালা থেকে। কোথাও প্রতিমা যাচ্ছে মণ্ডপে, কোথাও মণ্ডপ তখনও অর্ধসমাপ্ত। 


— দিদি জামা কিনে রেখেছে তোর জন্য।
— ক’টা?
— অনেক। বাবাও মানি অর্ডার করেছে। সেটাতে কাল কিনে দেব কিছু একটা।
— জিন্স কিনব।
— কী রঙের কিনবি?
— নীল। বাবা আসবে না পুজোতে?
— না। ছুটি পায়নি।
— বাবাদের অফিসে কেন ছুটি হয় না?
— আসবে হয়তো পুজোর পর।
— পুজোর পর কেউ ঘরে ফেরে?


সকালের বিশ্ব-ভারতীতে কী ভিড়! বসার জায়গা তো দূর অস্ত, দাঁড়ানোই যাচ্ছে না ভাল করে। ওদিক থেকে তমোঘ্ন জিজ্ঞেস করে, পেলে জায়গা? কেউ কি বর্ধমানে নামবে? আমি বলি, কেউনা। সবাই বলছে হাওড়া। মহালয়ার পরের সকাল। শান্তিনিকেতনে আমরা মহালয়াতে আনন্দ-বাজার করি। সে অন্য রকম মজা। সকাল থেকে দোকান বাঁধা, রান্নার বাজার করা, রান্নায় যাতে কারও অসুবিধা না হয় তা দেখা, বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ সেগুলো দোকানে এনে পসরা সাজিয়ে বসা, ক্যাশ সামলানো, তারপর রাত ন'টার সময় দোকান-পাট গুটিয়ে ঘরে ফেরা।নিজেদের দোকান, নিজেরাই ক্রেতা-বিক্রেতা, নিজেদের আনন্দ। এই আনন্দ-বাজারের লভ্যাংশ যায় বিশ্ব-ভারতীর সেবা বিভাগে; স্থানীয় গ্রামোন্নয়নে সাহায্য করে ওরা। পুজোর আনন্দ অনেকের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া। "আনন্দ সর্বকালে, দুঃখে বিপদ ভালে" — এ ভাবতে ভাবতে বোলপুর থেকে হাওড়া, সাড়ে তিন ঘণ্টার পথ চলে এলাম দাঁড়িয়ে। অন্যদের মতো আমি ট্যাক্সি বা বাস ধরতাম না সঙ্গে সঙ্গে। সাবওয়ে দিয়ে লঞ্চঘাট। ২ টাকার টিকিট। অনেক জায়গাতেই যাওয়া যায় সেই টিকিটে। আমি চড়ে পড়লুম বাগবাজারের লঞ্চে।  





হাঁটছি বাগবাজার ঘাটে নেমে। অলিগলি ঘুরে কুমোরটুলি। রং হচ্ছে। হালকা হলুদ। কেউ আবার শুকোচ্ছেন প্রতিমা, গ্যাস বার্নার দিয়ে। দূর্গা সপরিবারে তৈরি হচ্ছেন বাপের বাড়ি যাবেনবলে। সপরিবার কথাটা ঠিক না; শিব তো কৈলাসে! কুমোরটুলি পার্কের মণ্ডপকে ডাইনে রেখে হেঁটে চলেছি শোভাবাজারের দিকে। উঁকি মেরে রাজবাড়ির একচালা ঠাকুরের চালাটাই দেখা গেল। হাতিবাগান শুধু দেখলাম অপরিবর্তিত — সেই ভিড়, সেই ফুটপাথ-জোড়া দোকানের সারি, সেই মিত্রা-মিনার-দর্পনাতে ম্যাটিনি শো-এর লাইন, সেই সেন মহাশয়! পুজোর মুখে কলকাতা আরও এক আনন্দ-বাজার। ঝড়-জল-বৃষ্টি সব কিছু উপেক্ষা করেও পুজোয় কলকাতা ঘরে ফেরে, ঘরে ফেরায়।


প্রবাসে পুজোতে কি ঘরে ফেরার টান থাকে? অনেকবার ভেবেছি; বারে বারে ভাবি। ঘর কি কোনও চার দেওয়ালে আটকে থাকা ইট-পাথর-সিমেন্টের অবয়ব? নাকি নিজের মন? "মন চল নিজ নিকেতনে" — স্বামী বিবেকানন্দের খুব প্রিয় গান ছিল এটি। ঘর তৈরি করে ফেলি মনের মধ্যে। বাইরে থেকে পুজোর সময় ঘরে ফেরার ভাবনা তাই নিজের মনেই কোথাও হারিয়ে যায়। সে আমার মন। একবার দেখেছিলাম কী কষ্ট করে তামিলনাড়ুতে জুতোর কারখানায় কাজ করা শ্রমিকরা চেন্নাই মেলে ফিরছেন পুজোর আগে। কেউ যাবেন বাঁকুড়া, কেউ মালদহ,মুর্শিদাবাদ। আমি নেমেছি ভাইজাগ স্টেশনে একটু হাত-পা ছড়িয়ে নেব বলে। এসি লাগোয়া সাধারণ শ্রেণির কামরায় একজন মোবাইলে কথা বলছেন উচ্চ স্বরে — আসছি আসছি... ট্রেন একটু লেট, তা-ও কাল সকালেই ঘরে পৌঁছে যাব... তুমি যা বলেছিলে নিয়ে যাচ্ছি... মা-এর জন্য পুজোর শাড়ি... পরশু চতুর্থী, তাই না?