Wednesday, 15 April 2015

পাঠকের খোঁজ


ছবিটা তুলে ফেললাম সেদিন কলকাতা মেট্রোতে। সাধারণ ছবি। প্রতিদিনের দৃশ্য — অসাধারণ কিছু মুহূর্ত নয়। আমার তিনজন সহযাত্রী চলেছেন যে যার গন্তব্যে। একজন মধ্যবয়সী এবং অন্য দুজন আমার বয়সী বা হয়ত একটু ছোট। প্রায় আধঘন্টা আমি এদের লক্ষ্য রাখছিলাম। মধ্যবয়সী মানুষটি বিভিন্ন রকমের চিন্তায় নিমগ্ন, মাঝে একটা স্টেশনে কাউকে ফোন করলেন। চিন্তিত।

একদম বাঁ-পাশের লোকটির চোখ সরল না মোবাইলের পর্দা থেকে। দরজার পাশে বসা ছেলেটি অসম্ভব মনোযোগ দিয়ে পড়ে চলেছে সকালের আনন্দবাজার। প্রথমে সে পড়ল খেলার পাতা। তারপর কমবয়সী বাঙালির মত ফিরে এলো প্রথম পাতার দিকে। পাঠক ক্রমাগত শেষ হয়ে যাওয়া নিয়ে আমরা যারা খবরের কাগজে কাজ করি তাদের সবসময় একটা চিন্তা কাজ করে। শুধুমাত্র খবরের কাগজ কেন, যে কোনো মিডিয়াতে এই ভয়টা থাকেই। টিভি মিডিয়ার চিন্তা দর্শক নিয়ে। সেখানে যে যত তাড়াতাড়ি দর্শকের মন জয় করে সবচেয়ে বেশি সময় তাকে ধরে রাখতে পারবে — তারই জিত।

আবার কখনো মনে হয় আমরা মোবাইল-মদ্যপদের কাছে হেরে যাচ্ছি না তো? এমনিতেই শোনা যায় এবং নিজেও উপলব্ধি করি মানুষ নিজেকে ধীরে-ধীরে বই-বিমুখ করে তুলছে। একসময় আমিও বই পড়তে-পড়তে অফিস আসতাম। এখন আসি মোবাইলে ই-বুক পড়তে-পড়তে।  মনে করুন, যারা ই-বুক-ও পড়েন না! পাঠক এখন খেলোয়াড় — মুঠি-ফোনে এন্তার গোল করে মেসিকে কাটিয়ে, উইকেট ভাঙে মালিঙ্গার ছন্দে, হ্যামিলটনকে হারায় ফর্মুলা-১ এ! 

এই ছবিটাতেও লক্ষ্য করুন, প্রথম লোকটি মোটেও ই-বুক পড়ছেন না। কানে নল গোঁজা ব্যাপারটা আমরা ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি ডাক্তারদের মধ্যে। কিন্তু সেটা রোগী-ডাক্তার সম্পর্ক। একটা প্রানের সম্পর্ক। এখন, মোবাইলের সঙ্গে নল গুঁজলে ছায়াছবি দেখা যায়, গান শোনা যায় আর গেমস্ খেলা যায়। এটা ভালো। কিন্তু পাঠক কই? 

এখন অবশ্য আরো একটা নতুন মিডিয়া এসেছে — অডিও-বুক। জানতে ইচ্ছে করছিল ছেলেটি অডিও-বুক পড়ছিল কিনা। দরকার হলো না। দুই হাত দিয়ে কেউ অডিও-বুক পড়ে না! পড়াশুনা ব্যাপারটা যে উধাও হয়ে যেতে বসেছে তা অনেকেই বিশ্বাস করে না। আজকাল আমরা খবর পড়ি না, দেখি। ব্যোমকেশ পড়ি না, দেখি। বই পড়ি না, দেখি। 

অবশ্য বই দেখার অভ্যাস বাঙালির অনেক আগেই  ছিল... আমার জন্মের অনেক আগে থেকেই। তখন উপন্যাস বা গল্প যা আগে বই হয়ে প্রকাশিত হত, তা চলচ্চিত্র পরিচালকরা ফুটিয়ে তুলতেন পর্দায় — যা হত বই দেখা। যেমন হয়েছিল পথের পাঁচালি বা পদ্মা নদীর মাঝির ক্ষেত্রে। বা, হয়ত অগুনতি সাহিত্য টেক্সটে। 

ছবিটা তোলা ১৪২১ বর্ষশেষের দিন দুপুরে। ক'বছর আগেও কলেজ স্ট্রিট বই পাড়াতে চৈত্র-শেষের দুপুরে সাজ-সাজ রব পড়ে যেত। পরদিন জমাটি আড্ডা হবে লেখকদের নিয়ে। এখন আড্ডা হলেও কবিতা-পাঠে সময় নষ্ট না করে অনেকেই দ্রুত পায়ে চেক নিয়ে হাঁটা মারেন বাড়ির পথে। সান্ত্বনা শুধু ওই ছেলেটা — মেট্রোতেও আনন্দবাজার পড়ে!

Saturday, 2 August 2014

বেতার যাত্রা

কাজটা মোটেও সহজ ছিল না। সদ্য স্নাতকোত্তর শেষে তখন আমি বেকার। এরকমই এক বর্ষার দুপুরে খবর পেলাম আকাশবাণী-শান্তিনিকেতনে ঘোষক নেওয়া হবে। ভাবলাম নাটক তো অনেক করেছি এক সময় — গলার কারিকুরিতে নাট্যঘরের শেষ দর্শককেও শোনাতে পারতাম। আবার, ছাত্র ভোটের সময় মিছিলের পুরোভাগে স্লোগানও দিতাম। এইসব জানত শান্তিনিকেতনে আমার অনেক বন্ধু-ই। ওরাই আমাকে উত্সাহ যোগাল অডিশন দিতে যেতে। গেলুম চলে।

একটা বড় ঘর। কাঁচ ঢাকা। একটা মাইক। একটা কন্ঠস্বর। নাম জানতে চাইল। বললাম। একটা সাদা কাগজ রাখা। বলল পড়তে। বিভিন্ন রকমের শব্দ আর বাক্যমালা।  শেষে এলো সেই কঠিন পরীক্ষা। কবিতা আবৃত্তি। এ এমন এক কলা যা আমি আয়ত্তে আনতে পারিনি কোনদিন। অষ্টম ক্লাসের মৌখিক পরীক্ষা। বেনুদা বললেন ''উলঙ্গ রাজা' বলবে, না আমি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করব'? এমন সুযোগ কেউ কি ছাড়ে? আমি বললাম প্রশ্নই করুন। দশের মধ্যে আট পেলুম। আনন্দ। না হলে আমাকে জিজ্ঞাসা করতে হত 'রাজা তোর কাপড় কোথায়'? বেঁচে গেলাম সেবার। 

কিন্তু এই কাঁচের ঘরে বাঁচাবে কে? কাউকে দেখা যায়ে না। এরপর সেই বিনীত অনুরোধ। 'কোনো কবিতাই আমার মুখস্থ নয়। আমি কি গদ্যাংশ পড়তে পারি কিছু?' এলো। একজন এসে এক পৃষ্ঠা রবীন্দ্রনাথ দিয়ে গেলেন। কোনো কথা নেই তাঁর মুখে। মিলিয়ে গেলেন কাঁচের ওপারে। আবার ভেসে এলো সেই আওয়াজ। 'পড়ুন'। পড়লাম। বেরিয়ে আসুন। হয়ে গেল? আরো দেখলাম অনেক চেনা-অচেনা মুখ বসে আছেন বাইরে। অডিশন-এর জন্য। তাঁদের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে সোজা গুরুপল্লিতে আমার ছোট্ট ভাড়া-বাড়িতে। 

ভুলেই গেছিলাম আকাশবাণীর কথা। একদিন সন্ধ্যাতে আড্ডা চলছে সুবোধ'দার চা-এর দোকানে। অমর্ত্য'দা এসে বলল, 'অনেক তো কিপ্টেমি করেছিস। এবার তো খাওয়া।' অমর্ত্য'দার সঙ্গে অনেক নাটক করেছি এক সময়। আমাদের নাটক এর নির্দেশক ছিল ও। এখন সঙ্গীত ভবনের নাটক বিভাগের অধ্যাপক। আমি বললাম আবার কিসের খাওয়া? 'রেডিও রেডিও...।' বুঝলাম। এরপর অমর্ত্য'দাকে নিয়ে সাইকেলে আকাশবাণী। কাগজপত্রে সই-সাবুদ করে জেনে নিলাম কবে শুরু হবে বেতার যাত্রা। 

এরপর চলল দেবাশিস বসুর সঙ্গে একপক্ষ-কাল ব্যাপী শিক্ষানবিশি। কিভাবে কথা বলতে হবে। স্বর কিভাবে সঞ্চালন করতে হয়। কিছু কৌশল নাটক করার কারণে জানতাম। তবে মঞ্চের মাইক আর স্টুডিও-এর মাইক — অনেক আলাদা। জোরে কথার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। এরসঙ্গে চলল রেডিও কনসোল কি করে সামলাতে হয় তার-ও তালিম। একদিন দেখলাম আমাকে একসাথে সিডি, ক্যাসেট আর স্পুল চালাতে হচ্ছে! কালক্রমে এটাই হয়ে গেল অভ্যাস। 

লাইভ অনুষ্ঠান দিয়ে পুজোর ঠিক আগে শুরু হলো আমার বেতার যাত্রা। অনেকদিন পর সেদিন (৩০ জুলাই, ২০১৪) আবার গেলাম আরেকটা বেতার স্টুডিওতে। মাঝে কেটে গেছে দশটা বছর। আমিও এখন বেতার জগত্ ছেড়ে অন্য কাজ করি। কিন্তু বেতার এর রোমাঞ্চটা থেকেই গেছে কোথাও একটা! 

Sunday, 3 November 2013

Bangla revolution

অনেক দিন ভেবেছি বাংলা তে ব্লগ লিখলে কেমন হয়? মাঝে মাঝে তো লেখাই যায়!

একটা সময় এসেছিল যখন বাংলা ব্লগ জনপ্রিয় করার জন্য বেশ কিছু নতুন ওয়েবসাইট করা হয়েছিল। সে অবশ্য এক যুগ আগের কথা। সেবার বইমেলা তে (তখনও বইমেলা হত পার্ক স্ট্রিটের পাশের ময়দানে) একটা দোকান দিয়েছিল এরকম উঠতি ওয়েবসাইট। দোকানে খুব ভীড় দেখে উঁকি মারলুম।  বলে কিনা নতুন এক সফটওয়্যার এসেছে। তাতেই নাকি বাংলা তে সব লেখা যাবে। আমরা তখন সবে ইউনিভার্সিটি ছেড়েছি। আমার উত্সাহের কারণ ছিল অবশ্য অন্য। এক সময় এত কষ্ট করে ২০ পাতা বাংলা তে লিখে ছাপাতে হত!

আমাদের ইংরেজি বিভাগে একটা পত্রিকা বের করতুম আমরা। আমি যখন প্রথম সেই বিভাগে ভর্তি হই, তখন দেখি সেটা বেশ চলছে, কিন্তু সব টাই হাতে লেখা। যিনি লেখেন তার হস্তাক্ষর খুবই ভালো। কিন্তু কালক্রমে তিনি বিভাগ থেকে চলে যান স্নাতকোত্তর পাস করে। এবং, সে ভার এসে চাপে আমার ঘাড়ে! কোন এক সিনিয়র দাদা, বা দিদি, ভেবেছিল আমার হাতের লেখা ভালো। আসলে লেখার হাত আর হাতের লেখার মধ্যে তফাত বিস্তর। সে কে কাকে বোঝায়, বিশেষত কাউকে তো পাওয়া গেছে বোঝা ঝেড়ে ফেলার জন্য!

তো, আমি খুব উত্সাহে লেগে পরলুম সেই পত্রিকার পেছনে। কাজ না থাকলে যা হয় আর কি! সকালে ক্লাস, দুপুরে পত্রিকার কাজ। কিন্তু আমার পক্ষে তো হাতে লেখা সম্ভব-ই না। এই দুরূহ কাজ করার জন্য আমার দুটো রাস্তা ছিল। এক, সুন্দর হস্তাক্ষর এর কাউকে খুঁজে বের করা। দুই, কম্পিউটার ব্যবহার করা। এইটা যে সময় এর কথা তখন গোটা শান্তিনিকেতনে কম্পিউটার হাতে গোনা কয়েকটা। মনে করুন কাউকে আপনি একটা পাতা টাইপ করে দিতে বললেন, তিনি নিদেন পক্ষে দুদিন নিতেন ঐটা করার জন্য। এরকম ভাবার কোনো কারণ নেই যে তিনি ওটা বিনা পয়সা তে করে দিতেন! যাই হোক, আমাদের তো রেস্ত এমনিতেই খুব কম। পয়সা দেবই বা কোত্থেকে। তাই অন্য ভাবনা শুরু করতেই হল। 

আমাদের কাছে কম্পিউটার ছিল মাত্র একটা। সেটাও বিভাগীয় কাজে প্রয়োজন হয়। আমাদের উত্সাহের বহর দেখে বিভাগীয় প্রধান শুক্লা-দি বললেন সেটি ব্যবহার করা যাবে। অনুমতি তো পাওয়া গেল, কিন্তু বাংলা সফটওয়্যার? এখানে প্রশ্ন জাগতেই পারে ইংরেজি বিভাগে বাংলা পত্রিকার কি দরকার? আবশ্যিক নিশ্চয়ই নয়। আমাদের পত্রিকাটি ছিল দ্বি-ভাষিক। পরে আমরা হিন্দি-ও যোগ করি। অনেকেই ছিল যারা বাংলাতে লিখতে চাইতো। আমাদের 'শুক্তি' ছিল তাদের জন্য অবারিত দ্বার। বাংলা সফটওয়্যার সেই সময় এ অপ্রতুল। এখন যেমন গুগল-এর মত বহুজাতিক সংস্থা বাংলা বা অন্যান্য ভারতীয় ভাষার অক্ষর তৈরি করছে, সেই সময় এসবের বালাই ছিল না।  অনেক কষ্ট করে পেলাম i -leap সফটওয়্যার।  

এই সফটওয়্যারটি ভীষণ মজাদার। একজনের বাড়ির কম্পিউটার এ ছিল এটি। এইবার চলল এক অদ্ভূত প্রতিযোগিতা — মানুষ বনাম যন্ত্র। তখনও আসেনি সিডি-এর যুগ। মোট পনেরোটা ফ্লপি তে আনা হলো সেই সফটওয়্যার। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে তাকে আমরা পারলাম না বিভাগীয় কম্পিউটারে ভরতে। রইলো বাকি একটা আস্ত সিপিয়ু সেই মহোদয় এর বাড়িতে। এক শিক্ষকের স্কুটার এর পেছনে বসে সে চলে এলো সোজা আমাদের বিভাগে। এবং, আমাদের পত্রিকার পাতা বানানোর সময় সেই সিপিয়ু আনতে হত আর ফিরিয়ে দিতে হত দুই/তিন দিন পর! এভাবেই আমরা চালিয়েছি বছর চারেক, অবিরত। 

এখন বাংলা লেখা এত সহজ হয়ে গেছে যে সেই সব দিনগুলো ভুলেই গেছিলাম। আজ একটা ইংরেজি ব্লগ লিখতে গিয়ে মনে পড়ে গেল এই কথা গুলো।