ছবিটা তুলে ফেললাম সেদিন কলকাতা মেট্রোতে। সাধারণ ছবি। প্রতিদিনের দৃশ্য — অসাধারণ কিছু মুহূর্ত নয়। আমার তিনজন সহযাত্রী চলেছেন যে যার গন্তব্যে। একজন মধ্যবয়সী এবং অন্য দুজন আমার বয়সী বা হয়ত একটু ছোট। প্রায় আধঘন্টা আমি এদের লক্ষ্য রাখছিলাম। মধ্যবয়সী মানুষটি বিভিন্ন রকমের চিন্তায় নিমগ্ন, মাঝে একটা স্টেশনে কাউকে ফোন করলেন। চিন্তিত।
একদম বাঁ-পাশের লোকটির চোখ সরল না মোবাইলের পর্দা থেকে। দরজার পাশে বসা ছেলেটি অসম্ভব মনোযোগ দিয়ে পড়ে চলেছে সকালের আনন্দবাজার। প্রথমে সে পড়ল খেলার পাতা। তারপর কমবয়সী বাঙালির মত ফিরে এলো প্রথম পাতার দিকে। পাঠক ক্রমাগত শেষ হয়ে যাওয়া নিয়ে আমরা যারা খবরের কাগজে কাজ করি তাদের সবসময় একটা চিন্তা কাজ করে। শুধুমাত্র খবরের কাগজ কেন, যে কোনো মিডিয়াতে এই ভয়টা থাকেই। টিভি মিডিয়ার চিন্তা দর্শক নিয়ে। সেখানে যে যত তাড়াতাড়ি দর্শকের মন জয় করে সবচেয়ে বেশি সময় তাকে ধরে রাখতে পারবে — তারই জিত।
আবার কখনো মনে হয় আমরা মোবাইল-মদ্যপদের কাছে হেরে যাচ্ছি না তো? এমনিতেই শোনা যায় এবং নিজেও উপলব্ধি করি মানুষ নিজেকে ধীরে-ধীরে বই-বিমুখ করে তুলছে। একসময় আমিও বই পড়তে-পড়তে অফিস আসতাম। এখন আসি মোবাইলে ই-বুক পড়তে-পড়তে। মনে করুন, যারা ই-বুক-ও পড়েন না! পাঠক এখন খেলোয়াড় — মুঠি-ফোনে এন্তার গোল করে মেসিকে কাটিয়ে, উইকেট ভাঙে মালিঙ্গার ছন্দে, হ্যামিলটনকে হারায় ফর্মুলা-১ এ!
এই ছবিটাতেও লক্ষ্য করুন, প্রথম লোকটি মোটেও ই-বুক পড়ছেন না। কানে নল গোঁজা ব্যাপারটা আমরা ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি ডাক্তারদের মধ্যে। কিন্তু সেটা রোগী-ডাক্তার সম্পর্ক। একটা প্রানের সম্পর্ক। এখন, মোবাইলের সঙ্গে নল গুঁজলে ছায়াছবি দেখা যায়, গান শোনা যায় আর গেমস্ খেলা যায়। এটা ভালো। কিন্তু পাঠক কই?
এখন অবশ্য আরো একটা নতুন মিডিয়া এসেছে — অডিও-বুক। জানতে ইচ্ছে করছিল ছেলেটি অডিও-বুক পড়ছিল কিনা। দরকার হলো না। দুই হাত দিয়ে কেউ অডিও-বুক পড়ে না! পড়াশুনা ব্যাপারটা যে উধাও হয়ে যেতে বসেছে তা অনেকেই বিশ্বাস করে না। আজকাল আমরা খবর পড়ি না, দেখি। ব্যোমকেশ পড়ি না, দেখি। বই পড়ি না, দেখি।
অবশ্য বই দেখার অভ্যাস বাঙালির অনেক আগেই ছিল... আমার জন্মের অনেক আগে থেকেই। তখন উপন্যাস বা গল্প যা আগে বই হয়ে প্রকাশিত হত, তা চলচ্চিত্র পরিচালকরা ফুটিয়ে তুলতেন পর্দায় — যা হত বই দেখা। যেমন হয়েছিল পথের পাঁচালি বা পদ্মা নদীর মাঝির ক্ষেত্রে। বা, হয়ত অগুনতি সাহিত্য টেক্সটে।
ছবিটা তোলা ১৪২১ বর্ষশেষের দিন দুপুরে। ক'বছর আগেও কলেজ স্ট্রিট বই পাড়াতে চৈত্র-শেষের দুপুরে সাজ-সাজ রব পড়ে যেত। পরদিন জমাটি আড্ডা হবে লেখকদের নিয়ে। এখন আড্ডা হলেও কবিতা-পাঠে সময় নষ্ট না করে অনেকেই দ্রুত পায়ে চেক নিয়ে হাঁটা মারেন বাড়ির পথে। সান্ত্বনা শুধু ওই ছেলেটা — মেট্রোতেও আনন্দবাজার পড়ে!

No comments:
Post a Comment