(অভিজ্ঞতাগুলি লিখে না রাখলে পরে হয়ত ভুলে যাব)
মৃত্যু।
— আপনি একদম ঘরে ঢুকে পড়ুন। বেরোবেন না।
— একবার দেখা করা যেত না?
— না না, আপনি ঠিক পাশের ফ্ল্যাটেই থাকেন তো। যদি কোভিড কেস হয়!
— নাও তো হতে পারে!
তবুও দেখা করা হয়নি ওঁদের সঙ্গে। ওঁর মা-এর বয়স হয়েছিল ৮৩। শেষকাজের সময় পুরোহিত দরকার ছিল তাঁদের ধর্মীয় নিয়মানুসারে। সে মুম্বইতে আটকে। একদিন পর এলেন তিনি। মর্গে একরাত কাটানোর পরেও চারজন পাওয়া দুষ্কর হয়ে গেল ওঁকে টাওয়ার অব সাইলেন্সে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
ক্ষুধা।
বেগম হাঁটছে। বেগম আমাদের বাড়িতে কাজ করে; পুণেতে নয়, কলকাতার উপকণ্ঠে যেখানে আমাদের স্থায়ী বাস সেখানে। খবর পেয়েছে বাবা ঠাকুরতলাতে কুপন দেবে — একটু খাবার পাওয়া যাবে। হয়তো ইফতারটা হয়ে যাবে। সেহরিটা জানা নেই। প্রায় ৪০ডিগ্রি সেলসিয়সে হাঁটছে প্রৌঢ়া, অগুণতি ক্রোশ, যে’রকম ঐ পরিযায়ী শ্রমিকেরা হাঁটছে রাজপথ ধরে, প্রতিদিন। কব্জিতে নেই কোনও ফিটবিট।
জীবিকা।
বাইরের সব লোক ঢোকা বন্ধ আমাদের এই উচ্চ মধ্যবিত্তের ফ্ল্যাট কম্প্লেক্সে। একে পুণেতে আমরা হাউসিং সোসাইটি বলি।সেদিন বাইরে দেখা চন্দনের সঙ্গে।
— তুমি পশ্চিম মেদিনীপুরের গ্রামে ফিরে গেলে না কেন?
— ট্রেন বন্ধ হয়ে গেল হঠাৎ। তখনও মাস শেষ হয়নি। অনেকে টাকা দেবে বলেছিল।
— পেলে সব?
— দিল। কিন্তু সেটা গত মাসের কথা। এপ্রিলে তো আপনাদের সোসাইটির একটাও গাড়ি ধুতে পারিনি। টাকা কি পাব?
আমার গাড়ি নেই। উত্তরও নেই।
মামলা।
— শেষ মামলা ছিল ১৬ই মার্চ। ১৭ থেকে বন্ধ।
— তাহলে?
— কিভাবে চলছে জানি না। আর ঠিক দু’মাসের মত সম্বল আছে। পুরো মে মাসটা এরকম চললে...
আমার উকিল বন্ধু, আলিপুর কোর্টে মামলা লড়ে।
চাকরি।
— ৩০শে জুন পর্যন্ত কোনও টাকা দিতে পারবে না। ছুটিতে পাঠিয়ে দিয়েছে। এরপর চাকরি থাকবে কি না তাও জানি না।আপনার কাগজে লেখালেখির কাজ পাওয়া যাবে? গত বছর আপনার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল। ভালো লেগেছিল কথা বলে।বলেছিলেন কাজের সুযোগ হলে জানাবেন। কিছু হবে কি?
লিঙ্কডইনে পাওয়া এই মেসেজের একটা উত্তর দিই। তার উত্তর আসে কিছু ঘন্টা পর।
— ভাগ্য ভালো যে আপনার মতো স্ত্রী-কন্যা সমেত আমার এরকম সংসার নেই।
জন্মদিন।
— ড্যাডি আসতে পারবে না। বাস চলছে না, ট্রেন চলছে না, প্লেন চলছে না... কিচ্ছু চলছে না। আমার জন্মদিনে আসতে পারলনা, তোমার জন্মদিনে আসতে পারল না, পিপির জন্মদিনেও আসতে পারল না। ড্যাডি কি করে আসবে?
৩০শে মার্চ সমাবতী, ৩রা এপ্রিল শমিকা আর ৬ই এপ্রিল দিদির জন্মদিন কেটে গেল কোনও কেক না কেটেই... ভিডিও ফোনে।
প্রতিবেশী।
— গেট পর্যন্ত যেতে পারছি না, রাস্তা সব বন্ধ করে দিয়েছে পুলিশ।
গ্যাসওয়ালার ফোন পেয়ে হন্তদন্ত হয়ে স্কুটারে ফাঁকা সিলিণ্ডার নিয়ে যাই রাস্তার মোড়ে। ভর্তিটা নিয়ে সোসাইটির গেটের কাছেনামিয়ে তারপর গড়ানোর পালা। কোমরের ব্যথায় ভারি কিছু বওয়া বারণ।
— আরে চলুন! দু’জনে ধরে নিয়ে যাই। কতক্ষণ ধরে গোলগোল করবেন?
পুণেতে পরিষ্কার বাংলায় এমন কথা বলে এগিয়ে আসা মানুষটা তো আমার ডাক্তার প্রতিবেশী! কথা হয়না এমনিতে উভয়ের ব্যস্ততার জন্য।
দোকানদার।
— এই আপনার মত লোকদের জন্যই এনেছি। খরাডির ডিস্ট্রিবিউটর মাল পাঠাতে পারবে না। তাই ১২ কিলোমিটার দূর থেকে মাল আনলাম বাইকের পিছনে বসিয়ে। চার পেটি পেয়েছি।
— তা, দাম কি বেশি নেবেন? অনেকেই নিচ্ছেন তো।
— তা হয় না কি? আপনি লেখা দামই দেবেন।
মনের আনন্দে আট প্যাকেট ম্যাগি নিয়ে বাড়ি এলাম — আট দিনের বিকেল। আগের দিন বহু চেষ্টাতেও কোথাও পাইনি।
ইমেল।
— কেমন কাটছে পরিবারের সবার সঙ্গে বসে কাজ করা? পাঠিয়ে দিন আপনার আনন্দের ভিডিও আর ছবি। অফিসের সব সহকর্মীদের পাঠানো এরকম কোলাজ আগে কখনও হয়নি!
এক নিমেষে চলে গেল বিনে।
মৃত্যু।
— আপনি একদম ঘরে ঢুকে পড়ুন। বেরোবেন না।
— একবার দেখা করা যেত না?
— না না, আপনি ঠিক পাশের ফ্ল্যাটেই থাকেন তো। যদি কোভিড কেস হয়!
— নাও তো হতে পারে!
তবুও দেখা করা হয়নি ওঁদের সঙ্গে। ওঁর মা-এর বয়স হয়েছিল ৮৩। শেষকাজের সময় পুরোহিত দরকার ছিল তাঁদের ধর্মীয় নিয়মানুসারে। সে মুম্বইতে আটকে। একদিন পর এলেন তিনি। মর্গে একরাত কাটানোর পরেও চারজন পাওয়া দুষ্কর হয়ে গেল ওঁকে টাওয়ার অব সাইলেন্সে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
ক্ষুধা।
বেগম হাঁটছে। বেগম আমাদের বাড়িতে কাজ করে; পুণেতে নয়, কলকাতার উপকণ্ঠে যেখানে আমাদের স্থায়ী বাস সেখানে। খবর পেয়েছে বাবা ঠাকুরতলাতে কুপন দেবে — একটু খাবার পাওয়া যাবে। হয়তো ইফতারটা হয়ে যাবে। সেহরিটা জানা নেই। প্রায় ৪০ডিগ্রি সেলসিয়সে হাঁটছে প্রৌঢ়া, অগুণতি ক্রোশ, যে’রকম ঐ পরিযায়ী শ্রমিকেরা হাঁটছে রাজপথ ধরে, প্রতিদিন। কব্জিতে নেই কোনও ফিটবিট।
জীবিকা।
বাইরের সব লোক ঢোকা বন্ধ আমাদের এই উচ্চ মধ্যবিত্তের ফ্ল্যাট কম্প্লেক্সে। একে পুণেতে আমরা হাউসিং সোসাইটি বলি।সেদিন বাইরে দেখা চন্দনের সঙ্গে।
— তুমি পশ্চিম মেদিনীপুরের গ্রামে ফিরে গেলে না কেন?
— ট্রেন বন্ধ হয়ে গেল হঠাৎ। তখনও মাস শেষ হয়নি। অনেকে টাকা দেবে বলেছিল।
— পেলে সব?
— দিল। কিন্তু সেটা গত মাসের কথা। এপ্রিলে তো আপনাদের সোসাইটির একটাও গাড়ি ধুতে পারিনি। টাকা কি পাব?
আমার গাড়ি নেই। উত্তরও নেই।
মামলা।
— শেষ মামলা ছিল ১৬ই মার্চ। ১৭ থেকে বন্ধ।
— তাহলে?
— কিভাবে চলছে জানি না। আর ঠিক দু’মাসের মত সম্বল আছে। পুরো মে মাসটা এরকম চললে...
আমার উকিল বন্ধু, আলিপুর কোর্টে মামলা লড়ে।
চাকরি।
— ৩০শে জুন পর্যন্ত কোনও টাকা দিতে পারবে না। ছুটিতে পাঠিয়ে দিয়েছে। এরপর চাকরি থাকবে কি না তাও জানি না।আপনার কাগজে লেখালেখির কাজ পাওয়া যাবে? গত বছর আপনার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল। ভালো লেগেছিল কথা বলে।বলেছিলেন কাজের সুযোগ হলে জানাবেন। কিছু হবে কি?
লিঙ্কডইনে পাওয়া এই মেসেজের একটা উত্তর দিই। তার উত্তর আসে কিছু ঘন্টা পর।
— ভাগ্য ভালো যে আপনার মতো স্ত্রী-কন্যা সমেত আমার এরকম সংসার নেই।
জন্মদিন।
— ড্যাডি আসতে পারবে না। বাস চলছে না, ট্রেন চলছে না, প্লেন চলছে না... কিচ্ছু চলছে না। আমার জন্মদিনে আসতে পারলনা, তোমার জন্মদিনে আসতে পারল না, পিপির জন্মদিনেও আসতে পারল না। ড্যাডি কি করে আসবে?
৩০শে মার্চ সমাবতী, ৩রা এপ্রিল শমিকা আর ৬ই এপ্রিল দিদির জন্মদিন কেটে গেল কোনও কেক না কেটেই... ভিডিও ফোনে।
প্রতিবেশী।
— গেট পর্যন্ত যেতে পারছি না, রাস্তা সব বন্ধ করে দিয়েছে পুলিশ।
গ্যাসওয়ালার ফোন পেয়ে হন্তদন্ত হয়ে স্কুটারে ফাঁকা সিলিণ্ডার নিয়ে যাই রাস্তার মোড়ে। ভর্তিটা নিয়ে সোসাইটির গেটের কাছেনামিয়ে তারপর গড়ানোর পালা। কোমরের ব্যথায় ভারি কিছু বওয়া বারণ।
— আরে চলুন! দু’জনে ধরে নিয়ে যাই। কতক্ষণ ধরে গোলগোল করবেন?
পুণেতে পরিষ্কার বাংলায় এমন কথা বলে এগিয়ে আসা মানুষটা তো আমার ডাক্তার প্রতিবেশী! কথা হয়না এমনিতে উভয়ের ব্যস্ততার জন্য।
দোকানদার।
— এই আপনার মত লোকদের জন্যই এনেছি। খরাডির ডিস্ট্রিবিউটর মাল পাঠাতে পারবে না। তাই ১২ কিলোমিটার দূর থেকে মাল আনলাম বাইকের পিছনে বসিয়ে। চার পেটি পেয়েছি।
— তা, দাম কি বেশি নেবেন? অনেকেই নিচ্ছেন তো।
— তা হয় না কি? আপনি লেখা দামই দেবেন।
মনের আনন্দে আট প্যাকেট ম্যাগি নিয়ে বাড়ি এলাম — আট দিনের বিকেল। আগের দিন বহু চেষ্টাতেও কোথাও পাইনি।
ইমেল।
— কেমন কাটছে পরিবারের সবার সঙ্গে বসে কাজ করা? পাঠিয়ে দিন আপনার আনন্দের ভিডিও আর ছবি। অফিসের সব সহকর্মীদের পাঠানো এরকম কোলাজ আগে কখনও হয়নি!
এক নিমেষে চলে গেল বিনে।









