Tuesday, 30 June 2020

ইনবক্স তো খোলা...

ইনবক্স তো খোলা কিন্তু মন খোলা কি? কথা বলি বড়-বড়, লিখি তারও বেশি। কিন্তু কারোর মনের খবর কি রাখি? 

এমনই বর্ষার রাতে বসে আছে হাসপাতালের বারান্দার এক বেঞ্চে। কেউ একজন। ভর্তি যে, সে তার এক বন্ধু। জ্বর। শ্বাসকষ্ট। আজ এই করোনাকবলিত দেশে সে বন্ধু কি জ্বরে আক্রান্ত? বর্ষায় কি কবিতা লিখছে, না কৃত্রিম শ্বাসপ্রক্রিয়া চলছে? খবর রাখেনি দু’জনের কেউ — কত বছর পার ইতিমধ্যে। ইনবক্স কিন্তু খোলা।

ফেসবুকে লাইকানোও জারি। তবু কি পাশে থাকার চেষ্টা করেনি ২০ বছরের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া বন্ধুর? না। একবারও জিজ্ঞাসা করেনি কেমন আছে সে। জানেই না কি করে পাশে থাকতে হয় — ফোন করবে না গল্প করবে চ্যাটে না ‘তোমায় গান শোনাবো’।এ’সব তো ইস্কুলে শেখায় না। তবুও বড় মুখে বলব ইনবক্স খোলা। 

কোনও চিঠি আসে না। গয়না যা ছিল বিক্রি করে ছেলেকে বিদেশে পড়তে পাঠানো। বিলেত-ফেরত সেই ছেলে তৈরি করল নিজের সংস্থা, সংসার পাতল, কিন্তু মা-কে চিঠি লেখা আর হল না। প্রায় ২৫ বছর পর মা-এর মুখ শেষ দেখা, শ্মশানে। বোন এগিয়ে দেয় যত্ন করে রাখা এক বাণ্ডিল কাগজ। বিলেত থেকে শেষ পাঠানো পোস্টকার্ড, এয়ারমেলের খাম। ইনবক্স তো খোলা ছিল, ছেলে খবর নেয়নি। 

“একসময় কতজনের CV forward করেছি যদি কোথাও কোনও কাজ পায়। সেদিন আমার চাকরি গেল কিন্তু নিজের অফিসের কেউ একবারও ফোন করে খবর নিল না কেমন আছি, কি করে সংসার চালাব; এদের এত connection কিন্তু একবারও বলল না CV-টা পাঠাও, দেখি কিছু করা যায় কি না।” এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে থামল ও। নিস্তব্ধতা গ্রাস করে ফোন... ফোনটা খোলা ছিল। মানবিক মুখটা বন্ধ ছিল, অনেকের।

এইরকম ছোট-বড় ঘটনা অগুনতি আমাদের প্রত্যেকের জীবনে। গত কয়েকদিন ধরে social media ছেয়ে গেছে ইনবক্স খোলা-ফোন খোলা ধরণের পোস্টে। কিন্তু আমরা ক'জনের খবর সত্যি রাখি। কার মনে কি চলছে, তা জানার চেষ্টা করি কি? সেদিন একজন লিখেছে, “দাদা কেন একবারও আমাদের সঙ্গে কথা বলল না? আমরা কি এতো দূরের?” উত্তর দেয়ারও কেউ নেই। মনখারাপ-একাকীত্ব থেকে অবসাদ হয়ে আত্মহত্যার পথ সুদীর্ঘ। অকস্মাৎ কোনও কিছু হয় কি? নিজের কাছের মানুষগুলো কেমন আছে? সেই খবর রাখার জন্য কোনও খোলা ডাকবাক্স লাগে না, প্রয়োজন পড়ে না হাজারো পোস্টের।

কথা বলাটা আসল। যার মনখারাপ সে তো বলবে না, আমাকেই বলতে হবে। একটু মানবিক হই। যোগাযোগ রাখার চেষ্টা পাশাপাশি বসে একে-অপরের পোস্ট লাইকানো নয়। 


Thursday, 23 April 2020

বন্দী সময়ের কথা

(অভিজ্ঞতাগুলি লিখে না রাখলে পরে হয়ত ভুলে যাব)


মৃত্যু।


— আপনি একদম ঘরে ঢুকে পড়ুন। বেরোবেন না। 
— একবার দেখা করা যেত না?
— না না, আপনি ঠিক পাশের ফ্ল্যাটেই থাকেন তো। যদি কোভিড কেস হয়!
— নাও তো হতে পারে! 
তবুও দেখা করা হয়নি ওঁদের সঙ্গে। ওঁর মা-এর বয়স হয়েছিল ৮৩। শেষকাজের সময় পুরোহিত দরকার ছিল তাঁদের ধর্মীয় নিয়মানুসারে। সে মুম্বইতে আটকে। একদিন পর এলেন তিনি। মর্গে একরাত কাটানোর পরেও চারজন পাওয়া দুষ্কর হয়ে গেল ওঁকে টাওয়ার অব সাইলেন্সে নিয়ে যাওয়ার জন্য। 


ক্ষুধা। 


বেগম হাঁটছে। বেগম আমাদের বাড়িতে কাজ করে; পুণেতে নয়, কলকাতার উপকণ্ঠে যেখানে আমাদের স্থায়ী বাস সেখানে। খবর পেয়েছে বাবা ঠাকুরতলাতে কুপন দেবে — একটু খাবার পাওয়া যাবে। হয়তো ইফতারটা হয়ে যাবে। সেহরিটা জানা নেই। প্রায় ৪০ডিগ্রি সেলসিয়সে হাঁটছে প্রৌঢ়া, অগুণতি ক্রোশ, যে’রকম ঐ পরিযায়ী শ্রমিকেরা হাঁটছে রাজপথ ধরে, প্রতিদিন। কব্জিতে নেই কোনও ফিটবিট। 


জীবিকা। 

বাইরের সব লোক ঢোকা বন্ধ আমাদের এই উচ্চ মধ্যবিত্তের ফ্ল্যাট কম্প্লেক্সে। একে পুণেতে আমরা হাউসিং সোসাইটি বলি।সেদিন বাইরে দেখা চন্দনের সঙ্গে।
— তুমি পশ্চিম মেদিনীপুরের গ্রামে ফিরে গেলে না কেন?
— ট্রেন বন্ধ হয়ে গেল হঠাৎ। তখনও মাস শেষ হয়নি। অনেকে টাকা দেবে বলেছিল। 
— পেলে সব?
— দিল। কিন্তু সেটা গত মাসের কথা। এপ্রিলে তো আপনাদের সোসাইটির একটাও গাড়ি ধুতে পারিনি। টাকা কি পাব?
আমার গাড়ি নেই। উত্তরও নেই। 


মামলা।


— শেষ মামলা ছিল ১৬ই মার্চ। ১৭ থেকে বন্ধ। 
— তাহলে? 
— কিভাবে চলছে জানি না। আর ঠিক দু’মাসের মত সম্বল আছে। পুরো মে মাসটা এরকম চললে...
আমার উকিল বন্ধু, আলিপুর কোর্টে মামলা লড়ে।


চাকরি।


— ৩০শে জুন পর্যন্ত কোনও টাকা দিতে পারবে না। ছুটিতে পাঠিয়ে দিয়েছে। এরপর চাকরি থাকবে কি না তাও জানি না।আপনার কাগজে লেখালেখির কাজ পাওয়া যাবে? গত বছর আপনার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল। ভালো লেগেছিল কথা বলে।বলেছিলেন কাজের সুযোগ হলে জানাবেন। কিছু হবে কি?
লিঙ্কডইনে পাওয়া এই মেসেজের একটা উত্তর দিই। তার উত্তর আসে কিছু ঘন্টা পর। 
— ভাগ্য ভালো যে আপনার মতো স্ত্রী-কন্যা সমেত আমার এরকম সংসার নেই। 


জন্মদিন।


— ড্যাডি আসতে পারবে না। বাস চলছে না, ট্রেন চলছে না, প্লেন চলছে না... কিচ্ছু চলছে না। আমার জন্মদিনে আসতে পারলনা, তোমার জন্মদিনে আসতে পারল না, পিপির জন্মদিনেও আসতে পারল না। ড্যাডি কি করে আসবে?
৩০শে মার্চ সমাবতী, ৩রা এপ্রিল শমিকা আর ৬ই এপ্রিল দিদির জন্মদিন কেটে গেল কোনও কেক না কেটেই... ভিডিও ফোনে। 


প্রতিবেশী। 


— গেট পর্যন্ত যেতে পারছি না, রাস্তা সব বন্ধ করে দিয়েছে পুলিশ। 
গ্যাসওয়ালার ফোন পেয়ে হন্তদন্ত হয়ে স্কুটারে ফাঁকা সিলিণ্ডার নিয়ে যাই রাস্তার মোড়ে। ভর্তিটা নিয়ে সোসাইটির গেটের কাছেনামিয়ে তারপর গড়ানোর পালা। কোমরের ব্যথায় ভারি কিছু বওয়া বারণ। 
— আরে চলুন! দু’জনে ধরে নিয়ে যাই। কতক্ষণ ধরে গোলগোল করবেন?
পুণেতে পরিষ্কার বাংলায় এমন কথা বলে এগিয়ে আসা মানুষটা তো আমার ডাক্তার প্রতিবেশী! কথা হয়না এমনিতে উভয়ের ব্যস্ততার জন্য। 


দোকানদার। 


— এই আপনার মত লোকদের জন্যই এনেছি। খরাডির ডিস্ট্রিবিউটর মাল পাঠাতে পারবে না। তাই ১২ কিলোমিটার দূর থেকে মাল আনলাম বাইকের পিছনে বসিয়ে। চার পেটি পেয়েছি। 
— তা, দাম কি বেশি নেবেন? অনেকেই নিচ্ছেন তো। 
— তা হয় না কি? আপনি লেখা দামই দেবেন। 
মনের আনন্দে আট প্যাকেট ম্যাগি নিয়ে বাড়ি এলাম — আট দিনের বিকেল। আগের দিন বহু চেষ্টাতেও কোথাও পাইনি। 


ইমেল।


— কেমন কাটছে পরিবারের সবার সঙ্গে বসে কাজ করা? পাঠিয়ে দিন আপনার আনন্দের ভিডিও আর ছবি। অফিসের সব সহকর্মীদের পাঠানো এরকম কোলাজ আগে কখনও হয়নি! 
এক নিমেষে চলে গেল বিনে। 

Monday, 11 November 2019

বাংলা ছবি, আজকাল

সেদিন একটা বাংলা ছবির সারণি দিয়েছিলাম ফেসবুকে। চার সপ্তাহে প্রায় চল্লিশটা ছবি দেখেছিলাম একটা অ্যাপে। অবশ্যই এর একটা বড় কারণ ছিল না-দেখা ছবিগুলো দেখে ফেলা। অন্য একটা কারণও ছিল — গত সাত বছরে কিভাবে বাংলা চলচ্চিত্র পরিবর্তিত হয়েছে। সাত বছর আগে আমি শেষ হলে গিয়ে কোনও বাংলা ছবি দেখি।

ফেসবুকে তালিকাটি দেওয়ার পরেই বেশ কিছু মন্তব্য এল, সঙ্গে হরেকরকম ইমোজি। অনেকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আমি মানসিক ভাবে সুস্থ কি না! যখন আমরা ইংরেজি সাহিত্য পড়তাম, তখন থেকেই একটা অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল সবকিছুকেই টেক্সট হিসেবে দেখা। চলচ্চিত্র-চর্চা চলত তখন থেকেই। কলকাতার সিনে সেন্ট্রালের লাইফ মেম্বার হওয়ার কারণে সারা বছর বিভিন্ন দেশের ছবি দেখেছি বছরের পর বছর। আমার বন্ধুদের ক'জন তিউনিসিয়ার ছবি দেখেছে জানিনা, কিন্তু আমার মত কিছু পাগল, এই মনে করুন ১০-১২ জন সাতদিন ধরে দুপুরে নন্দন-২ হলে সেই চলচ্চিত্র উৎসব দেখেছি — বলা ভালো, গিলেছি। শান্তিনিকেতনে আমরা শুরু করেছিলাম বীক্ষণ ফিল্ম সোসাইটি আর তার আন্তর্জাতিক উৎসবের সময় ছবি যোগাতেন সিনে সেন্ট্রালের অলোকদা। ছবি কিউরেট করা থেকে শুরু করে কলকাতা থেকে ক্যান এনে বোলপুরের গীতাঞ্জলিতে দেখানোর কাজ করেছি দীর্ঘদিন। তখন কেউ পাগল বলেনি, বরং ৭৫০ সিটের প্রেক্ষাগৃহ পূর্ণ করে লোকজন দেখতে এসেছে, মাত্র ১০ টাকার টিকিটে।

তো এখন কেন ভাবল যে আমি পাগল? বা, আমার মত যারা বাংলা ছবি দেখে, তারাও কি পাগল? এই ৪০-টি ছবির পরিচালকরা আমাদের সময়ের সেরা বলা চলে। সেরা দু'রকম হয় — সত্যজিৎ রায়-ঋত্বিক ঘটক আর অন্যদিকে অজয় কর-অগ্রদূত। পৃথিবীর সব ভাষাতেই হয়ত এই দুই ধরণের ছবি হয়। আমাদের সময় তো অনেক ভালো যখন দেখি সৃজিত মুখোপাধ্যায়, রাজ চক্রবর্তী, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় এবং আরও অনেকেই হাউসফুল পাচ্ছেন। যদি মনে করি, চলচ্চিত্রের একমাত্র উদ্দেশ্য বিনোদন, তবে একথা অনস্বীকার্য যে আমি সব ছবিগুলো দেখে আনন্দ পেয়েছি। প্রত্যেকটা ছবির স্বাদ আলাদা, এমনকি পার্থক্য আছে 'চৌরঙ্গী' আর 'শাহজাহান রিজেন্সি'-তেও। 'বিবাহ অভিযান' না দেখলে জানতেও পারতাম না 'শাহজাহান রিজেন্সি'-তে নিজের গাওয়া গানের প্যারডি নিজেই কি করে করেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য! বিরসা-অরিন্দম-প্রতিম-নন্দিতা-শিবপ্রসাদ-ধ্রুব এঁরা প্রত্যেকে যথেষ্ট ভেবে এবং পরিশ্রম করে ছবিগুলো বানিয়েছেন, তা বোঝাই যায়। প্রত্যেকের নিজস্ব ধারা আছে।


(ছবি ইন্টারনেট থেকে)

তবে বাঙালি দর্শকের মুশকিলটা কোথায়? ভালো গল্প নেই? না কি পরিচালকরা গল্প বলতে পারছেন না? না কি ভালো অভিনেতা নেই? মানছি, উত্তম-সুচিত্রার মত জুটি আবার হবে না, কিন্তু মিমি-সোহম বা আবির-পায়েল? এঁরা কি খুব খারাপ? চিত্রনাট্য অনুসারে এঁদের অভিনয় খারাপ না, বরং এখনকার হিন্দি ছবিগুলোর তুলনাতে অনেকের অভিনয় বেশ ভালো — যেমন যীশু বা শাশ্বত বা আবির বা অনির্বাণ, আর সর্বোপরি প্রসেনজিৎ। মজার ব্যাপার হলো, বেশ কিছু ছবি জনপ্রিয় দক্ষিণ ভারতীয় ছবির পুনর্নির্মাণ। কিন্তু তাও নাকি আজকের বাঙালির পছন্দ না। এ কি আমাদের উন্নাসিকতা? আমরাও কি রবীন্দ্রনাথ আর সত্যজিতে আটকে পড়েছি? তবে কিন্তু বিপদ। রবীন্দ্রনাথের থেকে ভালো গীতিকার হয় না, মানছি; কিন্তু অনুপম বা দীপাংশু বা ঋতম কি খুব-খুউব খারাপ? গৌরীপ্রসন্ন-নচিকেতা-পুলকের যুগ ফিরে আসবে না জানি। যুগের সঙ্গে পরিবর্তনটাও তো চাই। কারণ দর্শকেরও তো পরিবর্তন হয়েছে।  

সমস্যাটা হয়ত অন্য জায়গায়। আমার মনে হয় কয়েকটি কারণ — ১. টিভির ছোট পর্দাকে আপন করে নেওয়া ২. সেই জন্য হলে গিয়ে ছবি দেখার নেশা চলে যাওয়া ৩. এই নেশার ফলে মফস্সলে হলগুলোর অবনতি এবং ক্রমহ্রাসমান দর্শক ৪. কলকাতা ও শহরতলিতেও হল বাঁচিয়ে রাখতে বাংলা ছবির জায়গা কম দেওয়া ৫. বিভিন্ন অ্যাপে ছবি দেখা 
এর প্রত্যেকটি কারণ একে-অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এর সঙ্গে যোগ করুন মিলেনিয়াল বাবা-মা'দের উত্তর-মিলেনিয়াল সন্তানদের 'জঙ্গল বুক' দেখাতে নিয়ে যাওয়া কিন্তু 'গুপ্তধনের সন্ধানে' দেখানো থেকে নিরস্ত করা। আমরা ধরেই নিয়েছি বাংলা ভাষার সব ছবি খারাপ — সে বড়দের হোক বা ছোটদের। আচ্ছা, বাংলা ছবির স্বর্ণযুগে একটা 'ভিঞ্চি দা' বা একটা 'সোয়েটার' বা 'বেলাশেষে' হয়েছে? যাঁরা একটু অন্যরকম ভাবেন বা ছবি করেন, তাঁদের ভাবনার স্বীকৃতির জন্যও তো ছবিগুলো দেখা যায়। 


[চার সপ্তাহে দেখা প্রায় চল্লিশটা ছবির তালিকাটি আবার দিলাম —বর্ণ পরিচয়, শাহজাহান রিজেন্সি, চৌরঙ্গী, মুখার্জিদার বৌ, আহারে মন, বিবাহ অভিযান, রসগোল্লা, গুপ্তধনের সন্ধানে, দুর্গেশগড়ের গুপ্তধন, সোয়েটার, ভিঞ্চি দা, ভিলেন, বাপি বাড়ি যা, বোঝে না সে বোঝে না, চিরদিনই তুমি যে আমার, চিরদিনই তুমি যে আমার ২, এবার শবর, আসছে আবার শবর, গল্প হলেও সত্যি, প্রলয়, হেমলক সোসাইটি, শুধু তোমারই জন্য, ক্রিসক্রস, বাঙালি বাবু ইংলিশ মেম, বেলাশেষে, জামাই ৪২০, জাতিস্মর, চতুষ্কোণ, কাটমুণ্ডু, গ্যাংস্টার, কি করে তোকে বলবো, নির্বাক, এক যে ছিল রাজা, কেলোর কীর্তি, প্রাক্তন, টোটাল দাদাগিরি, জুলফিকার, হামি, পারব না আমি ছাড়তে তোকে ]

Thursday, 28 February 2019

বাবার জন্মদিন

শ্রীচরণেষু বাবা।
এই লিখে শুরু হত আমার চিঠি। জায়গা আমার জন্য সংক্ষিপ্ত। ইনল্যান্ড লেটার-এর পেছনের পাতার অর্ধেক। বাকি অর্ধেক দিদির। বাকি দুই পাতা মা -এর। বাবা বাড়ি আসে বছরে দু-তিনবার। চিঠি আসে যায় প্রতি সপ্তাহে প্রায়। শেখার আবদার করাতে একবার বাবা লিখল পরের বার এসে ঘুড়ি ওড়ানো শিখিয়ে দেবে। ছুটির মধ্যে হঠাৎ ডাক আসে। অফিস যেতে হবে পরদিন। অনেক লম্বা সে রেলযাত্রা। বাবার কাছে আমার ঘুড়ি ওড়ানো শেখা হল না।

ষাটের দশকে তখন জিওলজিস্ট। 

শেখা হয়নি অনেক কিছুই। সাঁতার বা ফুটবল। বাবা জেলাস্তরে ফুটবল খেলেছে, হাড়ও ভেঙেছে। আমাদের বাড়ি ছিল পুকুরপাড়ে কিন্তু হস্টেল চলে গেলাম তাই বাবার সঙ্গে দুই-একবার জলে নামলেও সাঁতার শেখা হয়নি তখন। ফুটবলেও তাই হল। কিন্তু এসবের বাইরে শিখলাম অনেক কিছু, বিশেষত অঙ্ক। লোডশেডিং তখন নিয়মিত, অবশ্যম্ভাবী। হ্যারিকেনের আলোতে যুদ্ধ — বাবা, আমি আর অঙ্ক। এমন যুদ্ধে কাবু হতে হতে একসময় আমি জয়ী হতাম। তখন ছাড় পেতাম বাবার কাছে। হয়তো মাঝরাতে।

খাজুরাহোতে সত্তরের দশকে। 

আসলে বাবাদের কাছে শেখা তো ঠিক স্কুলের মত হয়না। এর না আছে কোনও বাঁধা-ধরা ছক বা সময়। সার্কাস শেষ দেখেছি বাবার সঙ্গে, এবং পি.সি. সরকারের জাদুও। সে-সবের মাঝে উত্তর দিয়ে গেছে আমার অজস্র কেন-এর। হয়তো বইমেলাতে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করেছে ১৩-এর ঘরের নামতা।
ছোটবেলাতে বাসের টিকিট জমাতাম। বাবা একদিন সেখান থেকে একমুঠো টিকিট দিয়ে বলল কত টাকার টিকিট হয়েছে গুনতে! খেলা হয়ে গেল পড়া।

একদিন হেমন্ত গেল আটকে। বাবা শেখাল কি করে টেপ ছাড়াতে হয় হেড থেকে আর তারপর পেনসিল দিয়ে সেটা ঠিক করতে হয়। তবে কখনও শিখিনি সিগারেট খাওয়া, দেখেছি কিভাবে বদলে যায় প্যাকেটের নামগুলো — ক্যাপস্টান, রিজেন্ট, উইলস বা গোল্ড ফ্লেক। যখন বাবাকে নিয়ে যাচ্ছে এঞ্জিওপ্লাস্টি করাতে, তখনও কি বালিশের তলাতে ক্লাসিকের প্যাকেটটা ছিল? দেখলাম, নেই! ছোট থেকে বলতাম খেয়ো না, কথা শুনতো না। কথা শোনা-না-শোনা একটা দ্বিপাক্ষিক ব্যাপার। আমিও তো বাবার অনেক কথা শুনিনি!

বাবা আর আমি। দুর্গাপুর। ১৯৮২

২৯শে ফেব্রুয়ারী বাবার জন্মদিন, চার বছরে একবার আসে। এবছর নেই। বাবার যে-বছর পঞ্চাশ হয়েছিল, সেই বছরও ছিল না লিপ ইয়ার। বাবা বাইরে। আমি আর দিদি কার্ড পাঠিয়েছিলাম। এবার বাবার পঁচাত্তর। আমি বাইরে। বাবার জন্মদিন আসে আর যায়। নীরবে।

Monday, 28 January 2019

তবু মনে রেখো

— শান্তিনিকেতন গ্যাছো?
— না। ও তো বাবুদের জায়গা! তবে কলা ভবনে যাওয়ার একটা ইচ্ছে আছে।
— বেশ তো। তোমার তথ্যচিত্র দেখানোর ব্যবস্থা করি। ওখানে একটা ফিল্ম ক্লাব, বীক্ষণ, আমরা শুরু করেছিলাম। তার সদস্যদের ভালো লাগবে। সর্বোপরি, বিনয় মজুমদারকে নিয়ে এমন কাজ তো আগে হয়নি।
— আর হবেও না, বুঝলা? কলকাতার বাবুরা ওঁকে পাত্তা দেয়নি। ভাবতে পারো, একটা লোক সবার আড়ালে বসে অঙ্ক করে আর কবিতা লেখে। এরকম মানুষ তুমি দেখেছ কয়ডা?
— কিন্তু উনি তো অভিমানি। সাহিত্য সভাতে যাবেন না!
— কে বলেছে? কলকাতা মর্যাদা দেয় কবিকে? কত কবি-শিল্পী হারিয়ে গেলো ওদের জন্য...

ওরা কারা? এটা শঙ্করদাকে জিজ্ঞাসা করলে হাসতো শুধু, আর হাজারো আঁকা খুলে দেখাতো।
— আমার তো আঁকার কোনো প্রথাগত শিক্ষা নেই। বঙ্গবাসি কলেজ। তাই সাহস করে কলা ভবন-মুখো হইনি।

শঙ্করদা গিয়েছিল কলা ভবন, বীক্ষণের আমন্ত্রণে তথ্যচিত্র, 'অন্য আলো, অন্য আঁধার' দেখাতে। আমি শিবদাকে (শিবাদিত্য সেন) বলেছিলাম শঙ্করদার কথা। রতনে রতন চেনে। পরিচয় হল দুজনের। প্রান্ত কবির কথা প্রান্তিক ছবি-করিয়ে শোনালো শান্তিনিকেতনকে। সেদিন কি আনন্দ শঙ্করদার। আমাকে ফোন করে বলল সে কথা, আর বলল রামকিঙ্করের কলের বাঁশি, সাঁওতাল পরিবারের কথা। শিবদা যেদিন চলে গেল গত বছর, শঙ্করদা আমার ফেবু পোস্টের তলায় লিখল, "শিবদা আমাদের স্মৃতিতে থাকবেন। ওনার আমন্ত্রণেই প্রথম শান্তিনিকেতনে যাই।"


গতকাল ফেবু বলল, শঙ্করদা নেই। দু'সপ্তাহ সময় দিয়েছিল ক্যান্সার, বা একটু বেশি। কাউকে জানায়নি তেমন, বাড়ির লোকজন ছাড়া। এর মাঝেই কাজ করেছে। আমি সেদিন বাদামিতে। হোটেলে সকাল হোলো শঙ্করদার ছবি দেখে, ফেবুতেই। ওই সকালেই শেষ পোস্ট। ২৬শে জানুয়ারি তো প্রজাতন্ত্র দিবস, সেদিনই 'লাস্ট পোস্ট'? যুদ্ধ তো বাকি। পরদিন শেষ।

— জানো, ওরা কতটা যুদ্ধ করে?
— কারা?
— ইঁটভাটার মহিলারা। সারা দুপুর ধরে স্কেচ করলাম। কোলে বাচ্চা নিয়ে মা কাজ করছে, সে-ই মা আবার রান্না করছে, সন্ধ্যে নামলেই অন্ধকার, অত্যাচার।
— তো কি করবে তুমি?
— ছবি বানাবো। ওরা ঝাড়খণ্ড থেকে এসেছে। আবার চলে যাবে। আবার আসবে। কিন্তু ঘামঝরা এই ইতিহাস ধরে রাখা দরকার। 

পাঁচ বছর ধরে চলল কাজ। তথ্যচিত্র 'পোড়া মাটি মুখ' তৈরি হোলো। সঙ্গে চলছে রাতভর ছবি আঁকা। আমার সাধ্যমত একটা ছোট লেখা লিখলাম। সে-ও প্রায় এগারো বছর আগে।


— করেছ কি? ইংরেজি কাগজে আমার নাম?
— মানে ঐ আর কি। তোমাদের মত মানুষদের জন্য যেটুকু পারি।
— প্রান্ত কথাটার মানে বোঝো? আমাদের কথা কেউ লেখে না, আর এটা অভিমানের কথা না, উপেক্ষিতর কথা।
— কিন্তু তোমার চলচিত্র আর রেখাচিত্র অন্য কথা বলে। তুমি মোটেও উপেক্ষিত নও।
— সে তুমি বুঝবা না।

মাঝে মাঝে আমরা হারিয়ে যাই। যে যার কাজে ব্যস্ত। হঠাৎ মোবাইলের পর্দায় ভেসে ওঠে, "মনে রেখো"। কোনওদিন ভাবতে পারিনি লিখতে হবে মনে রাখার কথা।

কত কথা মনে আসছে, সব লেখাও যায় না। যেমন, নতুন ফ্ল্যাট কিনেছি, শঙ্করদাকে বললাম। এসে দেখে বলল, একটা দেওয়াল আমার জন্য ছেড়ে দাও, ছবি আঁকবো। আমি বললুম, বেশ তো, আঁকো। তারপর আর আঁকলো না। সারারাত ধরে ভাবলো আঁকবে কিন্তু সকালে একটা বিড়ি ধরিয়ে নিচে চা-এর দোকানে চা খেয়ে ধাঁ! একদিন দুপুরে বাড়ি এসে আমার মা-এর হাতে রান্না খেয়ে বলে, আবার একদিন খাবো কাকিমা। কিন্তু আর এলো না! এরকম বিভিন্ন সময়ে শঙ্করদা দেখা দিয়েছে হঠাৎ আবার হারিয়েও গেছে তেমনই। শুধু এবার হারিয়ে গেল, আর দেখা হবে না। 

Monday, 13 August 2018

প্রণাম সোমনাথ'দা

সোমনাথ'দার চোখে জল। জলের ধারা। আমি কোনওদিন দেখিনি। আমি নিশ্চিত, সর্বসমক্ষে ওঁর মত ব্যক্তিত্ব কাঁদছেন মানে মনের দুর্বল কোথাও আঘাত পেয়েছেন। এটা যে-সময়ের ঘটনা, তখনও সোমনাথ'দাকে ওরা বের করে দেয়নি। যদিও পার্টি তার ঠিক সাত মাস পরে ওটাই করবে যা পরের দশ বছরেও — ১৩ অগস্ট ২০১৮ পর্যন্ত — সোমনাথ'দা ভুলতে পারেননি।

— সোমনাথ'দা, চোখে জল?
— এত ভালো বানিয়েছে ছবিটা, মনটা কেমন করে উঠল।
— আপনি দিল্লিতে সারা দেশের সাংসদ'দের সামলান। আপনাকে কখনও দুর্বলচিত্ত মনে হয়নি...
— আসলে কি জানো, সংসদ তো কাজের জায়গা, সেখানে দৃঢ় থাকতেই হয়। কিন্তু এই ছবিটা আমাকে কেমন যেন করে দিল...

'তারে যমিন পর'।

না ওঁর সেদিন ছবি দেখতে যাওয়ার কথা, না আমার। আমি শান্তিনিকেতনে গেছি চাকরির ফাঁকে একদিনের ছুটিতে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে, উনিও সংসদের শীতকালীন অধিবেশন শেষে বোলপুরে। হঠাৎ দেখা। আমার মত অর্বাচীনকে চিনতে পারার কথা না। কিন্তু সোমনাথ'দা সবার খোঁজ রাখেন — ওঁর এলাকার ভোটার না হলেও! কিন্তু শত ব্যস্ততার মধ্যেও টুক-টাক কথা হয়ে যায়। গীতাঞ্জলিতে অবশ্য সেদিন সন্ধ্যের শো-এর পর বেশি কথা হয়নি।

গীতাঞ্জলি থেকেই সোমনাথ'দার সঙ্গে আমার পরিচয়। তখনও সাংবাদিক হইনি, সিপিএম-ও কোনওদিন করিনি। একটাই পরিচয় — সাংস্কৃতিক কাজ-কর্মে জড়িত ঝোলাওয়ালা ছাত্র, বীক্ষণের সঙ্গে যুক্ত, ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলন করে।

— সোমনাথ'দা, গীতাঞ্জলি উৎসবে কুইজ প্রতিযোগিতা করাব একটা?
— এটা আবার ফিল্ম সোসাইটি-এর সঙ্গে কি সম্পর্ক?
— না না। ফিল্ম সোসাইটি না। জনসাধারণের জন্য কুইজ, যে কেউ আসতে পারবে।
— ও। বেশ তো। করাও। কোন দিন হল ফাঁকা দেখে নাও।

সোমনাথ'দার কথা-ই শেষ কথা। শুধু প্রথামাফিক একটা চিঠি। প্রাক-ফেসবুক যুগে মেমারি-বাঁকুড়া থেকেও লোক এসেছিল বোলপুরে কুইজে। ছবি দেখানো, ফিল্ম সোসাইটি চালানো — এ-সবে সোমনাথ'দার কাছে যা সাহায্য পেয়েছি আমরা, তা লিখে শেষ করতে পারবো না।

— তুমি ফ্রি আছো?
— আপনি ডেকেছেন, কি আর কাজ থাকতে পারে?
— ___-এর স্কুলের একটা অনুষ্ঠান আছে। একটু সঞ্চালনা করে দিতে হবে।

তখন আমি ছাত্র, আকাশবাণীতে গলা বেচে খাই। এক সন্ধ্যায় আকাশবাণীতে কাজ করলে জোটে ৭৫ টাকা। দিনমজুরির মত সন্ধ্যা-মজুরি।

— কিন্তু এর জন্য কোনও পয়সা পাবে না।
— সে না হয় দেবেন না! আকাশবাণী তো ৭৫ টাকা দিচ্ছে পাঁচ ঘন্টার অনুষ্ঠান সঞ্চালনাতে!
— বলো কি! এতো কম?
— ছাড়ুন তো! সবাই গরিব হয়েই থাকবো।

এর ক'দিন পরের কথা। মেলার মাঠে সে'বার ফুল-মেলার আসর। সোমনাথ'দা, সুধাংশু শীল এবং আরও অনেকে। আমার আবার ডাক পড়েছে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সঞ্চালনার। ফুল নিয়ে রবীন্দ্রসংগীত আর অনেক আলোচনা শেষ। আমি ঝোলা গুছিয়ে নেমেছি মঞ্চ থেকে। উদ্যোক্তাদের একজন এসে হাতে ধরালেন সাদা খাম। সোমনাথ'দা কারও সঙ্গে কথার ফাঁকে আড় চোখে দেখলেন। একটা হাসি।

মিলিয়ে যাচ্ছে। হাসিটা মিলিয়ে যাচ্ছে। বাংলা টিভি চ্যানেলের লাইভ নোটিফিকেশন ফেসবুকে। সাদা চাদরে মোড়া শরীর। লাল শুধু সেলামে।
শান্তিনিকেতনে যখন পড়ি, কলকাতার এক রাজনৈতিক আঁতেল বলেছিলেন, তোমাদের তো নাথের জায়গা — রবীন্দ্রনাথ আর সোমনাথ।
সত্যি। একজনকে দেখিনি, অনুভব করেছি নাথ।
অন্য নাথের কাজ দেখেছি, ক্ষয়িষ্ণু সময়ে নিরলস কাজ করে যাওয়া — সবার জন্য।


সোমনাথ'দা। ছবি ইন্টারনেট থেকে। ছবির সত্ত্ব আমার নয়।  

Monday, 30 April 2018

জীবনের আখড়া

২১শে ফেব্রুয়ারি ২০১৪। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠ। অশীতিপর এক বৃদ্ধ আমার হাত ধরে একটা ছোট্ট চাপ দিলেন।
আমি তো "ছেড়ে দিন, ছেড়ে দিন" বলে চিৎকার জুড়েছি।
উনি বলছেন, "এ বিশ্বনাথ দত্তের হাত, গোয়াবাগানের আখড়ার।"
"আপনি এখনও কুস্তি করেন?"
"করি মানে? এক প্যাঁচে তোমাকে শুইয়ে দেব এখানে!"
সমবেত হাততালি আর হো-হো হাসি! পাশ থেকে ওঁর নাতি বলল, "দাদুর সঙ্গে মোটেও কিন্তু পাঞ্জা লড়তে যাবেন না।"
"আমি কি পাগল!"
বিশ্বনাথবাবু বলেন, "একদিন গোয়াবাগান আসুন, গোবর গুহর সঠিক উত্তরসূরিদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব।"
"আপনিও কি গোবর গুহর ছাত্র ছিলেন?"
"না তো কি? এমন গুরু আর কোথায় পাবো? তোমাদের প্রজন্ম তো ওঁর নামই শোনেনি!"


বিশ্বনাথবাবুর সঙ্গে আমি আর তর্কে গেলাম না গোবর গুহর — ইংরেজি বানানে পদবি লিখতেন গোহো — নাম ক'জন শুনেছে, বা শোনেনি। বছর কয়েক আগে আমিও তো জানতাম না গোবর গুহর নাম। তখন অবশ্য আমি স্কুলে পড়ি। প্রসিত'দা ডেকে পাঠালেন একদিন ক্লাসের পর।
— সেদিন কি একটা লেখার কথা বলছিলে?
— ঐ ফাল্গুনীতে একটা লেখা দেব ভাবছিলাম।
ফাল্গুনী আমাদের স্কুলের বার্ষিক পত্রিকা। সেখানে ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখা এক অন্যরকম অনুভূতি। আমাদের আবাসিক স্কুলের প্রত্যেক ভবনে একটি করে দেওয়াল পত্রিকা থাকতো। এছাড়াও ছোটদের স্কুলের দেওয়াল পত্রিকা, বড়দের স্কুলে আরও একটা, প্রত্যেক হবি ক্লাবের একটা করে — দেওয়াল পত্রিকার ছড়াছড়ি নরেন্দ্রপুরে। কোনওটা সাপ্তাহিক, কিছু-কিছু পাক্ষিক, আবার হয়তো মাসিক। কেউ লেখে বাংলায়, কেউ ইংরেজি, হিন্দি এমনকি সংস্কৃততেও! কিন্তু এ সব ছাড়িয়ে ফাল্গুনী অনন্য — মোটা আর্ট পেপারের প্রচ্ছদ, ঝকঝকে কাগজে ছাপা, ভাষা-সাহিত্যের শিক্ষকরা বাছাই করেন সেরার সেরা লেখাগুলো, আর সবচেয়ে বড় কথা ফাল্গুনী পৌঁছে যায় নরেন্দ্রপুরের সর্বত্র, যা কোনও দেওয়াল পত্রিকা পারে না!


— গত বছরও একটা লিখেছিলে না?
— হ্যাঁ। কিন্তু সেটা নির্বাচিত হয়নি ছাপানোর জন্য। 
হবে কি! তখন সদ্য এসেছি স্কুলে। বিজ্ঞপ্তি এলো ফাল্গুনীতে লেখা দেওয়ার জন্য। এখনও মনে আছে সবে মাত্র দুটো দেওয়াল পত্রিকাতে লিখেছি ছোটোখাটো কবিতা — চার-ছয় পংক্তির, যেমন লেখে ১০-১১ বছরের বাচ্চারা। তাতেই নিজেকে মনে করছি রবীন্দ্রনাথ। এক রবিবার বাবা-মা এসেছেন দেখা করতে আমার সঙ্গে। বললাম ফাল্গুনীর কথা। ভাবলাম গদ্য লিখি। বলেছে অনধিক ৬০০ শব্দে। বাবা বলল ভ্রমণ কাহিনী। সপ্তাহান্তে বাবা-মা আবার এলেন। দেখলাম। বাবা বললেন, "বাহ্! বেশ হয়েছে।" ওঁরা কখনও নিরুৎসাহ করেন না, কিন্তু কোথায় গলদ সেটাও বলেন না — বিশেষত সাহিত্যের ক্ষেত্রে। অঙ্ক হলে অবশ্য অন্য কথা!
— কোথায় যেন একটা গিয়েছিলে, তাই নিয়ে লেখা...
— হ্যাঁ। বুদ্ধগয়া-গয়া-রাজগীর-নালন্দা... খুব একটা ভালো হয়নি হয়ত।
— সবসময় বড় লেখার জায়গা হয় না।
— এবছর কি একটা কবিতা দেব প্রসিত'দা? অভেদানন্দ ভবনের দেওয়াল...
— না না। কবিতা অনেক পাই আমরা। একটা নিবন্ধ লিখবে?
— লিখতে পারি।
— 'পারি' না। লিখবে যদি বল, আমি বিষয় বলে দিচ্ছি, পড়াশুনো করতে হবে। লাইব্রেরির পঞ্চানন'দাকে বলবে আমার কথা। উনি বইগুলো বের করে দেবেন।


হাতে চিরকুট নিয়ে দৌড়লাম লাইব্রেরিতে। পঞ্চানন'দাকে দিলাম। দশ মিনিটের মধ্যে চারটে বই হাতে। বাংলার ব্যায়ামবীরদের নিয়ে লেখা। এর মধ্যে খুঁজতে হবে গোবর গুহ — প্রসিত'দার দেওয়া বিষয়। পঞ্চানন'দা লাইব্রেরিতে ধুতি-পাঞ্জাবি পরতেন, প্রসিত'দা এবং আরও অনেকের মত। কিন্তু লাইব্রেরির বাইরে উনি ছিলেন আমাদের স্কাউটের শিক্ষক — অনুশাসনের প্রতীক।
— বইগুলো পড়া হয়ে গেলে টেবিলেই রাখবে। আমি তুলে রাখবো।
— কিন্তু এ তো একদিনে পড়া হবে না!
— বেশ। আমি কিন্তু এক সপ্তাহের বেশি রিডিং রুমে রাখতেও পারবো না।
আমি পড়ি বিপদে। যেভাবে হোক শেষ করতে হবে নোট নেওয়া। এদিকে ক্লাসের পরে মাত্র দুটো পিরিয়ড হয়তো পাই, না হলে লাইব্রেরি বন্ধ হয়ে যাবে বিকেলে। যাই হোক, গোবর গুহ চলছে, গোয়াবাগান, কুস্তি শেখা, গামার সঙ্গে পার্ক সার্কাস ময়দানে বিখ্যাত লড়াই, তারও আগে বিশ্বজয়ী হওয়া... আমি নোট নেওয়া শেষ করলাম ৪-৫ দিনে। এরপর লেখার পালা। এর আগে কোনওদিন এরকম গবেষণা করে কিছু লিখিনি। ষষ্ঠ শ্রেণিতে এর বেশি করা সম্ভবও না!


— এত কিছু লিখেছ কেন? শব্দ সংখ্যা কত দেখেছ?
— না। 
— যে কোনও পত্রিকায় লেখার প্রথম শর্তই হচ্ছে, কত শব্দ লিখতে হবে। যেরকম চাওয়া হবে, তার মধ্যে তোমার ভাবনা প্রকাশ করতে হবে।
শুরু হল সম্পাদনার প্রথম পাঠ, প্রসিত'দার কাছে। মাজা-ঘষা চলছে গোবর গুহ'র। প্রায় বার চারেকের পর মোটামুটি একটা দাঁড়ালো ব্যাপারটা। প্রসিত'দার খুব আনন্দ। তার চেয়ে বেশি আনন্দ আমার — ফাল্গুনীতে বেরোবে আমার প্রথম লেখা, ছাপার অক্ষরে নিজের নাম!


এখন অনেক লেখা বেরোয়, নিজের নামে। উত্তেজনা কমে এসেছে, আনন্দও। অন্যের লেখা পুনর্লিখনে মজা বেশি পাই। এরকম আনন্দই কি পেতেন প্রসিত'দা? প্রসিত রায়চৌধুরী। ডক্টরেট। হতেই পারতেন অধ্যাপক। পড়াতে পারতেন কোনও বড় কলেজে। কিন্তু এসেছিলেন স্কুলে, রামকৃষ্ণ মিশনে, আমাদের কিছু শেখাতে। নিজেও লিখেছেন অনেক, গবেষণা করেছেন সোনারপুর-রাজপুর-হরিনাভির আঞ্চলিক ইতিহাস নিয়ে। বোড়াল-আদিগঙ্গার গল্প তো ওঁর কাছেই শোনা। আমার সহপাঠী আবির সে-দিন পাঠালো প্রসিত'দার ছবি, দেখা করতে গিয়েছিল। কোনও এক অজ্ঞাত কারণে ওঁর পেনশন নেই, বা বন্ধ। দুর্দশা। কষ্ট। নিঃসঙ্গতা গ্রাস করেছে। হয়ত সান্ত্বনা একটাই — কেউ কেউ তো লিখছে, লিখতে শিখেছে, পরের প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়েছে কালি-কলম... 


প্রসিত'দা এখন। আবিরের তোলা ছবি 

..............................................

© সুপ্রতিম পাল